বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপে দেশের হস্তচালিত বেকারি শিল্প। দিন-রাতের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ না থাকা এবং গ্যাসের চাপ না থাকায় চুলা জ্বালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে বেশি খরচে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করে কোনো রকমে উৎপাদন চালু রাখছেন অনেক উদ্যোক্তা।
এর মধ্যে কাঁচামালের দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। উৎপাদন কমলেও কারখানার ভাড়া, শ্রমিকের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় কমেনি। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে না পেরে বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে দেশের অন্তত ১২০০ হস্তচালিত বেকারি।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিতে ছোট বেকারিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে রুটি, বিস্কুট ও পাউরুটির দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড বিস্কুট প্রস্তুতকারক সমিতি। আজ শনিবার থেকে এসব পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক রেজু জানান, সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা সমিতির প্রায় ১২ হাজার সদস্য বর্তমানে চরম ব্যবসায়িক সংকটের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
অধিকাংশ কারখানা গ্যাসনির্ভর জানিয়ে তিনি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিন ঘণ্টাও গ্যাসের চাপ থাকে না। কিছু পণ্য বিদ্যুতে উৎপাদন হয়। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন হয়। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শ্রমিকদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে।
বেকারি শিল্পের অধিকাংশ উদ্যোক্তাই স্বল্প পুঁজির উল্লেখ করে রেজু বলেন, উৎপাদন কমলেও খরচ কিন্তু বেড়েই চলেছে। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না। অনেকেই দেনায় জর্জরিত। হাজার হাজার কারখানার মালিকই পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হওয়ার অবস্থা। এ এবস্থা আরো কিছুদিন চলতে থাকলে অন্তত ১০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
সমিতির নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক মাসে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি বেকারি শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামালের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২২০০-২২৫০ টাকা দামে প্রতি বস্তা ময়দার দাম বেড়ে হয়েছে ৩১৫০-৩২০০ টাকা। এক বস্তা চিনির দাম ৪,৬০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫,৯০০ টাকা। প্রতি ড্রাম তেলের দাম ২,৭০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩,৪০০ টাকা। ২৫০০ টাকার ডালডা বিক্রি হচ্ছে ৩,০০০ টাকায়। ৭ টাকার ডিম প্রতি পিস কিনতে হচ্ছে ১১ টাকায়। দাম বেড়েছে দুধ, ইস্ট, পলিব্যাগসহ সবকিছুরই। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়ে শনিবার থেকে উৎপাদিত পণ্যের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানান তারা।
তবে দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সমিতির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়নি জানিয়ে ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির ফলে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগের দামে পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই বাধ্য হয়েই বর্ধিত দামে বেকারি পণ্য সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত সহযোগিতা পাওয়া না গেলে এ খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসবেন।
জানা যায়, মূল্য সমন্বয়ের জন্য সমিতির সদস্য বেকারিগুলো গত কয়েকদিন কোনো পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করেনি। ফলে বাজার বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়। মুদি দোকানগুলোতে ব্রেড পাওয়া যায়নি। ফুটপাথের চা দোকানগুলোয় রুটি-বিস্কুট, কেক না থাকায় পথচারি ও শ্রমজীবী মানুষদের চরম বেকায়দায় পড়তে হয়।
বাড়তি বা সমন্বয়কৃত দামের ধারণা দিতে গিয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও হক ব্রেডের কর্ণধার রেজাউল হক রেজু বলেন, ৫০ টাকার পাউরুটির দাম হবে ৬০ টাকা। ১০ টাকার বনরুটি ১৫ টাকা। ১০ টাকার কেক বিক্রি হবে ১৫ টাকায়। আর ৫ টাকার বিস্কুট ৫ টাকাতেই বিক্রি হবে তবে আকার কিছুটা ছোট হবে।
সামগ্রিকভাবে মার্কেটের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের দাম ২০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ১০ টাকা বনরুটি ১৫ টাকায় বিক্রি করতে তো দাম ৫০ পার্সেন্ট বেড়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আকার কিছুটা বাড়বে।