হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

উপন্যাস : অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ

অপূর্ব চৌধুরী

আদিযুগ থেকেই মানুষ গল্প পছন্দ করে। সে গল্প কখনো শুনতে, কখনো বলতে, এমনকি ভাবতেও পছন্দ করে। এমন করে কাহিনির সন্ধান করতে ভালো লাগে অনেকের। আগুনের পাশে বসে শিকার কিংবা যুদ্ধের গল্প বলা সেই গুহাবাসী মানুষ থেকে শুরু করে আধুনিক নাগরিক, মোবাইল স্ক্রিনে চোখ আটকে থাকা পাঠক—সবাই কখনো না কখনো কারও মুখে শোনা, কিংবা কোথাও পড়া, কখনো স্ক্রিনে দেখা কোনো গল্পে মুগ্ধ হয়, কাঁদে অথবা অনুপ্রাণিত হয়।

কিন্তু কেন? কারণ গল্প কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়, গল্প হলো আমাদের মানসিক, আবেগিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এক গভীর চাহিদার উত্তর। গল্প আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত এক প্রাচীন প্রবৃত্তি। গল্পের কল্পনার প্লটে জগৎকে বোঝার, জীবনকে সাজিয়ে তোলার এবং নিজের অস্তিত্বকে কোনো এক বৃহৎ অর্থের মধ্যে খুঁজে নেয়ার প্রয়াস পাওয়া যায় মনে মনে। কখনো মানুষ যে গল্প শুনতে ভালোবাসে, তাতে সে আবিষ্কার করে নতুন এক জগৎ, যেটা তার নিজের জীবনের বাইরের, অথচ তার হৃদয়ের ভেতরে গড়ে ওঠে সেই গল্পের সঙ্গে তৈরি করা একটি নীরব বন্ধন। আবার কখনো সে নিজেই গল্প বলতে চায়। জীবনের অভিজ্ঞতা, বেদনা, স্বপ্ন কিংবা একান্ত কল্পনাকে পরিণত করতে চায় বর্ণনায়, চরিত্রে, কাহিনিতে তার নিজের মতো করে। তবে সবচাইতে রহস্যময় হলো—মানুষের সেই একাকী অভ্যাস, যেখানে সে কেবল ভাবতে ভালোবাসে, ভাবতে ভাবতে তৈরি করে গল্প। কেউ জানে না সে কল্পনার প্লটে কোথায় হাঁটছে, কী ঘটছে তার মনের ভেতরে; কিন্তু সেই নিঃশব্দ রচনার মাঝে সে তৈরি করে এক নিখুঁত জগৎ। সেখানে সময়, স্থান, বাস্তবতা—সবকিছুই ভিন্ন এক ছন্দে চলে।

এই যে গল্প গল্প ভাবা, এটি একধরনের আত্মানুসন্ধান। কল্পনার সেই যাত্রায় মানুষ পায় নিজেরই এক ভিন্ন প্রতিবিম্ব। কখনো সেখানে সে সাহসী, কখনো ব্যর্থ, কখনো প্রেমিক, আবার কখনো প্রতারিত। অর্থাৎ, গল্প হচ্ছে আমাদের অন্তর্জগতের একটি বর্ণিল আয়না। কল্পনার হয়েও বাস্তব জীবনের অস্পষ্টতা অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে গল্পে।

এই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা—জীবনের বাইরে অন্য এক জীবনকে ছুঁয়ে দেখার, অন্য এক সত্তায় নিজেকে অনুভব করার এই চাহিদা থেকেই জন্ম নেয় সাহিত্যের সবচেয়ে জীবন্ত এবং জনপ্রিয় রূপ: নভেল। উপন্যাস।

নভেল বা উপন্যাস এমন এক মাধ্যম, যেখানে কেবল গল্প নয়, গল্পের মধ্যে ঢুকে পড়ে সময়, সমাজ, দর্শন, রাজনীতি, সম্পর্ক, মনোবিজ্ঞান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—ব্যক্তির আত্মসন্ধান।

একটি ভালো নভেল আমাদের এমনভাবে জাগিয়ে তোলে যেন সেটি কেবল একটি কল্পিত কাহিনি হয়ে ওঠে না, আমাদের নিজের জীবনেরই কোনো অলিখিত অধ্যায় দেখতে পাই সেখানে। এজন্যই মানুষ বারবার ফিরে আসে গল্পের কাছে। ফিরে আসে সেই পাতায়, যেখানে সে হারিয়ে যেতে পারে, আবার ফিরে পেতেও পারে নিজেকে।

‘নভেল’ শব্দটির উৎস ইতালীয় শব্দ ‘Novella’ থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘new’ বা ‘new thing’। মধ্যযুগীয় ইউরোপে যখন সাহিত্য ছিল প্রধানত ধর্মীয়, লোকগাথাভিত্তিক অথবা রাজদরবারের কাহিনিমুখর গীতিকাব্যে বন্দি, তখন সাধারণ মানুষের জীবনের অনেকাংশ বাস্তবতা ছিল সেই সাহিত্যের বাইরে। তাদের ছোট ছোট গল্প, কথাবার্তা, হাসিকান্না, চাতুর্য—সবকিছুই ছিল লোকজ, মুখে মুখে ফেরে বেড়ানো আখ্যানের অংশ।

‘নভেলা’ ছিল সেইসব মুখের গল্পের একটি সাহিত্যমুখর রূপ। নভেলা ছিল সংক্ষিপ্ত, নাটকীয় এবং অনেক রসাত্মক। বিশেষ করে বোকার মুখোশে জ্ঞানের বীজ ছড়ানো বা সমাজের দ্বিচারিতাকে ব্যঙ্গ করে তোলাই ছিল এসব প্রারম্ভিক নভেলার উদ্দেশ্য।

ইতালির বোকাচ্চিওর ডেকামেরন কিংবা ফ্রান্সের র‌্যাবেলেই বা ইংল্যান্ডের চসারের ‘ক্যানটারবেরি টেলস’—এসব রচনাই আধুনিক উপন্যাসের ভিত্তি তৈরি করে দেয়। এগুলোর মধ্যে ছিল জীবনের প্রতি একপ্রকার সরাসরি দৃষ্টিভঙ্গি। কোনো অতিলৌকিকতার ধোঁয়াশা নয়, তার চেয়ে প্রাণবন্ত, রসাল ও বাস্তব কথা ছিল সেসব গল্পে।

কিন্তু সেই ছোটগল্পের বীজ কখন বটবৃক্ষে পরিণত হলো তাহলে? ১৭ ও ১৮ শতকে ইউরোপীয় সমাজে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন শুরু হয়। Enlightenment বা আলোকায়ন বলা হয় তাকে। এই যুগে মানুষ প্রথমবারের মতো ধর্মনির্ভর ব্যাখ্যার বাইরে এসে জীবনের ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিসত্তার ভেতর। সাহিত্যও পাল্টে যেতে শুরু করে তাতে। তখন আর নায়ক শুধু রাজা বা ধর্মযাজক নয়, উল্টো হয়ে উঠল সাধারণ মানুষ—একজন কেরানি, কৃষক, শিক্ষক, কিংবা নাবিক, যার জীবন, অনুভূতি ও সংগ্রামও হয়ে উঠল সাহিত্যের প্রধান বিষয়, গল্পের উপকরণ এবং উপন্যাসের বিষয়বস্তু ।

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রূপ প্রকাশ পায় নভেল বা উপন্যাস নামক সাহিত্যের নতুন ফর্মটিতে। এটি আর শুধু একটি গল্প নয়, হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ, জটিল, বহুস্তর বিশিষ্ট বয়ান। সেই কথার মধ্যে কাহিনি আছে, কিন্তু সেই কাহিনিকে ঘিরে আছে মনস্তত্ত্ব, সমাজচিত্র, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সময়ের স্তর।

নভেলের জন্ম তাই কেবল সাহিত্যের একটি শৈলী নয়; এটি ছিল এক নতুন মানবচেতনার জন্ম, যেখানে ব্যক্তি হয়ে ওঠে সমাজের কেন্দ্রবিন্দু। একজন মানুষের অনুভব, দুঃখ, প্রেম, সংকট—সবকিছুই সাহিত্যের যোগ্য বিষয় হয়ে উঠতে থাকে উপন্যাসের হাত ধরে।

এই ভাবনাগত বিপ্লবই উপন্যাসকে আলাদা করে তুলেছে সাহিত্যের অন্যসব ফরম্যাট থেকে। উপন্যাস পাঠককে কেবল গল্প শোনায় না, তাকে একটি বাস্তবতার অভ্যন্তরে নিয়ে যায় ধীরে ধরে। ক্রমেই সেখানে সে নিজেও হয়ে ওঠে চরিত্র, দর্শক এবং কখনো কখনো লেখক।

আমরা কেন গল্প পড়ি? কিংবা উপন্যাস পড়তে আমাদের ভালো লাগে কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর অনেকভাবে দেওয়া যায়। কিন্তু নভেল বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে উত্তরটি আরো গভীর এবং মানবিক হয়। কারণ, উপন্যাস কেবল একটি গল্প নয়—এটি একটি জগৎ হয়ে আমাদের চিন্তায় রয়। উপন্যাসের জগৎ হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ, বহুস্তরবিশিষ্ট, সময়-চরিত্র-সংঘাত-আবেগে গঠিত জীবজগৎ। পাঠক নিজেকে খুঁজে পান সেখানে, আবার হারিয়ে ফেলতেও ভালোবাসেন ক্ষণে ক্ষণে।

নভেলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর জীবনঘনিষ্ঠতা। জীবনের প্রতিটি সুর, ভালোবাসা, পরাজয়, আকাঙ্ক্ষা, বিষণ্ণতা, দ্বিধা, সংগ্রাম, নভেলের শরীর জুড়ে থাকে বারবার অনেকবার।

কবিতা হলো আবেগের সংক্ষিপ্ত অথচ বিস্ফোরক রূপ; নাটক ঘটনা এবং ভাষার বৃত্ত; কিন্তু নভেল সময়কে ধরে রাখে, মনস্তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করে, চরিত্রকে গড়ে তোলে আর ধীরে ধীরে তাকে সময়ের সঙ্গে হাঁটায়।

এই ধীরপায়ী গভীরতা পাঠককে উপন্যাসের ভেতরে এমনভাবে প্রবেশ করায়, যেন সে নিজেই সেই চরিত্রগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠে।

নভেল এমন একটি অভিজ্ঞতা দেয়, যা বাস্তব জীবনে হয়তো কখনো ঘটেনি, কিন্তু মনোজগতে তার প্রতিধ্বনি আমরা অনুভব করি। আমরা সুখ পেতে চাই, কিন্তু সবসময় তা পাই না। আমরা প্রেমে পড়ি, আবার হারাই। আমরা প্রশ্ন করি, উত্তর না পেয়ে চলে আসি। এই সমস্ত ভঙ্গুরতা, দ্বন্দ্ব ও আকাঙ্ক্ষা নভেলের ভাষায় রূপ পায়। আর এই কারণেই পাঠক তার নিজের জীবনের প্রতিফলন খুঁজে পান উপন্যাসের পাতায়।

পাঠকের সঙ্গে নভেলের সম্পর্ক একধরনের গোপন চুক্তি। সেখানে পাঠক লেখকের সঙ্গে একটি বিশ্বাসে যুক্ত হন—আমাকে নিয়ে যাও এমন এক জায়গায়, যেখানে আমি নিজের থেকেও গভীরভাবে নিজেকে চিনতে পারি।

এই চুক্তি কবিতার মতো বিমূর্ত নয়, নাটকের মতো বহির্মুখ নয়; এটি এক অন্তর্মুখী যাত্রা।

তাই কেউ যখন অ্যানা কারেনিনা, জেন আয়ার, রেস্কোলনিকভ, কিংবা গ্যাব্রিয়েলা পড়েন, তখন তিনি কেবল একটি গল্প পড়েন না, তিনি সেই জীবনের মধ্যেই বাস করেন, চরিত্রগুলোর ভুলে কাঁদেন, সাহসে অনুপ্রাণিত হন, আর কখনো কখনো মনে মনে বলে ফেলেন, এই চরিত্রটি আমি-ই।

নভেল মানুষের কল্পনা ও বাস্তবতার মাঝখানে একটি সেতু তৈরি করে। একদিকে ফ্যান্টাসি, অন্যদিকে বাস্তবতা। এই দুইয়ের সংমিশ্রণে যে বিশ্ব সৃষ্টি হয়, সেটি একাধারে ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন। এজন্যই পৃথিবী যতই বদলাক, প্রযুক্তি যতই পালটাক, মানুষ ততবার ফিরে আসবে সেই পুরোনো উপন্যাসের পাতায়—যেখানে সে নিজেকে খুঁজে পায়, নতুন করে আবিষ্কার করে।

সময় বদলায়। প্রযুক্তি বদলায়। মানুষের মনোযোগ, ধৈর্য, পঠন-প্রবণতা—সবকিছুর মধ্যেই আসে এক অদৃশ্য পরিবর্তন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তনের মধ্যে গল্প কি বদলায়? নভেল, যা এতদিন আমাদের চিন্তা, কল্পনা ও আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য বাহন ছিল, সেটির ভবিষ্যৎ কি এখনো উজ্জ্বল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হয় বর্তমান পাঠকের দিকে।

তিনি এখন আর শুধু কাগজের পাতায় ডুবে থাকা পাঠক নন; তিনি ই-বুক পড়েন, অডিওবুকে কান দেন, মোবাইল অ্যাপে স্ক্রল করেন। তার পাঠাভিজ্ঞতা এখন বহুমাত্রিক। চোখ, কান ও আঙুলের স্পর্শ মিলিয়ে এক নতুন ধরনের সাহিত্যগ্রহণ।

এই নতুন বাস্তবতায় নভেলও বদলে যাচ্ছে। আগের মতো শুধু মুদ্রিত বই নয়, এখন উপন্যাস পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের কাছে অডিওবুক হিসেবে বা ই-রিডারে। এমনকি অনেক লেখক এখন ইন্টারঅ্যাকটিভ ফিকশন লিখছেন, যেখানে পাঠক নিজের মতো করে গল্পের গতি নির্ধারণ করতে পারেন, একই কাহিনির একাধিক পরিণতি সম্ভব হয়ে ওঠে পাঠকের হাত ধরে।

আরো এগিয়ে গেলে আমরা দেখি, আজকের পাঠক কেবল পাঠক নন, তিনিও একজন সহ-নির্মাতা। অনেকে ফ্যান ফিকশন লিখছেন, কেউ কেউ জনপ্রিয় চরিত্রদের নিয়ে নিজস্ব কাহিনি নির্মাণ করছেন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গল্পের ফর্ম বদলেছে—মাইক্রো-ফিকশন, ইনস্টাগ্রাম-পোস্ট, সিরিয়ালাইজড থ্রেডে উপন্যাস। এসব নতুন আঙ্গিকে একটি বিষয় স্পষ্ট—গল্প বলার ইচ্ছা এখনো অটুট, শুধু তার প্রকাশভঙ্গি পরিবর্তিত হচ্ছে।

কিন্তু সব পরিবর্তনের মাঝেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত—মানুষের গল্প ভালোবাসা।

কারণ, প্রযুক্তি যতই বদলাক, মানুষের আবেগ, ভয়, প্রেম, নিঃসঙ্গতা কিংবা স্বপ্ন—এই মৌলিক অনুভূতিগুলো অপরিবর্তনীয়। এই অনুভূতিগুলোকেই যে সাহিত্যের গভীর কাহিনিমালায় বুনে রাখা হয়, তা কখনো অচল হয় না।

আগামী দিনের নভেল হয়তো হবে আরো মাল্টিমিডিয়া-সমৃদ্ধ। কোনো অধ্যায়ে থাকবে ভিডিও, কোথাও সাউন্ড ইফেক্ট, আবার কোথাও পাঠক নিজেই চয়ন করবেন গল্পের মোড়।

তবে সে যা-ই হোক না কেন, উপন্যাসের মূল থাকবে একটাই—মানব-মনস্তত্ত্বের গভীর অনুসন্ধান, যেখানে পাঠক নিজেকে খুঁজবেন অন্যের জীবনে।

তাই বলা যায়, ডিজিটাল যুগে উপন্যাস হারিয়ে যাচ্ছে না; নিজেকে বরং নতুন করে গড়ে নিচ্ছে। কাগজের পাতা বদলাচ্ছে পর্দায়, কিন্তু গল্পের হৃৎস্পন্দন এখনো স্পষ্ট। প্রেমে, দ্বন্দ্বে, সংগ্রামে, নিঃসঙ্গতা আর আত্মজিজ্ঞাসায় ভরপুর সে পরদার গল্প।

উপন্যাস কেবল একটি সাহিত্যরীতি নয়; এটি একটি মানবিক অভিপ্রায়। বিশেষত নিজেকে বোঝার, অন্যকে জানার এবং পৃথিবীর বহুস্তরময় বাস্তবতাকে হৃদয়ে ধারণ করার এক নিঃশব্দ চেষ্টার নাম।

যে যাত্রা শুরু হয়েছিল একান্ত কল্পনার ভেতর—লোককথা, ছোটগল্প, নভেলা, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হয়েছে এক গভীর দর্শনে। উপন্যাস আমাদের শিখিয়েছে, যে মানুষটি পাশের বাড়িতে থাকে, তার জীবনও একটি মহাকাব্য হতে পারে। যে নারীর প্রেম ব্যর্থ হয়েছে, তার কাহিনিও একটি সমাজের ইতিহাস হতে পারে। যে কিশোর অপরাধ করে, তার ভিতরেও লুকিয়ে থাকে দার্শনিক জিজ্ঞাসা।

এই কারণেই, উপন্যাস হয়ে উঠেছে মানুষের আত্মার ভাষা।

প্রত্যেকটি ভালো উপন্যাস এক একটি আয়না। সেখানে আমরা দেখি কেবল চরিত্র নয়, দেখি নিজেদের ভুল, সাহস, অভিমান, লজ্জা, প্রেম ও পরাজয়। উপন্যাস আমাদের চোখে দেখায়—‘তুমি একা নও, তোমার মতো এমন আরো অনেক মানুষ আছেন।’ এই বোঝাপড়ার অভিজ্ঞতাই সাহিত্যকে করে তোলে পরম মানবিক।

যে সমাজে মানুষের গল্প হারিয়ে যায়, সেখানে ভাষা থেকে মায়া হারিয়ে যায়। উপন্যাস সেই হারিয়ে যাওয়া মায়াকে ধরে রাখে।

উপন্যাস যেন ইতিহাসের এক নরম সংস্করণ—যেখানে রাজা-সম্রাট নয়, গৃহবধূ, বিপ্লবী, কৃষক, বৃদ্ধ, শিশুর জীবনের ছোট ছোট ঘটনা নিয়ে তৈরি হয় সময়ের অনুবাদ।

ভবিষ্যতে উপন্যাস হয়তো আরো প্রযুক্তিনির্ভর হবে। হয়তো আমরা পড়ব না, বরং দেখব এবং শুনব। হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যথা বুঝে গল্প তৈরি করে দেবে।

তবুও যতদিন মানুষের মধ্যে প্রেম, স্মৃতি, প্রশ্ন আর কল্পনা থাকবে, ততদিন উপন্যাস বেঁচে থাকবে। কারণ উপন্যাস কোনো মাধ্যম নয়, এটি মানুষের চিরন্তন চাহিদা: অন্যের ভেতর নিজেকে খোঁজার এক রহস্যময় আকাঙ্ক্ষা।

এই আকাঙ্ক্ষা কখনো মুছে যায় না।

যেমন : চাঁদ দেখলে আমরা আজও ভাবি—ওখানে কি কেউ আছে?

ঠিক তেমনই, একটি উপন্যাস খুললে আমরা ভাবি—এই গল্পে কি আমি আছি?

৩৬ জুলাই: ঐতিহ্যবাদী বিপ্লব ও বাঙালি মুসলিম ফিউচারিটি

লেইস ফিতা ও জাদুর বাক্স

হুমায়ূন আহমেদ ও বাংলা কথাসাহিত্যের ঘরে ফেরা (শেষ পর্ব)

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য, সীমান্ত ও আজকের লড়াই

দুর্লভ লেখা: ইকবালের ইতিহাস-দর্শন

প্রতিভার সাহস : আবুল কালাম শামসুদ্দীন

বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় পথকাব্য

সাহিত্যবিশারদ ও পুঁথিবিশারদ

সাহিত্যবিশারদের জীবনদৃষ্টি ও বিষণ্ণ তিন দশক নিয়ে তিন নোক্তা

সাহিত্যবিশারদকে কেন শুধুই ‘পুঁথি-সংগ্রাহক’ হিসাবে দেখাটা সমস্যা?