হোম > সাহিত্য সাময়িকী > অনুবাদ গল্প

জুতো

রবিউল কমল

নিযার রামাল্লা যাবে। কিন্তু কেন যাবে, সে কথা কেউ জানে না। পরিস্থিতিও ভালো নয়। রাস্তায় রাস্তায় সামরিক চেকপয়েন্ট। আর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাদামাটির বাঁধ টপকানো সহজ নয়। তবুও নিযার জিদ করেছে, যাবেই।

নিযারের কথা, ‘একটা সমস্যা হয়েছে, রামাল্লা গেলে সমাধান হবে। আমাকে যেতেই হবে। রাস্তার সব কষ্ট সহ্য করব। আমরা তো এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি! ওরা জানে না, আমাদের জীবনের সব অস্বাভাবিক বিষয়কে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করে ফেলেছে। আমরা কি বসে থাকব? মরে যাব? কীসের জন্য অপেক্ষা করব?’

সে গাড়িতে ওঠে। যেভাবেই হোক, রামাল্লা পৌঁছতেই হবে।

পাহাড়ি পথে চলছে গাড়ি। এক কিলোমিটার পাকা রাস্তা, তারপর আরেক কিলোমিটার কাঁচা পথ। নিযার জানালার বাইরে পাহাড়ের দিকে তাকাল। আসলে মানুষ কোনো না কোনো পথ খুঁজে নেয়। ফিলিস্তিনিরা যেন একদল পিঁপড়ে। যারা ঘর ভেঙে গেলে, রাস্তা ধ্বংস হলে আবার নতুন পথ খুঁড়ে নেয়। পবিত্র মাটি সরিয়ে গভীরে নিয়ে যায়, যতক্ষণ না বাঁচার মতো ছোট্ট আশ্রয় খুঁজে পায়। সেটাই যথেষ্ট। আবার চলতে শুরু করে। হয়তো মিনিটের মধ্যেই ওদের আশ্রয়টা ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু থেমে থাকে না।

কাঁচা পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষ। দূর থেকে তাদের কালো ঢিবির মতো লাগে। কষ্ট হলে ওরা থামে, আবার উঠে দাঁড়ায়। যেভাবেই হোক পৌঁছতে হবে। এই পথ হাঁটা যেন নরকের পথে হাঁটার মতো। কেউ লাফিয়ে পার হচ্ছে, কেউ দেয়াল টপকাচ্ছে। অথচ এক ঘণ্টা পরই হয়তো বুলডোজার এসে এই পথটা ভেঙে দেবে। পাথর, মাটি ও সিমেন্ট ফেলে বন্ধ করে দেবে সব রাস্তা। তবুও এই কালো ঢিবিরা থামে না। চারপাশ দেখে, নিঃশ্বাস ফেলে, আবার পথ খোঁজে। আরেকটা নতুন পথ। পবিত্র ভূমির মানুষের এ এক চিরন্তন জেদ।

নিযারও চলছিল তাদের মতোই। ক্ষোভে ফুঁসছিল। পা ব্যথায় জ্বলে যাচ্ছে, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আবার উঠে দাঁড়ায়। এক বৃদ্ধের হাত ধরে এগোতে লাগল। এখন মনে হচ্ছে, রামাল্লা পৌঁছনো তার লক্ষ্য নয়। বরং এই চেষ্টার জেদটাই আসল জয়। এটাই বিজয়।

রোদের তাপে রাস্তার ধুলো যেন আগুন হয়ে আছে। সামনে গেলে বাধা, পেছনে গেলে অপমান। দুই দিকেই ওদের কষ্ট। নিযার ভাবল, সামনে যেতে হবে। রামাল্লা পৌঁছনো মানেই প্রতিরোধ। ভেঙে না পড়া মানে বেঁচে থাকা। একটি জাতি বেঁচে আছে এই যুক্তিতে—‘টিকে থাকো, না হয় মরো।’

প্রতিটি পাহাড় পার হওয়া যেন একেকটা জয়। সে এক গাড়ি থেকে আরেক গাড়িতে উঠছে। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে নামছে। এক চেকপয়েন্ট থেকে আরেকটায় যাচ্ছে। ছয় ঘণ্টা কেটে গেছে। সে ভাবল, ‘ছয় ঘণ্টা কিছুই নয়। অনেকের দশ ঘণ্টা লাগে।’ অবশেষে পৌঁছল কালান্দিয়া শরণার্থী শিবিরের সামনে। এখানেই শেষ চেকপয়েন্ট। আর মাত্র এক ধাপ, তাহলেই তার জয়।

দীর্ঘ সারি। গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে। সে নেমে পড়ল, চারপাশ দেখল। রাস্তার দুপাশে ভিড়। নারী, শিশু, বৃদ্ধ, তরুণ, শ্রমিক, ছাত্র, গাধা—সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ওরা ক্লান্ত। নিযার একটি সারিতে দাঁড়াল।

নিযার শুনতে পেল কেউ বলছে, ‘আজ কাউকে যেতে দেবে না, কেবল যাদের অনুমতি আছে তারা পারবে।’

আরেকজন বলল, ‘আমার তো অনুমতি নেই। কিন্তু ফিরব না, যেভাবে হোক যাবই।’

সে সামনে গিয়ে কংক্রিটের দেয়ালের সামনে দাঁড়ায়। সেখানে কয়েকজন তরুণ সেনা পাহারায় আছে। তাদের কারো কারো বয়স এখনো আঠারো হয়নি। তাদের সামনে শত শত নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধ অপেক্ষা করছে। কেউ কাঁদছে, কেউ অনুরোধ করছে, কেউ অসুস্থ—কিন্তু সব বৃথা। সেনাদের উত্তর একটাই, ‘না মানে না।’

ধীরে ধীরে চাপ বাড়ছে। এক সেনা ভিড়ের মধ্যে গ্যাসবোমা ছুড়ল। চারদিকে ধোঁয়া। তাতে কাশি ও দম বন্ধ হওয়ার দশা। কিন্তু পরিস্থিতি একটুও বদলায় না।

ভিড় আবার এগোতে শুরু করে। নিযারও এগোল। কংক্রিটের দেয়ালের সামনে দাঁড়ায়। তারপর সরু গলিপথে ঢোকে।

‘এই! তুমি কোথায় যাচ্ছ?’

‘ওপারে যাব।’

‘অনুমতি আছে?’

‘না।’

‘তাহলে ফিরে যাও।’

‘কিন্তু ভাই, আমি অনেক দূর থেকে এসেছি, জরুরি কাজ আছে।’

‘আমার তাতে কিছু যায়-আসে না। ফিরে যাও বলছি, না হলে গুলি করব।’

‘কেন গুলি করবে? আমি তো নিরস্ত্র।’

‘আমি বলেছি না, নিষেধ আছে।’

নিযার থামল। তারপর শান্ত স্বরে বলল, ‘আমার পরিচয়পত্র রেখে দাও। ফেরার পথে নিয়ে যাব।’

‘এসবের প্রয়োজন নেই। নিষেধ মানে নিষেধ।’

নিযার অনুনয় করল, ‘ভাই, আমাকে যেতে দাও।’

এ কথা শুনে সেনা হাসে। সে যেন মজা করার সুযোগ পেল। সে বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি যেতে পারবে, যদি টুপি খুলে রাখ।’

নিযার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর টুপি খুলে দূরে ছুড়ে ফেলে বলল, ‘এখন যেতে পারি?’

সেনা হো হো করে হেসে বলল, ‘এখনো শেষ হয়নি। আরো শর্ত আছে।’

নিযার বুঝল, অন্তত এক ধাপ এগিয়েছে।

‘ঠিক আছে, আর কী চাও?’

‘তুমি জুতো খুলে এখানে রেখে যাও। ফেরার সময় নিয়ে যেও।’

নিযার অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এটা কি রসিকতা? নাকি সত্যি?

‘এই গরমে, ভাঙা কাচের মধ্যে খালি পায়ে কীভাবে হাঁটব?’

‘যদি না দিতে চাও, তাহলে ফিরে যাও।’

নিযার মাথা নিচু করল। চোখের সামনে সূর্য, ধুলো, ঘাম, কষ্ট ভেসে ওঠে।

‘ঠিক আছে,’ সে দৃঢ়ভাবে বলল।

তার পুরোনো জুতোজোড়া খুলে কংক্রিটের ওপর রাখল। সেনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নিযার কোনো অনুমতির অপেক্ষা না করেই সামনে হাঁটল।

সেনা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এই, দাঁড়াও! শর্ত শেষ হয়নি!’

তবে নিযার থামল না।

সেনা বলল, ‘যাওয়ার আগে আমার জন্য এক গ্লাস চা নিয়ে এসো।’

সে এবার সেনার দিকে তাকায়। তার গাল বেয়ে গাম গড়িয়ে পড়ে। সে পেছনে গেল। পাঁচ মিনিট পর ফিরে এলো বড় গ্লাসের মধ্যে চা নিয়ে। সেনা চায়ে চুমুক দিতে দিতে হেসে ফেলল।

নিযার অবশেষে চেকপয়েন্ট পার হলো। সে এখন রামাল্লার পথে। তার কাছে এটুকুই জয়।

চার ঘণ্টা পর নিযার ফিরে এলো। চেকপয়েন্টের আগে নতুন জুতো খুলে প্লাস্টিক ব্যাগে রাখে। কারণ কথা ছিল সে খালি পায়ে ফিরবে।

সে এগিয়ে গেল সেনার দিকে। তারপর বলল, ‘আমি ফিরে এসেছি। আমার জুতো কোথায়?’

সেনা জোরে জোরে হাসছে। আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওখানে।’

নিযার ডান পা ঢোকাল জুতোর মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে ওঠে! ভেতরটা ভিজে আছে। জুতো তুলে দেখল, ভিতরে হলদে, কাদা মেশানো তরল। তাতে সেনারা হেসে লুটোপুটি।

নিযার শান্তভাবে জুতো ঝাঁকায়। পাশে থাকা সংবাদপত্র দিয়ে মুছল। যে সংবাদপত্রের পাতায় জাতিসংঘের ও আরব দেশের বৈঠকের খবর। তারপর জুতো পরে কয়েক পা এগোল। আবার থেমে গেল, ফিরে দাঁড়াল সেনাদের দিকে।

এক সেনা জিজ্ঞেস করল, ‘কী চাও আবার?’

নিযার কিছু বলে না। চারপাশে তাকাল কয়েকবার। তারপর জুতো খুলে কংক্রিটের ওপর রাখে। চোয়াল শক্ত করে দীপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘শেষ একটা কথা বলব। যতদিন তোমরা আমাদের জুতোর মধ্যে মূত্রত্যাগ করবে, আমরা তোমাদের চায়ে করব। ততদিন দুই জাতির মধ্যে শান্তি আসবে না। বুঝেছ?’

এ কথা বলেই নিযার মানুষের ভিড়ে মিশে গেল। খালি পায়ে।

নাসার ইব্রাহিম ফিলিস্তিনের বেইত সাহুর শহরের একজন লেখক। তিনি বেথলেহেম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া লেবাননের বৈরুত শহরের লেবানিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন।

তিনি লেখার মাধ্যমে গভীর মানবিকতায় ফিলিস্তিনের সাহিত্য, সংগ্রাম ও মানুষের দৈনন্দিন প্রতিরোধের গল্পগুলোকে তুলে ধরেছেন। ‘দ্য শুজ’ তার অন্যতম বিখ্যাত ছোটগল্প। এই গল্পটি ২০০৬ সালে ওয়ার্ডস উইদাউট বর্ডারে প্রকাশিত হয়েছিল।

বাইরে কিছু পুড়ছে

আধুনিক দুনিয়ায় সৌন্দর্যচিন্তা