ব্যাপক আনন্দ-উৎসব ও ত্যাগের মহিমায় গত বৃহস্পতিবার সারা দেশে উদযাপিত হলো পবিত্র ঈদুল আজহা। এ উৎসবকে বিশেষ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ঈদের আগে থেকেই বিভিন্ন তৎপরতা শুরু করেন তারা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে এ নির্বাচন সামনে রেখে ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও আগাম প্রচারে নেমে পড়েছেন।
ঢাকাসহ সারা দেশের সব সিটি করপোরেশন, জেলা-উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে ব্যাপক তৎপরতা দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট বাজার, মহল্লা ও সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শোভা পাচ্ছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিভিন্ন ধরনের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের পাশাপাশি নিজ নিজ এলাকায় নানাভাবে গণসংযোগ করছেন তারা। সব মিলিয়ে ঈদ উৎসবের সঙ্গে নির্বাচনি গণসংযোগে বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল।
সূত্রমতে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর থেকেই আলোচনায় আসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি সরকার দ্রুত স্থানীয় নির্বাচনের আভাস দিলেও পরে সে অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের মধ্য দিয়ে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তবে জামায়াত-এনসিপিসহ বিভিন্ন মহল থেকে এ নির্বাচন দ্রুত করার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলেও অনেকে মনে করছেন।
সবশেষ ঈদুল ফিতরের আগে গত ১৯ মে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের জানান, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুমের পর সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাস থেকে পর্যায়ক্রমে দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে।
তিনি জানান, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন— এ পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
সূত্রমতে, বাজেটের প্রাপ্যতার ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে এ নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে প্রথমে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে।
তবে স্থানীয় নির্বাচন যখনই হোক না কেন, সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের আগাম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে নির্বাচনি মাঠে নেমে পড়েছেন। এবারের ঈদুল আজহা ঘিরে তাদের বেশ সোচ্চার দেখা গেছে। দেশের প্রধান দলগুলোর একাধিক প্রার্থী ছাড়াও স্বতন্ত্র হিসেবেও গণসংযোগ চালাচ্ছেন অনেকে।
সূত্রমতে, ঈদের আগে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন টানান সম্ভাব্য প্রার্থীরা। গরিব ও অসহায় মানুষের মাঝে ঈদসামগ্রী বিতরণ করেন তারা। একাধিক কোরবানি দিয়ে মাংস বিতরণ করেন প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মী-অনুসারীরা। ঈদ জামাতে উপস্থিত থাকা এবং নামাজ শেষে সর্বসাধারণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন অধিকাংশ প্রার্থী।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন অন্তত ছয় প্রার্থী। তাদের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তৎপরতা চালাতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া প্রতি ওয়ার্ডে বহুসংখ্যক মেম্বার প্রার্থী গণসংযোগ করছেন। ঈদুল আজহার সময় কোরবানির মাংস বিতরণ ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে দেখা গেছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের। তরুণদের আকৃষ্ট করতে ঈদের পরদিন এলাকায় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করেন কেউ কেউ। এছাড়া গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় দলীয় বিভিন্ন সভা-সমাবেশ, বৈঠক ও গণসংযোগের মাধ্যমেও নির্বাচনি আগাম প্রচার চালানো হচ্ছে।
ঝিনাইদহের বিভিন্ন উপজেলা এবং ইউপি নির্বাচন ঘিরে একই ধরনের প্রচারের চিত্র দেখা গেছে। এছাড়া মাগুরা, ফরিদপুর ও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন সড়কেও স্থানীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের পক্ষে ঈদ শুভেচ্ছামূলক ব্যানার-ফেস্টুন দেখা গেছে। দেশের প্রায় সর্বত্রই একই ধরনের প্রচার কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে।
রাজধানীতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায়ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারমূলক ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টার ছড়িয়ে পড়েছে। মেয়র প্রার্থী ছাড়াও ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীদের পক্ষে ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রায় অলিগলিতে এসব প্রচারসামগ্রী দেখা গেছে। ঈদের দিন অনেকেই এলাকাবাসীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং গরিবদের মাঝে কোরবানির মাংস বিতরণ করেন।
ঢাকা ছাড়াও অন্যান্য সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি। তবে বিভিন্ন প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকারীরা সফল হলে আসন্ন নির্বাচনে তাদেরই প্রার্থী করার সম্ভাবনা রয়েছে। সে অনুযায়ী ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আব্দুস সালাম এবং উত্তরে শফিকুল ইসলাম মিল্টন প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে নগরবাসীর কাছাকাছি পৌঁছানো এবং তাদের আস্থা অর্জনে বিভিন্ন তৎপরতা চালাচ্ছেন। ঈদুল আজহা ঘিরেও তাদের গরুর হাট ও বর্জ্য অপসারণ তদারকি, ঈদের নামাজে উপস্থিতি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করতে দেখা গেছে। একই ভাবে স্থানীয় নির্বাচনের অন্য পদগুলোতেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা বিভিন্নভাবে নিজেদের প্রকাশ করছেন।
ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের পক্ষে পোস্টারিংও করা হয়েছে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী করার ক্ষেত্রে প্রশাসকদের পাশাপাশি কিছু বিকল্প প্রার্থীও বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএমএ রাজ্জাক বলেন, মেয়র প্রার্থী ঘোষণা না হলেও দুই সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্টারিংসহ বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালাচ্ছেন।
এদিকে ঢাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে বিএনপির পক্ষে একাধিক কাউন্সিলর পদপ্রত্যাশীর শুভেচ্ছা পোস্টারও দেখা গেছে।
সূত্রমতে, সম্প্রতি ঢাকা উত্তরে জামায়াতের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বেশ প্রচার চালাচ্ছেন। ‘চলো বদলে দেই ঢাকা উত্তর’ স্লোগানে তার পক্ষে স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থীরা ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়ে ব্যাপক পোস্টারিং করেছেন। ঈদের আগে থেকেই গরুর হাটে সেবামূলক ক্যাম্প, নগরীতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য অপসারণে সহযোগিতা, গরিবদের মাঝে সহায়তাসামগ্রী বিতরণ, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প স্থাপনসহ ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। নাগরিক উন্নয়ন ফোরাম, স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থী ও দলীয় উদ্যোগে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণে জামায়াতের মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করা হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তবে ঈদ ঘিরে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ডে মহানগর নেতাদের সঙ্গে তাকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুস সাত্তার সুমন জানান, তার এলাকায় সাতটি গরু কোরবানি করে ৪০০ পরিবারের মাঝে মাংস বিতরণ করা হয়েছে। ঈদের আগে শিশুদের নতুন জামা, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সেবামূলক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন তিনি।
এদিকে, স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ইতোমধ্যে পাঁচ সিটিতে মেয়র ও কিছু কাউন্সিলর প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। ঈদ ঘিরে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, ঈদের সময় ঢাকাসহ সারা দেশে আমাদের প্রার্থীরা গণসংযোগ ছাড়াও বিভিন্ন তৎপরতা চালিয়েছেন। কোনো পোস্টারিং করা না হলেও সামাজিকমাধ্যম ও সরাসরি গণসংযোগ করছেন তারা।
ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচার শুরু করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দক্ষিণ সিটির মেয়র প্রার্থী মাওলানা শেখ ফজলুল করীম মারুফ ঈদ ও এর পরদিন ঢাকার বিভিন্ন স্থানে কোরবানির মাংস বিতরণ করেন বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।