দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে থামছে না সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা। গত জুন মাসে ভারত ও মিয়ানমার সীমান্তে পৃথক হামলায় ও ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে পাঁচ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ও হামলায় দুই জন এবং মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক রোহিঙ্গা যুবকসহ তিন্ জন প্রাণ হারিয়েছেন। সীমান্তজুড়ে এই ধারাবাহিক হতাহত, আটক ও চার শতাধিক মানুষকে পুশইনের চেষ্টা দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বৃহস্পতিবার হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) জুন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৫ টি হামলার ঘটনায় ২ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছে। ৪ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং বিএসএফ কর্তৃক ১ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া, ৭ জনকে পুশইন করা হয়েছে এবং চার শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে পৃথক ৩ টি ঘটনায় একজন রোহিঙ্গা যুবকসহ ৩ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া ৩ টি ঘটনায় ১২ জনকে আটক করেছে আরাকান আর্মি।
অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার পরিস্থিতির চিত্রে দেখা যায়, জুন মাসে দেশে মোট ৩৫২ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ৫৮ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৪৬ জন। সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৩ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৯ জন।
এছাড়া এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে এইচআরএসএস। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে ৩৯ টি ঘটনায় ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। একই সময়ে অন্তত ১১ টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক ও ৭ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ১২ টি হামলার ঘটনায় ৭ জন আহত হয়েছে। এছাড়া ১২ টি মন্দির, ১১ টি প্রতিমা ও ৭ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, এ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে।
তিনি আরও বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।