আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-১২ আসনে তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক উত্তাপ ও কৌতূহল। এই আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনজন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী—যাদের নাম কাকতালীয়ভাবে একই, সাইফুল। দলীয় রাজনীতি, বিদ্রোহী অবস্থান ও আদর্শিক সংগ্রামের এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে ভোটাররা এখন হিসাব কষছেন—শেষ পর্যন্ত জিতবেন কোন সাইফুল?
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরে বাংলানগর ও রমনা থানার বেশ কিছু নিয়ে গঠিত হয়েছে ঢাকা-১২ আসন। রাজধানীর ব্যবসায়িক হাব হিসেবে পরিচিত কারওয়ান বাজারও এই নির্বাচনী এলাকার অন্তর্গত। জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ও পড়েছে ঢাকা-১২ আসন এলাকায়। এই গুরুত্বপূর্ণ আসনের মোট ভোটার তিন লাখ ২৮ হাজার ৮৩০।
একক আসন হিসেবে এই আসনে দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক, ১৫ জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই তিন সাইফুলের মধ্যে। তারা হলেন, বিএনপি-জোট সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল আলম নীরব। তিনজনই নিজ নিজ রাজনৈতিক অবস্থান, অভিজ্ঞতা ও অঙ্গীকার তুলে ধরে ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। চষে বেড়াচ্ছেন প্রতিটি অলি-গলি। বক্তব্য রাখছেন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এবং মতবিনিময় সভায়। সাইফুল আলম খান মিলন (জামায়াতে ইসলামী) দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নির্বাচনে থাকা জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল
আলম খান মিলন দীর্ঘ ছাত্ররাজনীতি ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে ভোটের মাঠে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মিলন চাঁদাবাজি ও মাদক নির্মূল, গ্যাস-পানি-ড্রেনেজ সমস্যার সমাধান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং হাতিরঝিলের পরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
তার দাবি, সাধারণ ভোটার, শিক্ষার্থী ও তরুণদের কাছে তিনি ‘নাম্বার ওয়ান চয়েস’। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে তিনি বলেন, সবার মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চা ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার থাকতে হবে। নির্বাচনের পরেও যেন কোনো সন্ত্রাস বা সহিংসতা না হয়, আমি সবার কাছে সেই আহ্বান জানাই।
সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, আমার শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলো হচ্ছে, এলাকাকে চাঁদাবাজমুক্ত করা, মাদকমুক্ত করা, গ্যাস-পানি-সুয়ারেজের সমস্যা সমাধান করা। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার বাড়ানো ও খেলার মাঠের সংকট দূর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সেইসঙ্গে হাতিরঝিলের নিরাপত্তা ও পানির মান উন্নত করার দিকেও নজর রাখব।
সাইফুল হক (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি – বিএনপি সমর্থিত)
দীর্ঘ আদর্শিক রাজনৈতিক জীবন, পরিচ্ছন্ন রাজনীতির ভাবমূর্তি এবং নাগরিক সেবা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি—এই তিন ভিত্তির ওপর ভর করে ঢাকা-১২ আসনে নির্বাচনী লড়াইয়ে আশাবাদী বিএনপি সমর্থিত বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। শিল্পাঞ্চল অধ্যুষিত ও গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি নির্মূল, গ্যাস-পানি-জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান, হাতিরঝিলের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন, স্বাস্থ্য-শিক্ষা সম্প্রসারণ ও কিশোর গ্যাং দমনের মতো ইস্যু সামনে রেখে তিনি 'কোদাল' প্রতীকে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন।
সাইফুল হক বলেন, আমার একটি দীর্ঘ আদর্শিক ও নীতিবান রাজনৈতিক জীবন রয়েছে। আমি ১৯৬৯ থেকে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। গত ১৭ বছর এই ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে আমি ও আমার দল অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছি। আমার নাম ঘোষণার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা আমার জন্য নফল নামাজ আদায় করেছেন। আমি এ আসনে বড় ব্যবধানে জয় পাবো বলে মনে করছি।
সাইফুল আলম নীরব (স্বতন্ত্র)
এই আসনের আরেক আলোচিত মুখ সাইফুল আলম নীরব। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির বিএনপির আহ্বায়ক ও যুবদলের সাবেক সভাপতি নীরব দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। বিএনপি প্রথমে ঢাকা-১২ আসনের নীরবকে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। পরে জোটের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে তাকে বাদ দিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে সমর্থন দেয়। এদিকে মনোনয়ন না দিলেও সাইফুল আলম নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এই আসনে ভোট করছেন। তিনি ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রচারে রয়েছেন। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনী মাঠে থাকায় ইতোমধ্যে নীরবকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সাইফুল আলম নীরব নিজেকে এলাকার সন্তান দাবি করে তিনি বলেন, লোকজন এলাকার সন্তানকে ভোট দিয়েই বিজয়ী করবে। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এলাকায় কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংমুক্ত ঢাকা-১২ গড়াই তার মূল লক্ষ্য। স্থানীয় উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর ভরসা রাখছেন তিনি।
সব মিলিয়ে ঢাকা-১২ আসনে এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আদর্শিক রাজনীতি, সংগঠনের শক্তি ও স্বতন্ত্র অবস্থানের এক বহুমাত্রিক লড়াই। চাঁদাবাজি ও নাগরিক সেবা, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় উপস্থিতি, দলীয় সমর্থন ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা—এই সবকিছু মিলিয়ে ‘তিন সাইফুলের’ লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন পথে মোড় নেয়, সে দিকেই এখন তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ ভোটাররা।
ঢাকা-১২ আসনের নির্বাচন এবার কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি আদর্শিক রাজনীতি, সংগঠনের শক্তি ও স্বতন্ত্র অবস্থানের ত্রিমুখী লড়াই। সব মিলিয়ে ‘তিন সাইফুলের ভোটযুদ্ধ’ কোন দিকে মোড় নেয়—সেই অপেক্ষায় ভোটার ও রাজনৈতিক মহল।