ইস্তানবুলে ড. মাহমুদুর রহমান
জুলাই বিপ্লব শুধু ভারতীয় পৃষ্ঠপোষক শেখ হাসিনার সরকার পতনে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি স্বাধীন বাংলাদেশকে ভারতীয় অঘোষিত উপনিবেশে পরিণত করার চক্রান্ত রুখে দিয়েছে। এই বিপ্লবের রাজনৈতিক আদর্শ বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের পাশাপাশি বাংলাদেশে ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবেলায় নিবেদিত। জুলাই বিপ্লব দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে ভুটানের মতো করদ রাজ্যে পরিণত করার ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছে, দেশকে এনে দিয়েছে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ।
তুরস্কের ইস্তানবুলে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স অন বাংলাদেশ স্টাডিজ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে এসব কথা বলেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। দুই দিনব্যাপী সেমিনারের প্রথম দিন শনিবার (১৯ এপ্রিল) তুরস্ক ও বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদরা আলোচনায় অংশ নেন।
তুরস্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সোশাল রিসার্চ-এর উদ্যোগে ইস্তানবুল তিজারাত ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত সেমিনারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ফিলিস্তিনে ইসরাইলের ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের গতিপথ নিয়ে আলোচনা করতে পৃথিবীর নানা দেশ থেকে গবেষকরা অংশ নিয়েছেন এই সম্মেলনে। এতে ১২৫টিরও বেশি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই ছিল জুলাই বিপ্লবকে কেন্দ্র করে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সাবেক উপদেষ্টা ও খ্যাতনামা সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইয়াসিন আকতাই। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হক, তুরস্কের পার্লামেন্টের স্থানীয় সংসদ সদস্য দোয়ান বেকিন, ইস্তানবুল তিজারাত ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. নেজিপ সিমসেক, বাংলাদেশের নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ ইসমাইল, ইউএস কাউন্সিল অব মুসলিম অর্গানাইজেশনের সেক্রেটারি জেনারেল ওসামা জামাল এবং সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সোশাল রিসার্চ-এর কনফারেন্স কো-চেয়ারম্যান ড. হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব, যেটিকে মনসুন বিপ্লবও বলা হয়, জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত চিহ্নিত করেছে, যা ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্তির জন্য এবং একটি আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদী শক্তির শেকল থেকে জাতির স্বাধীন থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ছিল। এই সংগ্রামের এক মাসের মধ্যেই শেখ হাসিনা পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হন, কারণ দেশের সেনাবাহিনী তাকে জানিয়ে দেয় যে প্রতিষ্ঠানটি জনগণের পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তরুণ কর্মকর্তারা প্রতিবাদী জনতার ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শাসক ৫ আগস্ট ভারত চলে যান, যেখানে তিনি দিল্লির সাহায্যে দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে, যার প্রতিধ্বনি এখনো পুরো অঞ্চলে অনুভূত হচ্ছে—আট মাস পরেও। এটি ১৭০ মিলিয়ন মানুষের একটি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের সূচনা, যারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এলিট এবং তাদের বিদেশি মাস্টারের দ্বারা দীর্ঘদিন ধরে দমন-পীড়িত ছিল।
মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি দক্ষিণ এশীয় দেশ, যা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চলের একটি। প্রায় এক চতুর্থাংশ মানবজাতি এই অঞ্চলে বসবাস করে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭০ মিলিয়ন, যার মধ্যে ৯০ শতাংশ মুসলিম। দেশটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ, পারমাণবিক শক্তিধর ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র। আমাদের ভারতের সঙ্গে সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪,১৪২ কিলোমিটার, যা বিশ্বের ৬ষ্ঠ বৃহত্তম স্থলসীমান্ত। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দ্বীপের মতো, যা বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের দেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভারত একটি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও, আমাদের একমাত্র পূর্ববর্তী প্রতিবেশী মিয়ানমার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ। আরও পূর্বে মালয়েশিয়া প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। পশ্চিমে রয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশের পূর্বসূরি মুসলিম রাষ্ট্র, যা ২২০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বাংলাদেশের থেকে বিচ্ছিন্ন।
ভারতের প্রভুত্ববাদী আকাঙ্ক্ষার কথা তুলে ধরে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, ভারত হলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে জনবহুল এবং সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ। ভারতের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার অনেক রাষ্ট্রেই দৃশ্যমান। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে। তিনি বলেন, হাসিনার পতন ছিল ভারতের জন্য ১৯৪৭ সালের পর সবচেয়ে বড় বৈদেশিক নীতির বিপর্যয়। হাসিনার সরকার পতনের মাধ্যমে ভারত তার বাংলাদেশের ওপর প্রভাব হারিয়েছে।
১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পরাজয়ের তীব্র ক্ষত এখনও দিল্লির মনে বিদ্যমান। ১৯৯০ সালে শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনীর প্রত্যাহারও ভারতীয় আধিপত্যবাদী নকশার ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত। আফগানিস্তানে ১৯৯৬ ও ২০২১ সালে ভারতের একাধিক স্থাপনা দ্রুত ছেড়ে আসতে হয়েছে তালেবানদের কাবুল দখলের পর। তবে, বাংলাদেশের জনগণের বিপ্লবের বিজয় ছিল ভারতের আধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক, নিঃশস্ত্র সংগ্রাম, যা কোনও বাহ্যিক সাহায্য ছাড়াই ভারতীয় পুতুল সরকারের পতন ঘটিয়ে প্রমাণিত হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব শিক্ষা দেয়, যেকোনো আধিপত্যবাদী শক্তি, যতই বিশাল হোক না কেন, কেবলমাত্র একটি পুতুল সরকারের ওপর নির্ভর করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পারে না। জনগণের অভ্যুত্থানের সামনে তা টিকতে পারে না। অনেক বিশ্লেষক এই আন্দোলনকে বিশ্বের প্রথম “জেন জেড বিপ্লব” হিসেবে বর্ণনা করছেন।
তিনি তাঁর প্রবন্ধে বলেন, বর্তমান অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারতকে তার স্ব-ধারণাকে একটি হেজেমনিক শক্তি থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি সদিচ্ছাপূর্ণ নেতা হিসেবে রূপান্তর করতে হবে, যেখানে ঐতিহাসিক বৈরিতা ও শত্রুতা বিদ্যমান। ভারতকে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে দক্ষিণ এশিয়াকে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল অঞ্চলে রূপান্তরিত করতে হবে, যাতে ভারত অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সকল অঞ্চলীয় শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য নেতারূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
এই বিপ্লব অন্যান্য স্বৈরাচারী সরকারের জন্যও একটি চোখে আঙ্গুল দেওয়ার মতো বার্তা হতে পারে, বিশেষ করে ইসলামিক বিশ্বে, যেখানে নির্যাতিত জনগণ একত্রিত হয়ে, বিদ্রোহ করে বিশ্ব শক্তির পুতুল সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে।
তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হক বলেন, তুরস্ক বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু দেশ। ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও মুসলিম ভ্রাতৃত্ব সবসময় দুই দেশকে একত্র করে রেখেছে। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে তুরস্কের ভূমিকায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে জানিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, তুরস্ক সবসময় বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।
কনফারেন্স আয়োজক প্রতিষ্ঠানের কো-চেয়ারম্যান ড. হাফিজুর রহমান বলেন, জুলাই বিপ্লব নিয়ে এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক কনফারেন্স। আমরা বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে বিশ্বের গবেষকদের একত্র করেছি। পাশাপাশি আমরা ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ’ নামে একটি গবেষণা জার্নাল প্রকাশ করতে যাচ্ছি, যা নতুন বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কনফারেন্স সেক্রেটারিয়েট সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, প্রফেসর ড. জুবায়ের আহমেদ, মোহাম্মদ সালাউদ্দিন, সাইফুল ইসলাম, মিনহাজুল আবেদিন, হাফিজুল ইসলাম প্রমুখ।