সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এ বাজেটে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার কোন গাইড লাইন নাই। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি অর্থবছর পরিবর্তন করে জানুয়ারি-ডিসেম্বর নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সোমবার জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে সকাল সাড়ে ১০ টায় এই অধিবেশন শুরু হয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের বাজেট ঘাটতি খুব বেশি নয়। পাচারের ৯ ভাগের একভাগ ফিরিয়ে আনলেও আমাদের কোন বাজেট ঘাটতি থাকবে না। এই টাকা জনগণের, এই টাকা ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের শাস্তির মুখোমুখি করলে আর কালো হাত বাড়ানোর সাহস পাবে না, তা নাহলে ডাকাত তৈরি হবে। এ বিষয়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই।
তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজনে এমওইউ করতে হবে। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বিরোধীদল হিসেবে আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছি, আরো কিছু করার থাকলে করবো।
বাজেটে সরকারি ও বিরোধীদলীয় সদস্যদের ব্যাপক আলোচনা প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সবার চিন্তাধারা এক নয়, এক হলে এতো আলোচনা হতো না। আমরা দেশের ভোটার-জনগণ ও মহান আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই বক্তব্য রেখে থাকি। তিনি মরহুম জিয়াউর রহমানসহ জাতীয় সব নেতা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, পিলখানা হত্যাকান্ড, শাপলা চত্ত্বরের হত্যাকান্ড, চব্বিশের গণঅভ্যু্ত্থানের শহীদ ও জামায়াতের ১১ নেতাসহ সব শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ ও তাদের যথাযথ মর্যাদা দানের জন্য দোয়া কামনা করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, চব্বিশেল গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিশেষ পরিস্থিতে গঠিত এই পার্লামেন্ট মজলুমের পার্লামেন্ট। আশা করি এই পার্লামেন্টে কেউ এমন কোন আচরণ করবে না, যা মজলুমকে আহত করে। এই পার্লামেন্ট জাতিকে আশা দেখাবে, সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে-সেই কামনা করেন তিনি।
তিনি বলেন, এই সংসদে যারা আছি, একসময় একদিকেই বসতাম। কয়েকটি দল ও কয়েকজন ছাড়া। এখনও আমরা বিভক্ত বলছি না, সংযুক্তই আছি। এখানে বক্তব্যের সময় অনেকে কুচিকুচি করার পরও বলেছেন, আসুন ঐকব্যবদ্ধ হই। তিনি বলেন, সরকারি দলকেও বিরোধীদলকে সম্মানের মানসিকতা থাকতে হবে, আবার বিরোধীদলকেও সরকারি দলকে সহযোগিতা করতে হবে। তবে এটা তোষামদের জায়গা নয়, এটা দায়িত্ব বুঝে নেয়া ও দায়িত্ব পালনের জায়গা।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাজেট মূলত, একটি জাতির টিকে থাকা ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চার্টার। অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার গঠনের কম সময়ে বিধ্বস্ত অর্থনীতির দেশে তিনি একটা বাজেট পেশ করেছেন। তিনি তার জ্ঞানমত তার বাজেটকে সর্বোচ্চ চূড়ায় নেয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে মানুষের কোন প্রয়াস সম্পূর্ণ ভুলের উর্ধ্বে থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি বলেন, বিরোধীদলের কাজ হলো-ওয়াচডগের কাজ করা। এই বাজেটে জনকল্যাণের পরিবর্তে কোন ক্ষতি হচ্ছে কিনা, ন্যায্যতার ক্ষেত্রে ঘাটতি, অপচয় হচ্ছে কিনা-এগুলো দেখা। বিরোধীদলের আলোচনায় প্রশংসা বা সমালোচনার জন্য সরকারি দলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বিরোধীদল এমনকি সরকারি দল থেকেও কিছু প্রস্তাব এসেছে। এবার যে প্রস্তাবগুলো এসেছে, তা অর্থমন্ত্রী বিবেচনায় নিয়ে গ্রহণ করে সংশোধিত আকারে সংসদে পেশ করবেন বলে আশা করি।
তিনি বলেন, ১ জুলাই থেকে বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সুস্পষ্ট প্রস্তাব হলো-অর্থবছর ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর করা হোক। এতে কাজের গতি বাড়বে, অপচয় ও লুটপাট কমবে। জনগণের ট্যাক্সের টাকার সদ্ব্যবহার হবে।
বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে তিন মাস পর সংসদে আলোচনা হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমাদের বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি। বাজেট দেশের জনগণের জন্য। তবে ইনসাফভিত্তিক বাজট হবে-পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের প্রাধান্য দিয়ে করলে। এটা বাস্তবায়ন হলে সুফল সবাই পাবে।
তিনি বলেন, বাজেটের ব্যতিক্রম বিষয় হলো-শিক্ষায় মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড রক্ষা করতে পারিনি। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। শিক্ষায় টার্গেট ঠিক না করা এবং দক্ষদের গুরুত্ব না দেয়ার কারণে এই অবস্থা।
বিভিন্ন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসা ধারার বিষয়ে বাজেটে বরাদ্দ নেই। অথচ সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কর দিয়ে থাকে। তবে তাদের আশঙ্কা হলো-সরকার নিয়ন্ত্রণ করবে। এক্ষেত্রে তাদের আশ্বস্ত করে হক তুলে দিলে সমাধান হবে।
প্রাইমারি স্কুলের প্যারালাল এবতেদায়ী শিক্ষার বিষয়ে বাজেটে বরাদ্দ নেই, অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করছি। ফ্যাসিস্ট আমলে বঞ্চিত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মান যাচাই-বাছাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও করা হোক।
শিক্ষা জাতির অধিকার, এটা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকারি শিক্ষায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শিক্ষায় অনগ্রসর একটা জনগোষ্ঠী পাহাড়ে বসবাসরতদের আস্থায় আনতে হবে। তাদেরকে মূলধারায় এগিয়ে নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত গবেষণার ফান্ড, সাপোর্ট ও মানসিকতাও নেই। গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় না হলে আমরা আমদানিনির্ভর হয়েই থাকবো। জাতিকে তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। বড়-ছোট নয়, জাতির প্রয়োজনে যা দরকার-সেরকম বাজেটই করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে টার্গেটের চেয়েও তিনগুণ বেশি রাজস্ব আয় হবে। তিন ধরণের ট্যাক্স দিতে হয়। দুটি দুর্নীতিবাজদের পকেটে যায়। এই ট্যাক্স একটা দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
স্বাস্থ্যখাত সম্পর্কে তিনি বলেন, জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার পর স্বাস্থ্যখাতের গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যখাতের স্বাস্থ্য খুব খারাপ। আমাদের পল্লী স্বাস্থ্য থেকে মেডিকেল পর্যন্ত একই চিত্র। তিনগুণ রোগী। সুস্থ্য হওয়ার যাওয়া রোগীদের হাসপাতালে মাটিতে থাকতে হয়। অবকাঠামো মেরামত করেন, লজিস্টিক সাপোর্ট, ম্যানপাওয়ার সমাধান করুন।
তিনি বলেন, আমাদের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে কোন ভিশন ধরা পড়ে না। আমরা জোড়াতালি দিয়ে চলছি। এটাকে ভিশনারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নিতে হবে। আমাদের প্রতিভার অভাব নেই, পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ইনস্পেকশনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুটিয়ে খুটিয়ে ধরেন, সরকারিগুলোকে সেভাবে ধরেন না। সমানভাবে ধরতে হবে।
আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে হাসপাতাল বন্ধ রাখলে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের দায় কে নেবে? শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সঠিক তদন্তে দোষীদের বিচার হোক, কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবা পাওয়া প্রতিষ্ঠানের ভাল কাজকে উৎসাহ দেয়া হোক। শিক্ষার্থী ও নার্সদের জীবন বাচাতে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই বাজেটে প্রবাসীদের আস্থায় আনা ও সম্মানিত করার বিশেষ কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করিনি। প্রবাসীরা সরকারি বা বিরোধীদলের নয়, তারা দেশের। তাদের সমস্যা সমাধানে টাস্কফোর্স করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। মালয়েশিয়ায় শ্রমিক যেতে যেখানে ৮৫ হাজার টাকা লাগার কথা, সিন্ডিকেটের কারণে ৬/৭ লাখ টাকা লাগে। এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিয়ে দালালদের আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যান্য দেশেও সমস্যা আছে, এক জায়গায় হাত দিলে সব সমাধান হবে। এ ব্যাপারে আমরা সরকারের সঙ্গে আছি। প্রবাসীরা আমাদের সম্পদ, তাদের সম্মানিত করতে হবে। তাহলে প্রবাসে শ্রমিক যাওয়ার গতি বাড়বে।
তিনি বলেন, এই বাজেটে মুক্তিযোদ্ধা ও খেতাবপ্রাপ্ত সবার ভাতা বাড়িয়ে দেয়া হোক। ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় শহীদ এবং সাড়ে ১৭ বছরে যারা খুন-গুম হয়েছে তাদেরকে মজলুমের আওতায় আনা হোক। জুলাই আন্দোলনের শহীদদের সম্মান করতে হবে, তাহলে আরো বীর জন্ম নেবে। সবার সামাজিক ও বিচারিক মূল্যায়ন হতে হবে। অপরাধী যত বড়ই হোক বিচারের আওতায় আনা হোক। কিন্তু এই সরকারের চার মাসে বিচারের কাঙ্খিত গতি দেখছি না। বিএনপিরও বেশি লোক নিহত হয়েছেন। তাই দল ও সরকার হিসেবে পদক্ষেপ নেয়া হোক।
অনুদান সরকারি ও বিরোধীদলকে সমানভাবে একসঙ্গে দেন। বিরোধীদল হওয়ায় জনগণের হক যেন নষ্ট না করা হয়।
নিজ এলাকার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস অনুযায়ী আমি চিঠি দিয়েছি, পরে সফট রিমাইন্ডারও দিয়েছি। কিন্তু এখনো পানির জন্য হাহাহার অবস্থা।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি দায়িত্ব যখন নিয়েছেন, সব দায় আপনার ওপর, আমার নয়। দেশবাসী মনে করবে, এখানে যদি জনগণ ইনসাফ না পান, তাহলে সারা দেশের জনগণের কি অবস্থা তা তারা বুঝে নেবে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ হতে আর কতদিন লাগবে? সিলেটবাসী এর অবসান চায়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরায় ‘ওয়াটার লক’ সমম্যার সমাধান হওয়া জরুরি। তিনি স্পিকারের এলাকা প্রসঙ্গে বলেন, ভোলাও ওয়াটার লক থেকে অবসান পেতে চায়। ভোলার সেতু হলে গোটা দেশের চিত্র পরিবর্তন করে দেবে। দেশের অংশ হিসেবে দায়-বোধের জায়গা থেকে এই দাবি করছি।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয় তিনি চীনের সঙ্গে কথা বলেছেন। নাম নিয়ে আমাদের কোন আপত্তি নেই। পানিসম্পদ মন্ত্রীও আশ্বস্ত করেছেন, ইনশাআল্লহে যে নামেই হোক, বাস্তবায়ন করতে হবে। নামের পেছনে না দৌঁড়িয়ে কাজের পেছনে দৌঁড়ানোর আহবান জানান তিনি।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর ৩০০ বিধিতে একটি বিবৃতি দেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, বিরোধীদলের আসনগুলোতে সিটি করপোরেশন বাদে মসজিদ-মন্দিরের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার এক ঘন্টার বক্তব্যে বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয়ে দিক- নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেয়ায় তাকে ধন্যবাদ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বিশেষ করে তার নিজের এলাকার সমস্যা সমাধানের জন্য কথা বলায় বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
এমবি