মাল্টা প্রতি কেজি ৪৫০ টাকা, বেদানা ৫২০, আপেল ৩৮০, সবুজ আঙুর ৪৪০ এবং লাল আঙুর ৬০০ টাকা। নাশপাতি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।
ঢাকার রামপুরা বাজারের ফল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আকাশ শনিবার এসব দাম জানান।
তিনি বলেন, আঙুর ও আপেলের দাম আগে থেকেই বেশি। তবে গত চার-পাঁচ মাসে আমদানি করা ফলের মধ্যে মাল্টা ও বেদানার দাম অনেক বেড়েছে।
দেশের খুচরা বাজারে ফলের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই শনিবার ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে মাল্টার দাম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে মাল্টার বর্তমান বাজারদাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনার পরও খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম কীভাবে ৫২০ টাকায় পৌঁছায়, ব্যবসায়ীদের কাছে তার ব্যাখ্যা চান তিনি।
জবাবে ব্যবসায়ীরা মাল্টার দাম বাড়ার পেছনে সরবরাহের ঘাটতিকে অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
বৈঠকে ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি ফলের আমদানি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, মন্ত্রীর এই নির্দেশনা ও উদ্যোগে খুচরা বাজারে ফলের দাম আদৌ কমবে কি না।
দাম বাড়ছে কেন
বাংলাদেশে বিদেশ থেকে আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টা, বেদানা, নাশপাতি ও খেজুর—এই সাত ধরনের ফল বেশি আমদানি হয়। এসব ফলের বড় উৎস দেশ চীন, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
মূলত সমুদ্রপথে জাহাজে বড় কনটেইনারে এসব ফলের চালান বাংলাদেশে আসে। মৌসুম অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে ফল আমদানির জন্য এলসি খোলেন আমদানিকারকেরা।
অন্যান্য আমদানি পণ্যের মতো ফলের ক্ষেত্রেও ধরনভেদে বিভিন্ন হারে শুল্ক-কর রয়েছে। ফল আমদানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, এসব পণ্যে উচ্চ শুল্কের কারণে বাজারে দাম বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বাংলাদেশে আঙুর, কমলা ও মাল্টার মতো অধিকাংশ তাজা ফল আমদানিতে সর্বমোট করভার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ পাঁচটি স্তরে শুল্ক ও কর দিতে হয়।
অর্থাৎ, বিদেশ থেকে ১০০ টাকার ফল আমদানি করতে প্রায় ১২২ টাকা শুল্ক-কর পরিশোধ করতে হয়।
আমদানি করা ফলের বাড়তি দাম নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা আরো বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে মাল্টা, বেদানার মতো ফল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে অনেকে জানান।
ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজন থাকা মোহাম্মদ নাহিদ বলেন, চিকিৎসকেরা ডাব, মাল্টা ও কমলা খাওয়াতে বলেছেন। কিন্তু এক কেজি মাল্টার দাম সাড়ে চারশ থেকে পাঁচশ টাকা। ছোট একটি ডাবের দামও ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। তাঁর প্রশ্ন, এভাবে কীভাবে ফল কেনা সম্ভব?
শুধু অসুস্থতার সময় নয়, মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণেও ফল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দাম বাড়তে থাকায় বিশেষ করে আমদানি করা ফল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে অনেকটাই দূরে সরে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘মাল্টা আমদানি কমেছে’
মাল্টার দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ফল আমদানিকারক জাহিদুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত আমদানি শুল্কের কারণে ক্ষতির মুখে পড়ে গত চার-পাঁচ মাসে তারা মাল্টা আমদানি কমিয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে বাজারদামে।
তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহে ৭০ থেকে ৮০ কনটেইনার মাল্টা বাজারে এলে বাজার স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিন্তু অনেক আমদানিকারক মাল্টা আনা বন্ধ করে দেওয়ায় এখন তা কমে ১২ কনটেইনারে নেমেছে।
জাহিদুল ইসলাম বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ ফল কেনা কমিয়ে দিয়েছিল। কয়েক মাস চাহিদা কম থাকায় আমদানি করে লোকসান গুনেছেন ব্যবসায়ীরা। এখন চাহিদা আবার বাড়লেও কয়েক মাসের লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী আমদানি বন্ধ করে দিয়েছেন।
অতিরিক্ত শুল্কের কারণেও অনেক ব্যবসায়ী ফল আমদানি কমিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
দাম কমবে কি
বাংলাদেশে আমদানি করা ফলের শুল্ক কমানোর আলোচনা নতুন নয়। দেশি ফলের বাজার রক্ষা এবং বিলাসী পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে রাজস্ব বাড়ানোর চিন্তা থেকেই এ খাতে শুল্ক তুলনামূলক বেশি রাখা হয়।
আগের তুলনায় ফল আমদানিতে শুল্ক-কর কিছুটা কমানো হলেও তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, ফলের বাড়তি দামের জন্য শুধু শুল্ককে দায়ী করা যায় না। বাজার তদারকির অভাবে অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা করেন বলেও তাদের মত।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, আমদানির শুল্ক কমলেও অনেক সময় ব্যবসায়ীরা দাম কমান না। খুচরা ব্যবসায়ী দায় চাপান পাইকারের ওপর, পাইকার বলেন আমদানি কম হচ্ছে, আর আমদানিকারক বলেন শুল্ক বেশি। এভাবেই বিষয়টি চলতে থাকে।
ফলের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে আলোচনার মধ্যেই শনিবার সচিবালয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজারদর স্থিতিশীল রাখাই ছিল বৈঠকের অন্যতম বিষয়।
মাল্টা, খেজুরসহ আমদানিনির্ভর ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানান মন্ত্রী। অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেন তিনি।
বৈঠকে ফল আমদানিকারকেরাও নিজেদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তারা উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির কথা জানান।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শুল্ক-সংক্রান্ত বিষয় পর্যালোচনার আশ্বাস দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। খেজুর আমদানিতে শুল্ক-করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চলতি সপ্তাহেই জানানো হবে বলেও জানান তিনি। চাহিদা বিবেচনায় ব্যবসায়ীদের এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
তবে ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু বাজার তদারকি ও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ ছাড়া অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন।
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসেন বলেন, মন্ত্রীর এই আশ্বাসে সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। এ জন্য কঠোর তদারকি দরকার।
শুধু ফল নয়, বাজার তদারকির অভাবে ডিম, মাংস, সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামও ইচ্ছেমতো বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
নাজের হোসেন বলেন, কিছু লোক দেখানো অভিযান হলেও খুচরা বাজারে কার্যকর তদারকি নেই। চালের বাজার, ইলিশের বাজার ও ডিমের বাজার—সবই অস্থির।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম