হোম > সাহিত্য সাময়িকী > মুসলিম বিশ্বের ইতিহাস

খেলাফত রাষ্ট্রে ধর্মদ্রোহ প্রতিরোধ যুদ্ধ

প্রথম পর্ব

আলীজাহ মুহাম্মাদ সামানীন

খলিফা আবু বকর (রা.) ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান পরিচালনার আগে শেষবারের মতো মুরতাদ গোত্রগুলোর কাছে চিঠি পাঠালেন এবং তাদের ইসলামের ফিরে আসার উদাত্ত আহ্বান জানালেন। তার আহ্বান মানা না হলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করার সতর্ক করে দিলেন।

খলিফার চিঠি

‘ইসলামে অবিচল এবং ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া সবার জন্য খলিফা আবু বকরের পক্ষ থেকে এই পত্র। যারা ইসলামে অবিচল রয়েছে, তাদের সালাম। আমরা নবীজির আনীত সকল বিষয় মেনে নিয়েছি। যারা ইসলামের বিধান প্রত্যাখ্যান করে তাদের আমরা কাফের মনে করি। তাদের সঙ্গে আমাদের লড়াই অবশ্যম্ভাবী। এটাই নবীজির আদর্শ। তিনি মানুষ ছিলেন। ইসলাম পূর্ণাঙ্গতা লাভ করার পর আল্লাহতায়ালা তাকে দুনিয়া থেকে ‍নিয়ে গেছেন। আমরা একজন রবের ইবাদত করি, যিনি কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। তাই ব্যক্তি মুহাম্মদের উপাসকদের জেনে রাখা উচিত, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আর আল্লাহর ইবাদতগুজার ব্যক্তিরা জানে, আল্লাহতায়ালা চিরঞ্জীব।

আমি আপনাদের উপদেশ দিচ্ছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল যেসব বিধান এনেছেন, সেগুলো আন্তরিকভাবে মেনে নিন। আল্লাহর ক্ষমা যে পাবে না, সে অপদস্থ হবে। তার হেদায়েত পাবে, সে সঠিক পথে চলতে পারবে।

আপনাদের মধ্যে যারা শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে ধর্মদ্রোহের মতো জঘন্য অপরাধ করেছে, তাদের সংবাদ আমার কাছে পৌঁছেছে। আমার জেনারেলদের আমি নির্দেশ দিয়েছি, আপনাদের কাছে গিয়ে সবার আগে আমার চিঠি পাঠ করে শোনাবে। ইসলামে ফিরে এলে আপনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে না। আর যারা হঠকারী হয়ে ধর্মদ্রোহে লিপ্ত থাকবে, তরবারি তাদের ফায়সালা করবে। তাদের মনে রাখা উচিত, আল্লাহতায়ালা মোটেই দুর্বল নন।

এই পত্র সর্বশেষ ঘোষণা ও সতর্কবার্তা। এরপর থেকে যারা সত্যিকার অর্থে ইসলামের বিধান পালন করবে, তারা নিরাপদে থাকবে। তাদের অবশ্যই জাকাত দিতে হবে। অন্যথায় আমার জেনারেলরা তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

জেনারেলদের প্রতি ফরমান

খেলাফত রাষ্ট্রের খলিফা আবু বকর (রা.) জেনারেলদের উদ্দেশে একটি ফরমানপত্র জারি করেন। সেখানে তাদের কর্তব্য, করণীয়, আদেশ-নিষেধের সীমানা কঠিনভাবে নির্ধারণ করে দেন। ফরমানে তিনি বলেন,

‘আপনারা ধর্মহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চলেছেন। আমার সঙ্গে আপনাদের এই অঙ্গীকার রইল যে, আপনারা সব বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করবেন। ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে মরণপণ লড়াই করবেন। তবে তার আগে তাদের ইসলামে ফিরে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাবেন। যারা সত্যকে আলিঙ্গন করবে, তাদের উপযুক্ত সম্মান দেবেন। তাদের কর্তব্য শিখিয়ে দেবেন। আর যারা বিরুদ্ধাচরণ করবে, তাদের সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করবেন। গনিমত ও যুদ্ধলব্ধ সম্পত্তির এক-পঞ্চমাংশ বাইতুল মালের জন্য রেখে দিয়ে বাকিটা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেবেন। সাবধান! নিজেরা বিশৃঙ্খলা করবেন না। তৃতীয় কোনো পক্ষ যেন আপনাদের মধ্যে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন। মুসলমানদের পারস্পরিক আচরণে কোমলতা ও সৌহার্দ বজায় রাখবেন।’

সেনাবাহিনীতে এগারোটি ইউনিট গঠন

খলিফা আবু বকর (রা.) ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মুসলিম সেনাবাহিনী করলেন। পুরো বাহিনীকে তিনি এগারোটি ইউনিটে বিভক্ত করলেন। যদিও প্রতিটি ইউনিটের সৈন্য সংখ্যা দু-তিন হাজার বা বড়জোর ৫ হাজারের বেশি ছিল না, তবু তারা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। তারা শাহাদতের তামান্নায় উজ্জীবিত, নিজেদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন এবং রবের ওপর সম্পূর্ণ আস্থাশীল। খলিফা আবু বকর (রা.) এগারোটি ইউনিটের জন্য গন্তব্য ও যাত্রাপথ সুনির্দিষ্ট করে দেন।

এই ক্ষুদ্র ইউনিটগুলোর মোতায়েন কৌশল ও গতিবিধি গভীরভাবে লক্ষ করলে খলিফার অসাধারণ দূরদর্শিতা, সামরিক দক্ষতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত তাওফিক স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সমগ্র আরব উপদ্বীপজুড়ে বাহিনীগুলো এমন সুচারু ও পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রতিটি জনপদে সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে এমন কোনো গোত্র বা অঞ্চল অবশিষ্ট ছিল না, যেখানে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি পৌঁছায়নি।

খলিফা প্রতিটি বাহিনীর নেতৃত্বে সমর-ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বীরদের নিযুক্ত করেন। তিনি তাদের স্পষ্ট ও বিস্তারিত নির্দেশনা দেনÑকোনো অঞ্চলে বিজয় অর্জনের পর পরবর্তী করণীয় কী হবে এবং এরপর কোন পথে অগ্রসর হতে হবে। কৌশলগত প্রয়োজনে কখনো এসব বাহিনী একত্র হতো, শত্রুর সব ধরনের সুযোগ ও দুর্বল পথ সম্পূর্ণরূপে রুদ্ধ করে দেওয়ার জন্য আবার তারা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত।

এই সুসংগঠিত পরিকল্পনা ও বিচক্ষণ নেতৃত্বই পুরো অভিযানের সাফল্যের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

প্রথম ইউনিট : খালেদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে

সেনাপতি নির্ধারণ : খলিফা আবু বকর (রা.) যুদ্ধের প্রথম বাহিনীর নেতৃত্বের জন্য প্রাথমিকভাবে জায়েদ বিন খাত্তাবকে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু তিনি দায়িত্ব গ্রহণে অপরাগতা প্রকাশ করে বলেন, তিনি শাহাদতের প্রত্যাশী; আর একজন সেনাপতি শাহাদতের জন্য ব্যাকুল হয়ে লড়াই করলে তার বাহিনী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এরপর খলিফা আবু হুজাইফার মুক্তদাস সালিম এবং পরে খোদ আবু হুজাইফাকে নেতৃত্বের প্রস্তাব দিলে তারাও একই কারণ দেখিয়ে বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন।

অবশেষে খলিফা খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে নেতৃত্ব দেন। খালিদ প্রথমে কিছুটা দ্বিধা করলেও খলিফার পীড়াপীড়িতে দায়িত্ব গ্রহণে সম্মদ হন।

যুদ্ধযাত্রা : অদম্য ও তীক্ষ্ণবুদ্ধি সমরনায়ক খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.) মদিনা থেকে চার হাজার যোদ্ধা সঙ্গে নিয়ে আসাদ গোত্রের অভিমুখে যাত্রা করেন। এগারোটি ইউনিটের মধ্যে এটিই ছিল সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী। তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক।

প্রথমেই তাকে দমন করতে হবে তায়ি গোত্রের বিদ্রোহ। এরপর অপেক্ষা করছে আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ—তুলাইহা বিন খুয়াইলিদ আসাদির নেতৃত্বাধীন বনু আসাদ গোত্র, যারা সে সময় নিজেদের শক্তি ও প্রভাব বিস্তার করে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।

এরপর তার অগ্রযাত্রার লক্ষ্য হবে বনু তামিমÑযেখানে মালিক বিন নুওয়াইরার মতো প্রভাবশালী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তি অবস্থান করছে। এ অঞ্চল ছিল রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ও সামরিকভাবে সংবেদনশীল।

এসব পর্যায় অতিক্রম করে সফল হলে তাকে অগ্রসর হতে হবে ইয়ামামার দিকে, বনু হানিফা গোত্রের মোকাবিলায়। সেখানেই অবস্থান করছে ধর্মত্যাগীদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত বাহিনী—ভণ্ড নবী মুসাইলামার নেতৃত্বে।

অতএব, এ অভিযান শুধু সামরিক অগ্রযাত্রা নয়; বরং তা ছিল এক ধারাবাহিক সংকট-ব্যবস্থাপনার কৌশলগত প্রয়াস, যেখানে প্রতিটি ধাপ ছিল পূর্ববর্তী ধাপের চেয়ে অধিক জটিল ও বিপজ্জনক। আর এই কঠিন দায়িত্বই অর্পিত হয়েছিল সেই সেনানায়কের হাতে, যিনি ঈমান, সাহস ও কৌশল—তিনের অনন্য সমন্বয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

তাই গোত্রে অভিযান

আদি ইবনে হাতেম তায়ি (রা.) ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর বাহিনীর একজন সৈনিক। নিজ গোত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন সম্মানিত, প্রভাবশালী ও দূরদর্শী নেতা।

মুসলিম বাহিনী যখন তায়ি গোত্রের ভূখণ্ড অতিক্রম করছিল, তখন দেখা গেলÑগোত্রের অধিকাংশ লোক মুরতাদ হয়ে গেছে। কেবল ‘গাউস’ ও ‘জাদিলা’ নামক দুটি শাখা ইসলামের ওপর অবিচল রয়েছে। পরিস্থিতি অনুধাবন করে খালিদ (রা.) যখন সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত হলেন, তখন আদি ইবনে হাতিম বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানালেন, ‘আমাকে একদিন সময় দিন। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলি; হয়তো তারা সত্যের পথে ফিরে আসবে।’

তার আবেদন মঞ্জুর করা হলো। আদি (রা.) গোত্রের লোকদের কাছে গেলেন, তাদের উপদেশ দিলেন, সতর্ক করলেন, ঈমানের স্মৃতি জাগ্রত করলেন। তার আন্তরিক আহ্বানে ‘গাউস’ শাখা আবার ইসলামের পতাকাতলে প্রত্যাবর্তন করল এবং ৫০০ মুজাহিদ নিয়ে মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিল। ফলে বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়াল ৪ হাজার ৫০০।

এরপর খালিদ (রা.) অগ্রসর হতে চাইলে আদি (রা.) আবার বললেন, ‘আপনি কি এক হাত দিয়ে যুদ্ধ করতে চান, নাকি দুই হাত দিয়ে?’ খালিদ (রা.) জবাব দিলেন, ‘অবশ্যই দুই হাত দিয়ে।’

আদি (রা.) বললেন, ‘গাউস ছিল আমার এক হাত; আর জাদিলা হলো আমার অন্য হাত। আমাকে জাদিলার কাছে দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিন।’

আবার তিনি নিজ গোত্রের আরেক শাখার কাছে গেলেন। তার প্রজ্ঞা, মর্যাদা ও আন্তরিকতার প্রভাবে ‘জাদিলা’ শাখাও ইসলামে ফিরে এলো এবং আরো ৫০০ মুজাহিদ বাহিনীতে যোগ দিল। এভাবে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৫,০০০-এ উপনীত হলো।

বনি আসাদের সঙ্গে যুদ্ধ

৫,০০০ সৈন্য নিয়ে খালিদ (রা.) বুজাখা অঞ্চলে তুলাইহা আসাদির ৬,০০০ সৈন্যের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হন। সৈন্যসংখ্যার দিক থেকে লড়াইটি প্রায় সমানে-সমান হলেও ঈমানি শক্তির বলে মুসলিমরা তুলাইহার বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। তুলাইহা সস্ত্রীক সিরিয়ায় পালিয়ে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তাকে হেদায়েত দান করেন। সে ইসলাম গ্রহণ করে পারস্য বিজয়ের অভিযানে অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বনু তামিম গোত্রে

এরপর খালিদ (রা.) বনু তামিম গোত্রের অঞ্চলে পৌঁছালেন। বনু আসাদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই তারা যে দ্রুততায় ইসলাম ত্যাগ করেছিল, ঠিক তেমনি দ্রুততায় আবার ইসলামের ছায়াতলে ফিরে এলো। শক্তির ভারসাম্য ও বাস্তব পরিস্থিতি তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল—এ কথা অনস্বীকার্য।

খলিফা আবু বকর (রা.) সেনাপতিদের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে দিয়েছিলেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেনÑকোনো জনপদে যদি আজান ও ইকামতের ধ্বনি শোনা যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা যাবে না; বরং শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নিতে হবে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

এরপর তাদের কাছে জাকাত দেওয়ার আহ্বান জানাতে হবে। যদি তারা জাকাত আদায়ে সম্মত হয় এবং ইসলামের বিধান মেনে চলে, তবে তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কিন্তু যদি তারা জাকাত প্রত্যাখ্যান করে এবং বিদ্রোহের অবস্থানে অবিচল থাকে, তবে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও ঐক্য রক্ষার্থে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ নীতিমালা প্রমাণ করেÑখেলাফত রাষ্ট্রে সামরিক অভিযান শুধু অরাজক প্রতিশোধ ছিল না; বরং ছিল সুসংহত রাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে ধর্মীয় আনুগত্য, আর্থিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা—সবকিছুকেই সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হতো।

মালিক ইবন নুওয়াইরা

মুসলিম বাহিনী যখন বনু তামিম গোত্রের নেতা মালিক বিন নুওয়াইরার বসতিতে পৌঁছায়, তখন খালিদ (রা.) মালিক বিন নুওয়াইরাসহ কয়েকজনকে বন্দি করেন। সে রাত ছিল হিম শীতল। বন্দিদের কষ্ট বিবেচনায় নিয়ে তিনি পাহারাদারদের নির্দেশ দেন—‘বন্দিদের উষ্ণ করো।’

কিন্তু আঞ্চলিক উপভাষায় ‘উষ্ণ করা’ কথাটি আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার অর্থেও ব্যবহৃত হতো। এই ভাষাগত বিভ্রান্তির ফলে পাহারাদাররা নির্দেশের ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করে বন্দিদের হত্যা করতে শুরু করে। গোত্রপতি মালিক বিন নুওয়াইরাকে হত্যার মাধ্যমে তারা কার্যত সেই ভুল ব্যাখ্যার বাস্তবায়ন শুরু করে। কয়েকজন নিহত হওয়ার পর যখন বিষয়টি খালিদের কানে পৌঁছে, তিনি তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে তাদের থামিয়ে দেন।

সে বাহিনীতে উপস্থিত ছিলেন আবু কাতাদা (রা.)। বন্দিদের হত্যার ঘটনায় তিনি খুব ক্ষুব্ধ হন এবং অনুমতি ছাড়াই সরাসরি মদিনায় গিয়ে খলিফার কাছে অভিযোগ করেন।

উমর (রা.) খলিফার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করলে তিনি (রা.) শর্ত দেন—আবু কাতাদাহকে আবার খালিদের বাহিনীতে ফিরে যেতে হবে। তিনি ফিরে যান এবং খালিদের সঙ্গেই অবস্থান করেন। পরে আবু বকর (রা.) ঘটনাটি নিয়ে খালিদকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। খালিদ (রা.) ব্যাখ্যা দিলে খলিফা তা গ্রহণ করেন।

বনু আসাদ ও বনু তামিম গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অর্পিত দায়িত্ব সফলভাবে সম্পাদন এবং উভয় ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ বিজয় অর্জনের পর খলিফা তাকে আবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। এতে প্রমাণ হয়, রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব পুনর্বহাল করা যায়।

দুর্বৃত্তদের দমন

খলিফার নির্দেশে খালিদ (রা.) প্রায় এক মাস বুজাখা অঞ্চলে অবস্থান করেন। এ সময় তিনি আশপাশের দুর্বৃত্ত ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে দমন করেন—যারা সুযোগ পেলেই মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালাত, নির্যাতন করত এবং সাধারণ নাগরিকদের জানমাল ক্ষতিগ্রস্ত করত।

এই বিদ্রোহীদের মধ্যে অন্যতম ছিল উম্মে জিমল ফাজারিয়্যাহ। নবীজির ইন্তেকালের পর সে ইসলাম ত্যাগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। একসময় সে গ্রেপ্তার হয়ে দাস হিসেবে আয়েশা (রা.)-এর অংশে পড়েছিল। আয়েশা (রা.) সদাচরণ করে তাকে মুক্ত করে দেয়েছিলেন। কিন্তু সে এই মহানুভবতার মর্যাদা সে রক্ষা করেনি।

পরে যখন সে খালিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য এগিয়ে আসে, তখন মুসলিম বাহিনী তার নির্বাচিত একশ রক্ষীবাহিনীর কঠোর বেষ্টনী ভেদ করে তাকে পরাস্ত ও হত্যা করে।

তার মৃত্যুর মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব আরব অঞ্চলে চলমান বিদ্রোহ কার্যত স্তিমিত হয়ে আসে এবং সেখানে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ধর্মদ্রোহীদের কাছে খলিফা আবু বকরের পত্র

ফিলিস্তিন অভিযানে উসামার সেনাবাহিনী (শেষ পর্ব)