চমকে ওঠার দিনগুলোয় একদিন আমরা আরেক তরফা চমকে উঠলাম, যখন পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, সত্য দেখে ফেলার অপরাধে ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র একজন মেজরকে হত্যা করেছে। মেজরের নাম জাহিদ। এবং এ-ও জানতে পারলাম, রাষ্ট্রের সব নাগরিক যাতে জাহিদকে চিরকাল ঘৃণা করতে শেখে, সে জন্য রাষ্ট্র তার কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রথমে জঙ্গি সদস্য এবং পরে জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রশিক্ষক হিসেবে প্রচার করে।
এ কথা জানার পর বিস্ময়ে আমাদের চোখ যখন কপালে উঠে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখন মিডিয়ার হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ে আরেকটি রিপোর্ট। যেখানে দেখা যায়, রাষ্ট্র শুধু জাহিদকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তার বউকেও জঙ্গি সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সমূহ চেষ্টা করে এবং তাকে দুই শিশুসন্তানসহ টর্চার সেলে বছরের পর বছর আটকে রেখে গলার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে পেট থেকে একের পর এক কথা বের করে আনতে সক্ষম হয়; আর সেসব কথা দিয়ে তৈরি হয় ধারাবাহিক ন্যারেটিভ । আর আমরা ভুলে যাই পিলখানা নামক বাংলাদেশের দিলখানা থেকে কীসব কীসব রগ কেটে ফেলে কীসব কীসব রগ জোড়া লাগিয়ে ফিটিং করা হয়েছে।
এমন দুটো ঘটনা একসঙ্গে শোনার পর আমাদের কী করা উচিত, তা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বুঝতে না পেরে স্ট্যাচুর মতো স্থির হয়ে যাই। তখন আমাদের মনে পড়ে আবরার ফাহাদের কথা—ছেলেটা অল্প বয়সে কত সহজেই না সত্য দেখে ফেলেছিল। মনে পড়ে যায় নায়কের মতো দেখতে মেজর সিনহার মুখটা। মেজর জলিল, জহির রায়হান। সত্য দেখে ফেলার অপরাধে যাদের করুণ পরিণতি বরণ করতে হয়েছে।
এতগুলো ঘটনা একসঙ্গে চোখের ভেতর ভিড় করে ফেলায় মনে হয় অশরীরী কিছু একটা হয়ে গেছি। মনে হয় পায়ের নিচে মাটি নেই। অথবা পায়ের নিচে মাটি কোনোকালেই ছিল না। মনে হয় কোনোকালেই আমরা পৃথিবীর কেউ ছিলাম না। এসব ভাবতে ভাবতে পাগলের মতো মন কেবল দৌড়াতে থাকে, দৌড়াতে দৌড়াতে কোথায় যেন যেতে চায়; কিন্তু পারে না, হাঁপাতে হাঁপাতে আবার ফিরে আসে; কিন্তু ঘরে ফেরে না। বুড়িগঙ্গা থেকে অজু করে আজিমপুর কবরস্থানে যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, শত শত কবরের মধ্যে কোনটা মেজর জাহিদের তা শনাক্ত করতে পারে না। তারপর খুঁজতে খুঁজতে যখন হয়রান, তখন জানা যায়, মেজর জাহিদের কবর শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম কোথায় দাফন করেছে, এখন তারা নিজেরাও ঠিকঠাক বলতে পারে না। বলতে পারেন না কেন? প্রশ্ন করলে কেরামত আলী জানান, লাশ নাকি মর্গের ড্রয়ারে আড়াই বছর বন্দি ছিল। এতদিন আলোবাতাসহীন বাক্সে বন্দি থাকলে কোনো লাশই শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
ঠিক তখন আমরা আরেক তরফা চমকিত হই এবং শুনতে পাই কারা যেন হাসে। কবরস্থানে হাসির শব্দ! আমরা ভয় পাই। ভয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করি। তখন আমাদের আশ্বস্ত করতে কবরখোদক কেরামত আলী জানান, ‘ভয়ের কিচ্ছু নাই। এমুন হাইস আমি অহর্নিশই শুনি। তাইনেরা খালি হাসে। কাউরে কিচ্ছু করে না।’
‘তাইনেরা মানে! কারা!’
আমাদের বিস্মিত চোখ-মুখ দেখে কেরামত আলী যেন হাসির মওকা পায়। হাসতে হাসতে বলেন, ‘তাইনেরা যে কারা, তা আমি নিজেও জানি না। আমি শুধু তাইনেদের হাইস শুনতে পাই।’
‘শুধু কী হাসিই শুনতে পান! কান্না শুনতে পান না?’
‘জি, কান্নাও শুনতে পাই। তবে এখানে নয়, ওই কোনাটায়। ওইখানে একখান পাকা কবর আছে, ওটার কাছাকাছি গেলেই মানুষের মতো কে যেন চিৎকার করে।’
আমরা তখন ওই কোনাটার দিকে তাকাই; কিন্তু ভয়ে ওদিকে পা চলে না। কয়েক পা এগিয়ে একনজর কবরটা দেখার চেষ্টা করি। তখনই চোখে পড়ে সমাধিফলকটি। আমরা অদূরে দাঁড়িয়েই অনুমান করি সমাধিটা সাদা মার্বেল পাথরে নির্মিত, যা সাধারণত দৃঢ়তা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। ফলকের ওপরের অংশে খেদাই করা সূক্ষ্ম কারুকাজও চোখে পড়ে। একটু কাছাকাছি যেতে পারলে হয়তো নাম-ধাম-ছবিটাও-ছবিটাও স্পষ্ট হতো। কিন্তু ভয়, যদি চিৎকার করে ওঠে!
আমরা কেরামত আলীর দিকে তাকাই—‘আ পনি ভয় পান না?’
‘কী যে কন! লাশ দাফন-কাফন নিয়া যার কাজকাম, তার আবার ডর-ভয় কী? হাসি-কান্নাতেই বা তার কী আসে-যায়? আমি শুধু জানি খন্তা-কোদাল চালায়া কবর করা। আর জানি কবর দিলেই সব শেষ হয়ে যায়; হাসি-কান্না-চিৎকার সব।’
আমরা বুঝতে পারি, কেরামত আলীর কাছে কোনো উত্তর নাই। অবশ্য উত্তর আমাদের কাছেও নেই। আমরা তখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। মনে পড়ে সংসারে কত কাজ আমাদের। আমরা আমাদের কাজের দিকে ধাবিত হই। আমরা কবরস্থানের মেইন গেটের দিকে পা চালাই।
এমন সময় শুনতে পাই পেছনে কারা যেন হাসে। আমরা পেছন ফিরে তাকাই। কেরামত আলী ছাড়া আর কাউকে দেখা যায় না। আর দেখা যায় নয়া-পুরান মিলিয়ে সারি সারি অজস্র কবর।
আমরা ভয় পাই। বলতে গেলে একপ্রকার দৌড়েই গেটের দিকে হাঁটতে থাকি। পেছনে পড়ে থাকে সারি সারি কবর আর হাসি-কান্না-চিৎকার; আর থাকে কেরামত আলী, যে শুধু কবর দিতে জানে। আর জানে কবর দিলেই শেষ। হাসি-কান্না-চিৎকার সব।