পাঠকনন্দিত দৈনিক ‘আমার দেশ’ দ্বিতীয় দফায় বন্ধের কালো দিন আজ। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে, গায়ের জোরে প্রেসে তালা লাগিয়ে আমার দেশের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। কমান্ডো স্টাইলে অভিযান চালিয়ে একই দিন সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। তাকে দিনের পর দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়। নিক্ষেপ করা হয় কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। টানা সাড়ে তিন বছর জেলে থাকার পর ২০১৬ সালের নভেম্বরে মাহমুদুর রহমান জামিনে মুক্তি পান।
তার আগে ২০১০ সালের ১ জুন প্রথম দফায় ‘আমার দেশ’ বন্ধ করে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার। সে সময় ১০ দিন বন্ধ থাকার পর উচ্চ আদালতের মাধ্যমে প্রকাশনায় ফিরতে সক্ষম হয়। সে সময়ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার এমনকি রিমান্ডে নিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। দ্বিতীয়বার বন্ধের পর শেখ হাসিনার শাসনকালে আর পত্রিকাটি প্রকাশ করতে দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতন ও পলায়নের পর ওই বছরের ২২ ডিসেম্বর থেকে আবার প্রকাশনায় ফেরে পাঠকপ্রিয় আমার দেশ।
শুধু পত্রিকা বন্ধ করা হয়েছিল তাই নয়, দুই দফায় সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার ও চরম নির্যাতন করা হয়। দীর্ঘ সময় কারাবন্দি ও পরে জামিনে মুক্ত হয়ে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয় সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দেড় মাস পর সাড়ে পাঁচ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে সম্পাদক ও প্রকাশক মাহমুদুর রহমান দেশে ফেরেন। তার নেতৃত্বে কারওয়ান বাজারের নতুন কার্যালয় থেকে এখন আবার ‘আমার দেশ’ বেরোচ্ছে। পুনঃপ্রকাশনার প্রথম দিন থেকে আমার দেশ পাঠকপ্রিয়তায় শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র হিসেবে সাড়া জাগায়। শূন্য থেকে শুরু করে মাত্র দুই মাসের প্রস্তুতিতে আমার দেশ পুনঃপ্রকাশিত হয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের পক্ষের দেশপ্রেমিক জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়।
যা ঘটেছিল ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল
আওয়ামী সরকারের মিথ্যা মামলা ও হুলিয়া মাথায় নিয়ে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কারওয়ান বাজারস্থ বিএসইসি ভবনে পত্রিকাটির কার্যালয়ে অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছিলেন। ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব কুমারের নেতৃত্বে থানা পুলিশ ও ডিবির বিপুল সংখ্যক সদস্য ভবনটি ঘিরে ফেলে। মূল সড়ক থেকে শুরু করে ১১ তলায় অবস্থিত পত্রিকার কার্যালয় পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক পুলিশ অবস্থান নিয়ে কমান্ডো স্টাইলে অভিযান চালায়। পত্রিকার নিরাপত্তা কর্মীদের মারধর করে দরজা ভেঙে জোরপূর্বক অফিসে ঢোকে তারা। এ সময় উপস্থিত আমার দেশের কয়েকজন সাংবাদিককে নাজেহাল ও নির্যাতন করে পুলিশ। ফটো সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একরকম মস্তানি করে সম্পাদকের কার্যালয়ে ঢুকে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সঙ্গেও অশোভন আচরণ করে বিপ্লবসহ কয়েকজন দলবাজ পুলিশ কর্মকর্তা।
পুরো অফিসে ত্রাস সৃষ্টি করে মাহমুদুর রহমানকে নিজ কার্যালয় থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় সম্পাদকের কার্যালয় থেকে কম্পিউটার, সিসি ক্যামেরার হার্ডডিস্কসহ অন্যান্য সরঞ্জামও নিয়ে যায় পুলিশ। ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে পত্রিকার সাড়া জাগানো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিজামুল হকের স্কাইপ কেলেঙ্কারির রিপোর্টের কারণে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আগের বছর ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। সম্পাদককে গ্রেপ্তারের পর ডিবি অফিসে রেখে বিকালে হাজির করা হয় আদালতে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় আইসিটি আইনের বহুল বিতর্কিত ৫৬ ও ৫৭ ধারায়। প্রথমদিনেই ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
দিনে সম্পাদককে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার পর ১১ এপ্রিল রাতেই তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত আমার দেশ-এর প্রেসে অভিযান চালায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ। সেখানে তল্লাশির নামে প্রকাশনার নানা উপকরণ তছনছ করে তারা। জব্দ করে নিয়ে যায় কম্পিউটারসহ অনেক যন্ত্রপাতি। জব্দের কথা বলে পুরো প্রেস তালা লাগিয়ে সিলগালা করে দেওয়া হয়। প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে আমার দেশ-এর সংবাদকর্মীরা মরিয়া চেষ্টা চালান। আল-ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস থেকে পত্রিকা ছাপাতে গেলে সেখানেও অভিযান চালায় শেখ হাসিনার আগ্রাসী পুলিশ। ধরে নিয়ে যায় বাইন্ডারদের। মামলা করা হয় আমার দেশ পাবলিকেশন্সের চেয়ারম্যান ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মা অধ্যাপিকা মাহমুদা বেগমের বিরুদ্ধে। পত্রিকা ছাপাতে সহায়তার কারণে দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদের বিরুদ্ধেও মামলা করে। শেষ পর্যন্ত প্রকাশনা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পেশাচ্যুত হয়ে অন্ধকার নেমে আসে পত্রিকায় কর্মরত ঢাকা ও বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাজারো সংবাদকর্মীর জীবনে।
সেদিন রিমান্ড শুনানির সময় সরকারের অভিযোগের জবাবে অকুতোভয় সম্পাদক মাহমুদুর রহমান কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘মাননীয় আদালত, পত্রিকায় কটূক্তি করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালের একজন বিচারপতি ও আইনজীবী জিয়াউদ্দিনের কথোপকথন প্রকাশ করা হয়েছে। আমি জানি, এ মামলায় আমাকে জামিন দেওয়া হবে না। ওপরের নির্দেশে রিমান্ডে দেওয়া হবে। আমি আইনজীবীদের অনুমতি দিলে তারা বোকার মতো জামিনের আবেদন করবেন, তাই তাদের অনুমতি দেইনি।’ জনাকীর্ণ আদালতে সেদিন তিনটি পৃথক মামলায় একসঙ্গে ১৩ দিন রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।