কোনো বিপ্লব শুধু রাজপথে সংঘটিত হয় না। রাজপথের উত্তাল দিনগুলো একসময় ইতিহাস হয়ে যায়, আর ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখে সংস্কৃতি। আমাদের প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। অথচ মুক্তিযুদ্ধ আমাদের কাছে অচেনা নয়। সাহিত্য, ইতিহাসচর্চা, চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, সাক্ষাৎকারসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে একাত্তরের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়েছে। একটি প্রজন্মের দেখা ইতিহাস এভাবেই পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়েছে। জুলাইয়ের ক্ষেত্রেও তাই। জুলাইকে সাংস্কৃতিকভাবে ধারণ করা না গেলে সময়ের স্রোতে একদিন হয়তো তার রক্তাক্ত দিনগুলো, তার দ্রোহ, তার স্বপ্ন—সবই বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যাবে। আগামী প্রজন্ম তখন হয়তো জানবেই না, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একটি প্রজন্ম কীভাবে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, কীভাবে বুকের রক্তে লিখেছিল নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা।
সেই দায়বোধ থেকেই ব্রহ্মপুত্র তীরের প্রতিরোধগাথা আঁকার এই প্রয়াস। নাম জানা-অজানা অসংখ্য বীরের আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও দ্রোহের কথকতা নিয়ে মোতাছিম বিল্লাহ্র ‘জুলাই গীতিকা’—The Ballad of Revolution। জনমুক্তি নিবেদিত এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন জুলাইপন্থি সুধীজন, ছাত্র প্রতিনিধি থেকে শ্রমজীবী প্রান্তিক মানুষ। জুলাই আমাদের কী দিয়েছে, কী দেয়নি, কী দিতে পারত—সে প্রশ্নেরও অনুসন্ধান রয়েছে এখানে।
জুলাই নিয়ে ইতোমধ্যে যে কাজগুলো হয়েছে, তার বড় একটি অংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। ঢাকায় আন্দোলনের ব্যাপকতা ও কেন্দ্রীয় গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু জুলাইয়ের উত্তাপ শুধু রাজধানীর রাজপথে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রত্যন্ত জনপদ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিরোধের আগুন। ঢাকার পর ময়মনসিংহেই শহীদের সংখ্যা সর্বাধিক—৪১ জন। অথচ প্রান্তের এই রক্ত, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের ইতিহাস জাতীয় পরিসরে তেমনভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। ‘জুলাই গীতিকা’ সেই অনুল্লিখিত অধ্যায়কে সামনে আনার একটি উদ্যোগ। ময়মনসিংহকে ধারণ করলেও এর তাৎপর্য কেবল একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরের জুলাই-বাস্তবতাকেও বোঝার একটি জানালা খুলে দেয় এই কাজ।
জুলাইয়ের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ঢাকার বাইরের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদানও আলোচিত হয়েছে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে আলাদা করে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্যান্স ডে’; মাদরাসার শিক্ষার্থীদের অবদানও নানা উদ্যোগে স্মরণ করা হয়েছে। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই তুলনায় অনেকটাই উপেক্ষিত। অথচ ঢাকার বাইরের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ছিল তারাই। ময়মনসিংহে উচ্চশিক্ষার বড় বড় প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও জুলাইয়ের রাজপথে নেতৃত্বের যে চিত্রটি দৃশ্যমান হয়েছিল, সেখানে আনন্দ মোহন কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাই ছিলেন অগ্রভাগে; আন্দোলনের গতি ও নেতৃত্বে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এই প্রান্তিক অথচ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিকেই সামনে আনার চেষ্টা করেছে ‘জুলাই গীতিকা’।
কিছু মানুষ থাকেন, যারা কাজের পেছনে ছোটেন লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই। এরা কর্মী ও সাধক। এই কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তেমনই একদল তরুণ। পেশাদার নির্মাণের অভিজ্ঞতা যেমন তাদের নেই; চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা কিংবা তথ্যচিত্র নির্মাণে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও তেমন কারো নেই। কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে সক্রিয় এই তরুণদের মধ্যে ছিল একটি তাগিদ—জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না তার রক্ত, দ্রোহ ও জনআকাঙ্ক্ষাকে। জুলাইকে ধরে রাখার সেই আকাঙ্ক্ষায় গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহ থেকে চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনা ও অন্যান্য কারিগরি পর্যায়ে নিজেদের শ্রম ও সময়কে একত্র করেছেন তারা।
একটি ডকুমেন্টারি হয়তো সমগ্র জুলাইয়ের যথার্থ দর্পণ হয়ে উঠতে পারে না। সীমাবদ্ধতা থাকে, সংকট থাকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতারও। তবু একটি সময়কে ধরে রাখার এই উদ্যোগের মূল্য তার কারিগরি সীমাবদ্ধতার চেয়ে অনেক বড়। কারণ ইতিহাস শুধু দলিলের পাতায় বেঁচে থাকে না; মানুষের স্মৃতি, শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক নির্মাণের মধ্য দিয়েও তার উত্তরাধিকার বহমান থাকে।