হোম > সাহিত্য সাময়িকী > প্রবন্ধ

মিলাদুন্নবীর সাংস্কৃতিক উদযাপন

মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

মিলাদুন্নবী মুসলিম হৃদয়ের আধ্যাত্মিক আকুতি, নবীপ্রেম, গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগের প্রকাশ। মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিলাদ বা জন্ম উপলক্ষে বিশ্বের আকাশ-বাতাস যেন ভরে ওঠে ভক্তির সুরে, আনন্দের রঙে এবং ঐতিহ্যের বহুমাত্রিকতায়। কোথাও নীরব স্মরণ, কোথাও উচ্ছ্বাসমুখর জনসমাবেশ, কোথাও আবার সুফি সংগীতের আবেশে রাতভর জিকির—এই বৈচিত্র্যময় আয়োজন যেন বিশ্বসভ্যতার নানা স্তর, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সম্মিলিত প্রতিফলন।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিলাদ উদ্‌যাপনের কোনো নির্দিষ্ট রেওয়াজ বা সংস্কৃতি ছিল না। পরবর্তী সময়ে কালক্রমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হিসেবে উদ্‌যাপিত হতে শুরু করে। মিলাদুন্নবীর মূল উদ্দেশ্য নবীর জীবন ও শিক্ষাকে স্মরণ করা, মুসলিমদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি উদ্দীপনা জাগানো এবং সামাজিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐক্য সুদৃঢ় করা।

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনায় মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপিত হয় নিঃশব্দ আধ্যাত্মিকতার আবেশে। থাকে না কোনো শোভাযাত্রার কোলাহল বা আলোকসজ্জার আড়ম্বর। তবুও মসজিদে নববি ও কাবা শরিফে জড়ো হওয়া হাজারো প্রাণ ভরে তোলে প্রাঙ্গণ—কখনো কোরআন তিলাওয়াতের সুরে, কখনো দোয়ার গভীর আর্তিতে। সেই প্রার্থনা ও ধ্যানমগ্ন পরিবেশে যেন ধ্বনিত হয় নবীর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার নীরব উচ্চারণ, যা এই দিনটিকে অলংকৃত করে এক অনন্য আধ্যাত্মিক মহিমায়।

অপরদিকে মিসরের সাংস্কৃতিক রাজধানী কায়রোর রাস্তাঘাট হয়ে ওঠে ঝলমলে আলোয় প্রাণবন্ত। সুফি দরবেশদের সমবেত গান, কাওয়ালি ও হামদ-নাতের সুরে গমগম করে নগরী। শিশুদের হাতে হাতে ধরা থাকে মিষ্টি দিয়ে সাজানো রঙিন ঘোড়া আর কন্যা পুতুল, যা প্রাচীনকালের আনন্দের প্রতীক বহন করে। স্থানীয় মানুষ একে অপরকে আপ্যায়ন করে ঐতিহ্যবাহী খাবার ও মিষ্টান্ন দিয়ে, আর মেতে ওঠে প্রার্থনার পাশাপাশি উৎসব ভাগাভাগির আনন্দে। ভক্তি, সংগীত ও সামাজিক মিলনের এই অনন্য সমন্বয় মিসরের ‘মাওলিদ’ বা মিলাদুন্নবী রূপ নেয় আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি জনমানুষের এক উজ্জ্বল উৎসবে।

মরক্কোতে মিলাদুন্নবীর উদ্‌যাপন যেন সুর আর সাধনার মিষ্টি মেলবন্ধন। আন্দালুসি সংগীতের সুরেলা ধারা, সুফি জিকিরের তন্ময় ধ্বনি আর হামদ-নাতের মাধুর্যে শহর পরিণত হয় আধ্যাত্মিক বেলাভূমিতে। পরিবারগুলো একত্রে বসে ঐতিহ্যবাহী ‘কুসকুস’ ভোজে অংশ নেয়, যেখানে ভক্তি, ভ্রাতৃত্ব আর আতিথেয়তা একাকার হয়ে যায়। প্রার্থনা ও দোয়ার সমবেত স্রোতে দিনটি কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার নয়, বরং পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মিলনের উজ্জ্বল উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

লেবানন ও সিরিয়ায় শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয় কুইজ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও কোরআন তিলাওয়াত, যা তাদের ধর্মীয় জ্ঞান ও আত্মিক চেতনায় সমৃদ্ধ করে। তরুণরা নবীজির মহিমা করে নাত, ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি করে, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়, তার জীবনাদর্শ ও নৈতিক শিক্ষার আলোকচ্ছটা। এভাবেই লেবানন ও সিরিয়ার মিলাদুন্নবী হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রজন্মগঠনের প্রতীক।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা’তে মিলাদুন্নবীর দিনটি রূপ নেয় এক মহাসমাবেশে। হাজারো মানুষ সমবেত হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায়, শহরের রাস্তাঘাট আলোকসজ্জায় ঝলমল করে ওঠে। মানুষ একে অপরকে আপ্যায়ন করে বিশেষ খাবার দিয়ে, আর দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হয় দান-সদকা। ভক্তি, উচ্ছ্বাস আর ভ্রাতৃত্বের এই মিলনমেলায় ইয়েমেনের মিলাদুন্নবী হয়ে ওঠে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সামাজিক সংহতি ও সাংস্কৃতিক উদারতার নিদর্শন।

সুদানে মিলাদুন্নবী রূপ নেয় এক দেশজ ও আধ্যাত্মিক উৎসবে। ঢাক-ঢোলের তালে সুফি নৃত্য, কবিতা ও লোকগানের সুর মিশে যায় মাহফিলের আবহে। রাতভর জিকির ও সমবেত প্রার্থনায় আকাশ-বাতাস প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, আর মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হয় নবীর প্রতি গভীর প্রেম ও ভক্তি। আধ্যাত্মিক সাধনা ও লোকজ উচ্ছ্বাসের এই মিশ্রণই সুদানের মিলাদুন্নবীকে আলাদা বৈশিষ্ট্যে অনন্য করে তোলে।

লিবিয়ায় শিশুরা হাতে রঙিন ফানুস নিয়ে আগুনের চারপাশে সমবেত হয়, নবীর প্রশংসায় গান গেয়ে ওঠে এবং উৎসবকে আলোকিত করে তোলে। ভক্তি, সরলতা ও লোকজ আনন্দের এই মেলবন্ধন লিবিয়ার মিলাদুন্নবীকে দেয় এক অনন্য আভা, যেখানে নতুন প্রজন্মও যুক্ত হয় নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ঐতিহ্যে।

তিউনিসিয়ার প্রাচীন নগরী কায়রোয়ান শহরে রান্না করা হয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন ‘আসিদাতুজ জুকুকু’, যা পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে ভাগাভাগি করে পরিবেশন করা হয়। দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত এবং আধ্যাত্মিক আসরের পাশাপাশি এই বিশেষ খাবার মহানবীর মিলাদকে স্মরণীয় করে তোলে। ভক্তি ও ঐতিহ্যের এই মেলবন্ধনে উদ্‌যাপিত তিউনিসিয়ার মিলাদুন্নবী পায় নিজস্ব স্বকীয়তা।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদ শহরের রাস্তাঘাট ঝলমলে আলোয় সজ্জিত হয়, আর মানুষ সমবেত হয় ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে। বিশেষ করে ইমাম আবু হানিফা মসজিদ প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে মানুষের উপস্থিতিতে। এখানে প্রার্থনা, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ায় মুখরিত থাকে পরিবেশ। আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস ও ভালোবাসার এই সম্মিলন এক মহিমান্বিত অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।

আরব আমিরাত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপিত হয় তুলনামূলক অনাড়ম্বর সংস্কৃতির আবহে। মসজিদগুলোয় বিশেষ খুতবা ও কোরআন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি দু-এক স্থানে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান। রাষ্ট্রীয়ভাবে টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে নবীজীবনের নানা প্রসঙ্গ সম্প্রচারিত হয়। ফলে সাম্প্রতিককালে এই অঞ্চলে মিলাদুন্নবী আধ্যাত্মিক সাধনার সীমা পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আধুনিক গণমাধ্যমের সংযোগে এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবের রূপ নিয়েছে।

আরব দেশের একেক অঞ্চলে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপনের রীতি-প্রথা আলাদা হলেও মূল সুর এক—প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। কোথাও গান, কোথাও আলো, কোথাও নিঃশব্দ দোয়া—সব মিলে মহানবীর মিলাদকে ঘিরে এক আধ্যাত্মিক সংগীতের সৃষ্টি হয়। এ দিনের সামাজিক ও মানবিক দিকও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গরিব ও অসহায়দের মাঝে খাদ্য ও মিষ্টি বিতরণ, গণভোজের আয়োজন ও পারিবারিক মিলনমেলা—ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার চেতনা উদ্ভাসিত করে।

বেশিরভাগ আরব দেশে এ দিনটি সরকারিভাবে ছুটি থাকার ফলে পরিবার ও সমাজ একত্রে মিলাদুন্নবী উদ্‌যাপন করার সুযোগ পেয়ে থাকেন। মুসলিমরা দিনব্যাপী কোরআন তিলাওয়াত, ধর্মীয় আলোচনা, হামদ ও নাত পরিবেশন, শোভাযাত্রা ও বিশেষ খাবার আয়োজনের মাধ্যমে দিনটিকে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিবসে পরিণত করেন।

বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে মিলাদুন্নবী

বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবী মুসলিম সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি পরিচিত অনুষঙ্গ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য, সুফি সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে মিলাদুন্নবীর আয়োজনের একটি দীর্ঘ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ফলে একই ধর্মীয় উপলক্ষ হলেও দেশ ও অঞ্চলভেদে এর প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে যথেষ্ট বৈচিত্র্য।

বাংলাদেশে রবিউল আউয়াল মাসজুড়ে বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও সালাম, হামদ-নাত, ওয়াজ ও ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও শোভাযাত্রা, আলোকসজ্জা, পতাকা ও ব্যানার প্রদর্শনের আয়োজনও দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে তবারক, মিষ্টি ও খাবার বিতরণ এবং দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মধ্যে সহায়তা প্রদানের মধ্য দিয়ে সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের প্রকাশ ঘটে। বাংলা ভাষায় নবীজির জীবন, চরিত্র ও আদর্শ নিয়ে রচিত নাত, গজল, কবিতা ও ইসলামী সাহিত্যও বাংলাদেশের মিলাদ সংস্কৃতিকে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

ভারতে মিলাদুন্নবী উদযাপনের রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, মহারাষ্ট্র, বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ও ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত, ধর্মীয় আলোচনা এবং নবীজির জীবন ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা এসব আয়োজনের প্রধান অংশ। কিছু অঞ্চলে বড় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, আবার কোথাও ঘরোয়া পরিবেশে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে দিনটি পালন করা হয়। ভারতের সুফি ঐতিহ্যের প্রভাবের কারণে কিছু অঞ্চলে নাত, কাসিদা, ধর্মীয় কবিতা ও আধ্যাত্মিক সঙ্গীতও মিলাদ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

পাকিস্তানে ঈদে মিলাদুন্নবী ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। রবিউল আউয়াল মাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন শহর ও জনপদে মসজিদ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে বিশেষ অনুষ্ঠান শুরু হয়। লাহোর, করাচি, ইসলামাবাদ, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ারসহ বিভিন্ন শহরে মিলাদ মাহফিল, নাত প্রতিযোগিতা, কুরআন তিলাওয়াত, ধর্মীয় আলোচনা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। অনেক স্থানে মসজিদ, রাস্তা ও ভবন আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। উর্দু, পাঞ্জাবি ও অন্যান্য স্থানীয় ভাষায় রচিত নাত, কাসিদা ও ধর্মীয় কবিতা পাকিস্তানের মিলাদ সংস্কৃতিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। পাশাপাশি খাবার ও মিষ্টি বিতরণ এবং দরিদ্রদের সহায়তার মধ্য দিয়ে সামাজিক সংহতির প্রকাশ ঘটে।

আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলেও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মস্মরণ ধর্মীয় আলোচনা, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ, দোয়া ও নবীজির জীবনাদর্শের আলোচনার মাধ্যমে পালিত হয়ে থাকে। স্থানীয় মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আলেমদের আলোচনা এবং ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কোথাও পারিবারিক ও মসজিদকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান প্রাধান্য পায়, আবার কোথাও বৃহত্তর ধর্মীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ ও দরিদ্রদের সহায়তার মধ্য দিয়েও নবীপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটে।

এশিয়ার অন্যান্য দেশে মিলাদুন্নবী

এশিয়ার মুসলিম সমাজে মিলাদুন্নবীর উদযাপন আরও বৈচিত্র্যময়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে স্থানীয় সংস্কৃতি, ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলাদুন্নবীর আয়োজনের একটি গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

ইন্দোনেশিয়ায় মহানবীর জন্মস্মরণকে কেন্দ্র করে ‘মাওলিদ’ বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে ও রীতিতে পালিত হয়। মসজিদ ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত, ধর্মীয় আলোচনা ও নবীজির জীবনী পাঠের আয়োজন করা হয়। কিছু অঞ্চলে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বিশেষ শোভাযাত্রা, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সামষ্টিক ভোজের আয়োজনও দেখা যায়। জাভা অঞ্চলের কিছু ঐতিহ্যবাহী মাওলিদ আয়োজন স্থানীয় ইসলামী সংস্কৃতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য বহন করে।

মালয়েশিয়ায় মিলাদুন্নবী সাধারণত ‘মাওলিদুর রাসুল’ নামে পরিচিত। মসজিদ, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সরকারি পর্যায়ে ধর্মীয় আলোচনা, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ, নাত, শোভাযাত্রা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। নবীজির জীবন ও চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে বক্তৃতা ও আলোচনা এ আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্রুনেইতেও মহানবীর জন্মস্মরণ রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়। ধর্মীয় সমাবেশ, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও নাত, ইসলামি আলোচনা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়। রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার কারণে এখানে মিলাদুন্নবীর আয়োজন বেশ সুসংগঠিত।

মালদ্বীপে মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আলোচনা, কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ ও নাতের আয়োজনের মাধ্যমে মহানবীর জীবন ও শিক্ষা স্মরণ করা হয়। দ্বীনি শিক্ষা ও নবীজির আদর্শ অনুসরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তুরস্কে মহানবীর জন্মস্মরণ ‘মেভলিদ কান্দিলি’ নামে পরিচিত। মসজিদগুলোতে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও নবীজির প্রশংসামূলক কবিতা পাঠের প্রচলন রয়েছে। তুর্কি ভাষায় রচিত বিখ্যাত ‘মেভলিদ’ সাহিত্য এ ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুফি ও উসমানি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মেভলিদ সাহিত্য ও ধর্মীয় আয়োজনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

দেশ ও অঞ্চলভেদে রীতির ভিন্নতা থাকলেও মিলাদুন্নবীর মূল সুর অভিন্ন—মহানবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং তাঁর জীবনাদর্শ স্মরণ। কোথাও আলো, কোথাও সঙ্গীত, কোথাও নীরব দুআ, কোথাও আবার সামাজিক মিলন ও দান-সদকা—সবকিছুর মধ্যেই নবীপ্রেমের বহুমাত্রিক প্রকাশ দেখা যায়। দরিদ্র ও অসহায়দের খাদ্য বিতরণ, পারিবারিক মিলন, গণভোজ ও পারস্পরিক আপ্যায়ন ইসলামের ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার চেতনাকে আরও উজ্জ্বল করে।

মরক্কোর সুফি ঐতিহ্য, মিসরের রঙিন মাওলিদ, তিউনিসিয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার, তুরস্কের মেভলিদ সাহিত্য, ইন্দোনেশিয়ার লোকজ আয়োজন, মালয়েশিয়ার ধর্মীয় সমাবেশ, বাংলাদেশের মিলাদ মাহফিল, ভারতের সুফি-ঐতিহ্য, পাকিস্তানের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা কিংবা আফগানিস্তানের ধর্মীয় সমাবেশ—প্রতিটি অঞ্চলে মিলাদুন্নবী নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশে একটি স্বতন্ত্র রূপ ধারণ করেছে।

লেখক : অনুবাদক, বাংলাদেশ দূতাবাস, কাতার

মিলাদুন্নবী যেভাবে বিশ্বসংস্কৃতি হলো

কালিয়াকৈরে নদীর পানিতে ভেসে উঠল শিশুর লাশ

জুলাই শহীদদের অবদানেই ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে দেশের মানুষ

আ.লীগ দেশকে শূন্য ঝুড়ি বানিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে

নজরুলকন্যা শান্তিলতা

দেশ-বিদেশের সংস্কৃতি

যানজটে চরম ভোগান্তির জন্য সরকারের ‘অদক্ষতাকে’ দায়ী করল জামায়াত

শাহরিয়ার নাফীসের বই ’প্লে অ্যান্ড স্টাডি, উইন দ্য রেস’-এর মোড়ক উন্মোচন

বাংলাদেশের কালচারাল ক্যালেন্ডার, আগস্ট-ভাদ্র-রবিউল আউয়াল

বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য নেপালের নতুন নিয়ম