একসময় মক্কা-মদিনার পথে হজযাত্রা ছিল মাসের পর মাসের দুরূহ ও বিপৎসংকুল সফর। সেই দীর্ঘ পথ সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করতেই উসমানি সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের উদ্যোগে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথ। সিরিয়ার দামেস্ক থেকে সৌদি আরবের মদিনা পর্যন্ত বিস্তৃত এই রেলপথ নির্মাণে উসমানি সালতানাতের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের মুসলমানরাও অংশ নেন। হজসফরের সময় ও কষ্ট কমানোর পাশাপাশি হেজাজের বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং নগরজীবনেও পরিবর্তন আনে এই রেলপথ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও আরব বিদ্রোহের সময় পরিকল্পিতভাবে এই রেলপথের কিছু অংশ ধ্বংস করে ফেলা হয়। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের খেলাফত গ্রহণের ১৫০ বছর উপলক্ষে তার স্বপ্নের হেজাজ রেলপথ নির্মাণ, বিস্তার ও ধ্বংসের ইতিহাস নিয়ে আলজাজিরা অবলম্বনে লিখেছেন সিয়াম আন নুফাইস
‘হেজাজ রেলপথ’ নামটি এসেছে আরব উপদ্বীপের পশ্চিমাঞ্চলের হেজাজ অঞ্চল থেকে, যেখানে অবস্থিত মক্কা ও মদিনা। উসমানী নথিতে একে ‘হামিদিয়া হেজাজ রেলপথ’ ও ‘হেজাজ তিমুর ইয়োলি’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে কোনো কোনো ঐতিহাসিক একে ‘সিল্ক-রেলরোড’ও বলেছেন।
হেজাজ রেলপথের ধারণা দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সময়ের নয়। ১৮৬৪ সালে চার্লস জামপেল দামেস্ককে রেলপথের মাধ্যমে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। এরপর ১৮৭২ সালে ভিলহেলম ফন প্রেসেল, ১৮৭৪ সালে আহমদ রশিদ এবং ১৮৭৮ সালে এলফিনস্টোন ডারলিম্পল আরব অঞ্চলে বিভিন্ন রেলপথ নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন। কিন্তু বিপুল ব্যয় ও অর্থায়নের সংকটে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
পুরোনো স্বপ্নের বাস্তবায়ন
খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ উসমানী সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলকে ইস্তাম্বুলের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে এসব অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও তার লক্ষ্য ছিল। সে সময় হজযাত্রীরা উটের কাফেলায় মক্কা-মদিনায় যেতেন। পথে তাদের সঙ্গী হতো দীর্ঘ যাত্রাপথ, অনিঃশেষ কষ্ট, লম্বা সময়; সঙ্গে থাকত ডাকাতি ও লুটেরাদের হাতে পড়ার আশঙ্কা। এই বিষয়গুলো সুলতানকে তাগিদ দিচ্ছিল।
হেজাজ রেলপথের পরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছিল। ১৮৮০ সালে উসমানী সালতানাতের গণপূর্তমন্ত্রী হাসান ফাহমি পাশা আনাতোলিয়া ও আরব উপদ্বীপকে যুক্ত করার একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৮৮৪ সালে হেজাজের গভর্নর উসমান নুরি রেলপথটির নিরাপত্তাগত গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরে ১৮৯০-এর দশকের শেষদিকে দামেস্কের প্রশাসক আহমদ ইজ্জত পাশা আল-আবিদ তুলনামূলক কম ব্যয়ের একটি প্রস্তাব করেন এবং এর রাজনৈতিক, ধর্মীয়, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সুবিধাগুলো তুলে ধরেন।
১৮৯৭ সালে আহমদ মুখতার পাশা সুলতানের কাছে হেজাজ রেলপথ নির্মাণের পক্ষে আবেদন জানান। ব্রিটিশ প্রভাব ও হেজাজের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তার প্রশ্নও সেখানে গুরুত্ব পায়। ১৮৯৮ সালে উসমানী সালতানাত প্রকল্পটির গুরুত্ব স্বীকার করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে। এ সময় ভারতীয় সাংবাদিক মুহাম্মদ ইনশাউল্লাহ দামেস্ক-মদিনা রেলপথের ধারণাটি মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে দেন।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের কাছে হেজাজ রেলপথ ছিল বহুদিনের স্বপ্ন। ১৮৯৮ সালে তিনি এ নিয়ে স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন এবং ১৯০০ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন। তার লক্ষ্য ছিল মুসলিম বিশ্বের ঐক্য জোরদার করা, হেজাজের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করা এবং উসমানী সালতানাতের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
প্রকল্পের অর্থায়ন
১৯০০ সালে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ দামেস্ক থেকে মদিনা ও মক্কা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের নির্দেশ দেন। রেলপথের পাশাপাশি এর পথজুড়ে সড়ক ব্যবস্থাও গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তার ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, কোনো বিদেশি সহায়তা ছাড়াই উসমানী সালতানাত ও মুসলিম বিশ্বের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক।
প্রকল্পটি ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রকৌশলগতভাবে কঠিন। মক্কা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে আনুমানিক ৪০ লাখ লিরা এবং মদিনা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ লাখ লিরা ব্যয় হওয়ার কথা ছিল—যা ছিল রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। অথচ সে সময় উসমানী সালতানাত ছিল ঋণ-দেনা ও আর্থিক সংকটে জর্জরিত। তবু হেজাজ রেলপথের কাজ শুরু হয়। অর্থ সংগ্রহে উসমানী কৃষি ব্যাংক থেকে ৮ বছরের চুক্তিতে প্রায় ৫ লাখ লিরা ঋণ নেওয়া হয়।
হেজাজ রেলপথ প্রকল্পের অর্থায়নের প্রধান উৎস ছিল তিনটি।
প্রথমত, সরকারি আয়। বিশেষ কর থেকে বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার লিরা, ডাকটিকিট ও হজ-সংক্রান্ত বরাদ্দ থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার লিরা এবং কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ এই প্রকল্পে দেওয়া হয়। এছাড়া কিছু জমিও রেলপথের জন্য ওয়াকফ করা হয়।
দ্বিতীয়ত, সুলতান, রাজপরিবার, আমির-উমারা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত অনুদান। সুলতান নিজে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার তুর্কি লিরা দান করেন। ইরানের শাহ প্রায় ৫০ হাজার লিরা, কুয়েতের আমির ৫০০ লিরা, মরক্কোর সুলতান ৭৫০ ফ্রাঁ, বুখারার আমির ৪০০ ফ্রাঁ এবং মুকাল্লার সুলতান ২০ হাজার রুপি দান করেন। মিসরের খেদিভ আব্বাস হিলমি নির্মাণসামগ্রী ও কাঠ সরবরাহ করেন। হায়দরাবাদের আমির মদিনা মুনাওয়ারায় একটি রেলস্টেশন নির্মাণের অর্থায়ন করেন।
তৃতীয়ত, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান। দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল অঞ্চলের মুসলিমরা ১ হাজার লিরা, সিঙ্গাপুরের মুসলিমরা ৪ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড এবং বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলিমরা ১ লাখ ৫০ হাজার লিরা দান করেন। সব মিলিয়ে অনুদানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার উসমানীয় লিরা, যা প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিল।
নির্মাণকাজ ও ব্যবস্থাপনা
১৯০০ সালের মে মাসে সুলতান হেজাজ রেলপথ নির্মাণের জন্য দুটি কমিটি গঠন করেন। ইস্তাম্বুলভিত্তিক কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান নিজে। আর ইজ্জত পাশা ছিলেন রেলপথ প্রকল্পের প্রধান দায়িত্বশীল। দামেস্কভিত্তিক দ্বিতীয় কমিটির দায়িত্ব ছিল নির্মাণকাজ পরিচালনা; এর সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় সুলতানের জামাতা কাজিম পাশাকে। প্রকৌশলী মুখতার বেককে ভূমি জরিপ এবং জার্মান প্রকৌশলী হেনরিক আগস্ট মাইসনারকে প্রকৌশল বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
রেলপথ নির্মাণে ভূমি জরিপ, পথ ও উচ্চতা নির্ধারণ এবং চূড়ান্ত নির্মাণ—এই তিনটি প্রধান ধাপ অনুসরণ করা হয়। প্রকৌশলগত প্রয়োজনে কিছু পরিবর্তন ছাড়া মূলগতভাবে প্রাচীন শামি হজপথের গতিপথ অনুসরণ করেই রেললাইন স্থাপন করা হয়। অমুসলিমদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে আখদার স্টেশন থেকে মদিনা পর্যন্ত অংশে বিদেশি প্রকৌশলীদের পরিবর্তে আরব প্রকৌশলীরা কাজ করেন।
১৯০০ সালের ১ সেপ্টেম্বর দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০৩ কিলোমিটার টেলিগ্রাফ লাইন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এরপর রেলপথ নির্মাণ শুরু হয়ে ১৯০৩ সালে দামেস্ক–দারআ, ১৯০৪ সালে মাআন এবং ১৯০৬ সালে মাদায়েনে সালেহ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাআন থেকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন শুরু হয় এবং এর আয় পরবর্তী নির্মাণকাজে ব্যয় করা হয়। ১৯০৮ সালে রেলপথ মদিনায় পৌঁছে। মদিনা পর্যন্ত নির্মাণের পর মক্কা থেকে এর দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫০ মাইল।
রেলপথটির মোট দৈর্ঘ্য বিভিন্ন সূত্রে ১,৩২২ থেকে ১,৪৬৫ কিলোমিটার বলা হয়েছে। এতে প্রায় ৪০টি স্টেশন, ২,৬৬৬টি পাথরের সেতু ও পথচারী সেতু, ৭টি লোহার সেতু, ৯টি টানেল, ৭টি জলাধার ও ৩৭টি পানির ট্যাংক নির্মিত হয়। তাবুক ও মাআনে হাসপাতাল এবং হাইফা ও দারআতে ওয়ার্কশপসহ বিভিন্ন স্থানে গুদাম ও রক্ষণাবেক্ষণকেন্দ্রও স্থাপন করা হয়। মদিনার শেষ ৩০ কিলোমিটার রেলপথে সুলতানের নির্দেশে পশম বিছানো হয়েছিল এবং এ অংশের কাছেই আম্বারিয়া মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
ভ্রমণ পথে হাজিদের সেবা
হেজাজ রেলপথ দ্রুতই হজযাত্রীদের জন্য স্থলকাফেলার বিকল্প হয়ে ওঠে। এর ফলে দামেস্ক থেকে মদিনার যাত্রাসময় ৪০ থেকে কমে ৪ দিনে নেমে আসে। এই রেলে ভাড়া ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫০ ব্রিটিশ পাউন্ড। হেজাজ রেলপথ যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রার সুযোগ করে দেয় এবং বেদুঈনদের হামলা থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
রেলপথের আশপাশে স্টেশন ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠায় সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনও ঘটে। যাযাবর গোত্রের স্থায়ী বসতি, কৃষি ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এবং হেজাজে ভ্রমণকারী ও গবেষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। মদিনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্টেশনকেন্দ্রিক নতুন স্থাপনা নির্মাণ এবং হাইফার বন্দর ও বাণিজ্যের প্রসারও রেলপথের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। আম্মানের প্রাথমিক নগরায়ণেও এর প্রভাব পড়ে।
প্রকল্পটি মুসলিম বিশ্বের আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে এবং উসমানী সালতানাতের আর্থিক ও প্রকৌশলগত সক্ষমতারও প্রকাশ ঘটায়। একই সঙ্গে এর সামরিক গুরুত্ব ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্রুত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের মাধ্যমে রেলপথটি ইয়েমেন এবং হেজাজে উসমানী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
ব্রিটিশদের বিরোধিতা ও রেলপথ আক্রমণ
হেজাজ রেলপথ নির্মাণ মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ ও ফরাসি স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে। এ কারণে প্রকল্পটির প্রতি তাদের বিরূপ অবস্থানের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিশেষত ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে রেলপথের জন্য অনুদান সংগ্রহে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রেলপথটি সামরিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠলে এর ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ শুরু হয়। ব্রিটিশদের প্ররোচনায় আরব বিদ্রোহীরা রেললাইন খুলে ফেলে, সেতু ও অবকাঠামো ধ্বংস করে এবং রেলে হামলা করে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ কর্মকর্তা টি. ই. লরেন্স আরব বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমন্বয় করে হেজাজ রেলপথের বিরুদ্ধে পরিচালিত কয়েকটি অভিযানে ভূমিকা রাখেন। এসব নাশকতার ফলে রেলপথের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মদিনার দক্ষিণে এর নিয়মিত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়ে পড়ে। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় লরেন্সের পক্ষ থেকে রেললাইন ধ্বংস বা খুলে ফেলার বিনিময়ে বেদুঈনদের স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে।
রেলপথের অবশিষ্টাংশ ও পুনরায় চালুর চেষ্টা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হেজাজ রেলপথ আবার চালুর কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯১৯ সালের শেষদিকে মদিনা থেকে দামেস্ক পর্যন্ত ট্রেন চলাচল আবার শুরু হয়েছিল। ১৯২১ সালে রেলপথটিকে ইসলামি ওয়াকফের আওতায় নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং এর আয় মক্কা-মদিনার পবিত্র স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ ও হজযাত্রীদের সুবিধায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়। ১৯২৪ সালের লোজান সম্মেলনের পর রেলপথের বিভিন্ন অংশ সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের কর্তৃপক্ষের অধীনে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৫ ও ১৯৫৫ সালে রেলপথ মেরামত ও আবার চালুর বিষয়ে সৌদি আরব, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের মধ্যে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এ ধরনের উদ্যোগও স্থগিত হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালেও পুনরুজ্জীবনের একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটিও আর বাস্তবায়িত হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে হেজাজ রেলপথের ঐতিহাসিক রুটকে ঘিরে নতুন করে আঞ্চলিক রেল যোগাযোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তুর্কিয়ে, সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবের মধ্যে রেল এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ পুনর্গঠনের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথের রুটের সম্ভাব্য সংযোগ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এর লক্ষ্য শুধু পুরোনো রেললাইন পুনর্নির্মাণ নয়; বরং আনাতোলিয়া, লেভান্ত ও আরব উপদ্বীপের মধ্যে একটি আধুনিক আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক করিডোর গড়ে তোলা।
ভবিষ্যতে এ যোগাযোগ সৌদি আরবের বাইরে ওমান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গেও যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে এর বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অর্থায়ন, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়ের ওপর। ফলে বর্তমানের উদ্যোগকে সরাসরি ঐতিহাসিক হেজাজ রেলপথ পুনর্নির্মাণ না বলে, তার ঐতিহাসিক রুট ও ধারণাকে ভিত্তি করে একটি সম্ভাব্য আধুনিক আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার পরিকল্পনা হিসেবে দেখা অধিকতর যুক্তিসংগত।
সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের উদ্যোগে নির্মিত হেজাজ রেলপথ একদিকে হজযাত্রাকে দ্রুত, সহজ ও তুলনামূলক নিরাপদ করেছিল, অন্যদিকে হেজাজ ও আশপাশের অঞ্চলের বাণিজ্য, অর্থনীতি, নগরায়ণ ও সামরিক যোগাযোগেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরও এর ঐতিহাসিক রুটের গুরুত্ব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বরং আধুনিক সময়ে এই রুটকে ঘিরে তুর্কিয়ে, সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন রেল এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন একটি যোগাযোগব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে পণ্য পরিবহন সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ার পাশাপাশি আনাতোলিয়া, লেভান্ত এবং আরব উপদ্বীপের মধ্যে বাণিজ্য, পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পেতে পারে।