বাণিজ্যিক শুল্ক : (আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি)
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পথ সুগম করতে ও দেশীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় খলিফা ওমরের প্রবর্তিত কাস্টমস ডিউটি বা শুল্কব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত আধুনিক, যা ‘ওশর’ নামক বাণিজ্যিক শুল্ক হিসেবে পরিচিত ছিল। বিদেশি অমুসলিম ব্যবসায়ীদের মদিনার বাজারে পণ্য আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হতো, অমুসলিম জিম্মি নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই শুল্ক ছিল ৫ শতাংশ এবং মুসলিম ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা ছিল মাত্র আড়াই শতাংশ। এটি খিলাফতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদকদের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর মওকুফ ও শুল্ক ফেরত নীতি
কাস্টমস বা সীমান্ত শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে খলিফা ওমর (রা.) একটি মানবিক, উদার ও নমনীয় অর্থনৈতিক সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, যা সমকালীন বাণিজ্যনীতিতে এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্দেশ জারি করেছিলেন, কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী যদি খিলাফতের বাজারে কোনো পণ্য নিয়ে আসে, তবে তার পণ্যের মোট মূল্য যদি ন্যূনতম ২০০ দিরহামের নিচে হয়, তবে তার ওপর কোনো ধরনের সীমান্ত শুল্ক আরোপ করা যাবে না। অর্থাৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য তিনি সীমান্ত বাণিজ্য সম্পূর্ণ করমুক্ত রেখেছিলেন, যাতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে।
শুধু তাই নয়, যদি কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী মদিনার বাজারে তার পণ্য বিক্রি করতে না পেরে সেই অবিক্রীত পণ্য নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে চাইত, তবে তার কাছ থেকে আদায় করা সীমান্ত শুল্কের পুরো টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ফেরত দেওয়ার অনন্য নিয়ম চালু ছিল। ওমরের এই শুল্ক ফেরত নীতি প্রমাণ করে, তার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি শুধু রাজস্ব আদায়ের হাতিয়ার ছিল না, বরং তা ছিল বৈশ্বিক মুক্তবাণিজ্যের এক উদার প্রবেশদ্বার। [কিতাবুল খারাজ, ইমাম আবু ইউসুফ]
জিজিয়া : (সর্বজনীন নিরাপত্তা কর)
ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম সক্ষম পুরুষ নাগরিকদের জানমাল ও সামরিক নিরাপত্তার বিনিময়ে এই কর ধার্য করা হতো। মুসলমানদের যেমন বাধ্যতামূলক জাকাত প্রদান এবং দেশের প্রতিরক্ষায় কায়িক শ্রম বা সামরিক সেবা দিতে হতো, অমুসলিমদের জন্য এই জিজিয়া ছিল মূলত সেই নাগরিক ও সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির একটি সাম্যভিত্তিক আর্থিক বিকল্প। তবে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং অক্ষম ব্যক্তিদের এই কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
বিখ্যাত ইমাম আবু উবাইদ কাসিম বিন সালাম (রহ.)-এর ‘কিতাবুল আমওয়াল’ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, মদিনার রাস্তায় এক বৃদ্ধ ও অন্ধ অমুসলিম নাগরিককে অভাবের তাড়নায় ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা ওমর (রা.) ব্যথিত হন। তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ডেকে দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন—‘আল্লাহর শপথ! আমরা এই বৃদ্ধের প্রতি মোটেও ইনসাফ করিনি। আমরা তার যুবক বয়সে তার কাছ থেকে কর (জিজিয়া) আদায় করেছি, আর আজ তার এই বৃদ্ধ বয়সে তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখেছি!’ এরপর তিনি সেই বৃদ্ধ ও তার মতো সব অক্ষম অমুসলিম নাগরিকের ওপর থেকে চিরতরে কর মওকুফ করেন এবং বায়তুল মাল থেকে নিয়মিত আজীবন ভাতার ব্যবস্থা করেন।
খিলাফতের প্রতিরক্ষা সংকট এবং অমুসলিম নাগরিকদের কর ফেরত দেওয়ার ঐতিহাসিক নজির : ইসলামি রাষ্ট্রে এই কর আদায়ের সঙ্গে নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষার বিষয়টি সরাসরি শর্তযুক্ত ছিল, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে সেনাপতি খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ (রা.)-এর প্রবর্তিত ঐতিহাসিক দলিলে। প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.)-এর আমলে ইরাকের হিরাহ অঞ্চলের অমুসলিম নাগরিকদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার সময় তিনি দলিলের শর্তে স্পষ্ট লিখে দিয়েছিলেন, মুসলিম রাষ্ট্র যদি কোনো কারণে তাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তবে তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের কোনো আইনি অধিকার খিলাফতের থাকবে না।
খলিফা ওমর (রা.)-এর শাসনকালে এই নীতিটি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং যুদ্ধকালীন তীব্র সংকটেও এর কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন মুসলিম বাহিনী রণকৌশলগত কারণে হিমস শহর থেকে সাময়িকভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল, তখন খলিফা ওমরের নির্দেশে সিরিয়া অঞ্চলের প্রধান সেনাপতি হজরত আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) স্থানীয় অমুসলিম নাগরিকদের ডেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, যেহেতু এই মুহূর্তে মুসলিম রাষ্ট্র তাদের জানমালের সামরিক নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তাই তাদের কাছ থেকে নেওয়া করের অর্থ ভোগ করার কোনো অধিকার রাষ্ট্রের নেই। এই বলে সংগৃহীত করের লক্ষাধিক দিরহাম অমুসলিমদের মধ্যে হুবহু ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে আদায় করা রাজস্ব জনগণের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার এই অভূতপূর্ব ইনসাফ পৃথিবীর অর্থনৈতিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন [কিতাবুল খারাজ—ইমাম আবু ইউসুফ]।
হিসবাহ ব্যবস্থা ও নৈতিক বাজার অর্থনীতি
বাজারের শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা বজায় রাখতে তিনি ‘হিসবাহ’ বা বাজার পরিদর্শক ব্যবস্থা চালু করেন। মেধা ও যোগ্যতার প্রকৃত মূল্যায়ন করে তিনি প্রখ্যাত নারী সাহাবি হজরত শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রা.)-কে মদিনার মূল বাজার পরিদর্শনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। খলিফা নিজে বাজার পরিদর্শনের সময় ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বলতেন, ‘সুদ কী এবং এর ভয়াবহতা কী, তা না জেনে কেউ যেন আমাদের বাজারে ব্যবসা করতে না আসে; কারণ অবচেতনভাবেই তারা সুদের চোরাবালিতে হারিয়ে যাবে।’ বাজারে মুদ্রাবিনিময় ও সমজাতীয় পণ্য বেচাকেনার ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধে তিনি সবসময় ‘হাতে হাতে নগদ’ লেনদেনের তাগিদ দিতেন। অতিরিক্ত মুনাফার আশায় পণ্য মজুত বা কালোবাজারি করা তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন।
অ্যান্টি-মনোপলি আইন ও মুক্ত বাণিজ্যনীতি
ব্যবসায়ীদের কৃত্রিমভাবে পণ্য মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির প্রবণতা রোধেও তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুত করে না রাখে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে, তারা যেন বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সব খাদ্যশস্য কিনে তা মজুত করে না রাখে।’
তবে তিনি আমদানিকারক ও বাইরে থেকে আসা সৎ ব্যবসায়ীদের বেশ মূল্যায়ন করতেন। তিনি বলতেন, ‘যে ব্যক্তি শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের দেশে খাদ্যশস্য নিয়ে আসে, সে ওমরের মেহমান। অতএব, সে তার আমদানি করা খাদ্যশস্য যে পরিমাণে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারবে, আর যে পরিমাণে ইচ্ছা রেখে দিতে পারবে।’ ভোক্তা অধিকার রক্ষা এবং বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি রোধে খলিফা যেমন কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করতেন, তেমনি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক আমদানিকারকদের জন্য তার ছিল এক চমৎকার উদার ও মুক্ত বাণিজ্যনীতি, যাতে বহিরাগত ব্যবসায়ীরা মদিনার বাজারে ব্যবসা করতে উৎসাহিত হয়।
শ্রমের মর্যাদা ও অলসতার অবসান
তার অর্থনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল আত্মনির্ভরশীলতা ও কর্মোদ্দীপনা। তিনি অলস বসে থেকে ভাগ্যের দোহাই দেওয়া বা স্রেফ দোয়ার ওপর ভরসা করে থাকাকে চরম অপছন্দ করতেন। পরনির্ভরশীলদের উদ্দেশে দেওয়া খলিফার বিখ্যাত উক্তি আজও কর্মস্পৃহার এক অনন্য দলিল : ‘হে মানুষেরা, তোমরা মাথা তোলো! অলস বসে থেকো না, ব্যবসা ও কঠোর পরিশ্রমের দিকে মনোনিবেশ করো। মনে রেখো, আকাশ থেকে কখনো সোনা বা রুপার বৃষ্টি ঝরে পড়ে না।’ তিনি হালাল উপার্জনকে ইবাদতের সমকক্ষ মনে করতেন এবং অন্যের ওপর বোঝা না হয়ে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হালাল উপার্জনের প্রতি তাগিদ দিতেন।
ঋণগ্রস্ত ও পথিকদের সাহায্য
যারা ঋণ পরিশোধে অক্ষম এবং অভাবী মুসাফির বা পথিকদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বায়তুল মাল থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হতো।
সংকট ব্যবস্থাপনা ও বৈশ্বিক মতাদর্শের আলোচনা
সংকট ব্যবস্থাপনায় ওমরের দূরদর্শিতা মানব ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। হিজরি ১৮ সনে আরবে দেখা দেওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের (আমুল রামাদাহ) সময় তিনি তৎকালীন ধনী প্রদেশগুলো থেকে জরুরি খাদ্যশস্য মদিনায় আমদানির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তিনি সাময়িকভাবে জাকাত আদায় স্থগিত করার মতো অসামান্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সে সময় খলিফা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, ‘যতদিন না দেশের শেষ নাগরিক পেট ভরে খেতে পারছে, ততদিন আমি নিজে ঘি বা গোশত স্পর্শ করব না।’
আমর ইবনুল আস, আবু উবাইদা এবং মু’আবিয়া (রা.)-কে পাঠানো চিঠি ও সাহায্য আসার ঐতিহাসিক বিবরণ
এই প্রলয়ঙ্করী সংকটের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন মদিনার আপামর মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খলিফা ওমর (রা.) তৎকালীন সামাজিকভাবে সচ্ছল ও ধনী প্রদেশগুলোর গভর্নরদের কাছে জরুরি রাষ্ট্রীয় সাহায্য চেয়ে ঐতিহাসিক চিঠি পাঠান। তিনি মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.)-কে অত্যন্ত আবেগঘন ও কড়া ভাষায় চিঠি লিখেছিলেন, ‘হে আমর! তোমার নিজের এবং তোমার অধীনদের জীবন কি খুব সুখে ও নিরাপদে কাটবে, যখন আমার আর মদিনার মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে?’
একইভাবে তিনি সিরিয়ার গভর্নর আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.) এবং ফিলিস্তিনের গভর্নর মু’আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.)-এর কাছেও খিলাফতের কেন্দ্রীয় কোষাগারের বিপর্যস্ত দশা উল্লেখ করে জরুরি খাদ্যসহায়তার তাগিদ দিয়ে বার্তা পাঠান। আমিরুল মুমিনিনের এই আকুল রাষ্ট্রীয় আহ্বান শোনামাত্রই দূরবর্তী প্রদেশগুলোর গভর্নররা মদিনা অভিমুখে অভূতপূর্ব এক ত্রাণের কাফেলা প্রেরণ করেন।
মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস (রা.) লোহিত সাগর হয়ে সমুদ্রপথে মদিনার বন্দর পর্যন্ত সরাসরি ২০ হাজার ইরদাব খাদ্যশস্যবোঝাই জাহাজের বহর পাঠান। অন্যদিকে সিরিয়া থেকে প্রখ্যাত সাহাবি আবু উবাইদা (রা.) চার হাজার উটের এক সুবিশাল খাদ্যকাফেলা সশরীরে মদিনায় নিয়ে আসেন, যার প্রথম উটটি যখন মদিনার সীমান্তে প্রবেশ করছিল, তখনো কাফেলার শেষ উটটি সিরিয়ার সীমানা ছাড়ায়নি। একইভাবে ইরাক থেকেও উটের পিঠে আটা ও ঘি বোঝাই করে মদিনার লঙ্গরখানাগুলোতে সরবরাহ করা হয়।
তৎকালীন খিলাফতের দূরবর্তী প্রদেশগুলোর সমন্বিত সরবরাহচেইন এবং খলিফা ওমরের কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নীতি আরবের লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। [তারিখুত তবারি—ইমাম তবারি, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া—ইবনে কাসির]
প্রকৃতপক্ষে, বিগত তিনশ বছরে মানবজাতি পাশ্চাত্যের নেতৃত্বে প্রধান চারটি অর্থনৈতিক মতাদর্শের পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রত্যক্ষ করেছে; যেগুলো হলো পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদী-ফ্যাসিবাদ এবং তথাকথিত কল্যাণমূলক রাষ্ট্র। এসব মতবাদই মূলত এমন ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যে, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতার ভূমিকা অপরিহার্য নয়, বরং শুধু বস্তুগত উপাদানই যথেষ্ট। এই দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে পুঁজিবাদ গড়ে তুলেছিল লাগামহীন ব্যক্তিমালিকানা এবং মুনাফার অন্ধ মোহ। এর বিপরীতে সমাজতন্ত্রের দর্শন মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি খুঁজতে চেয়েছিল কঠোর রাষ্ট্রীয় মালিকানা ও ব্যক্তিস্বাধীনতাহীন কেন্দ্রীয় পরিকল্পনায়, যা ইতিহাসের পাতায় নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। আর মিশ্র অর্থনীতি বা কল্যাণমূলক পুঁজিবাদও মানবজাতির প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে সম্পূর্ণ সফল হতে পারেনি।
২৬. জরুরি খাদ্য সরবরাহ আইন ও রেশনিং ব্যবস্থা
হিজরি ১৮ সনের দুর্ভিক্ষের তীব্রতা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন খলিফা ওমর (রা.) তৎকালীন খিলাফতের ইতিহাসে প্রথম ‘জরুরি খাদ্য ও সরবরাহ আইন’ কার্যকর করেন। তিনি মদিনার চারপাশের সমস্ত সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ চেকপোস্টগুলোতে সরকারি পরিদর্শক দল নিয়োগ করেন, যাতে কেউ কোনো খাদ্যশস্য মদিনার বাইরে পাচার করতে না পারে কিংবা শহর অঞ্চলের বাইরে নিয়ে চড়া দামে কালোবাজারি করতে না পারে।
এই সংকটকালীন সময়ে তিনি মদিনার প্রতিটি নাগরিকের জন্য দৈনিক রেশন বা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য বরাদ্দ নিশ্চিত করেছিলেন, যার তদারকি খলিফা নিজে রাতের অন্ধকারে পিঠে খাদ্যের বস্তা বহন করে সাধারণ মানুষের তাঁবুতে তাঁবুতে গিয়ে করতেন। রাষ্ট্রের সম্পদ বণ্টন এবং নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকারকে তিনি এতটাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তিনি ঘোষণা করেছিলেন—রাষ্ট্রের শেষ খাদ্যদানাটি অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত কোনো একটি পরিবারকেও ক্ষুধার্ত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে দেওয়া হবে না।
তার এই কঠোর রেশনব্যবস্থা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মডেল হিসেবে স্বীকৃত। [তারিখুত তবারি—ইমাম তবারি, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া—ইবনে কাসির]
২৭. সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ও সমাধান
ইতিহাসের পাতা ও সমসাময়িক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তুলনামূলক আলোচনা করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, আধুনিক বিশ্ব আজ যে ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ (Welfare State) কিংবা সর্বজনীন সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর তাত্ত্বিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করছে, খলিফা উমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক দর্শনে তা আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই বাস্তব রূপ লাভ করেছিল।
বর্তমানের নাগরিক ডেটাবেস, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ করা শিশু বা প্রবীণ ভাতা—কোনোটিই খিলাফতি অর্থব্যবস্থায় শুধু সাময়িক দয়া বা বিলাসিতা ছিল না, বরং তা ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অলঙ্ঘনীয় আইনি অধিকার। শত শত বছর ধরে চলে আসা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিটির গুরুত্ব অনুধাবন করেই বিশিষ্ট ইসলামি অর্থনীতিবিদ ড. এম উমর চাপরা তার বিখ্যাত গবেষণাগ্রন্থ ‘Islam and Economic Challenge’-এ এই বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক উন্মোচন করে মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য উমর (রা.)-এর খেলাফতের সেই কালজয়ী মডেলের দিকেই নির্দেশ করেছেন।
তিনি উল্লেখ করেছেন, হজরত ওমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদের মতো শোষক ছিল না, আবার সমাজতন্ত্রের মতো ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণকারীও ছিল না; তা ছিল নৈতিক মূল্যবোধ, মুক্তবাজারের সুস্থ প্রণোদনা, কঠোর জবাবদিহি ও মানবিক বণ্টনের এক অপূর্ব ভারসাম্য।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আয়নায় ওমর (রা.)-এর এই কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা আজ একবিংশ শতাব্দীর বৈষম্যপীড়িত বিশ্ব অর্থনীতি ও আধুনিক বাজার সিন্ডিকেটের ক্রান্তিকাল থেকে মানবতার মুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী দিকনির্দেশনা।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়