সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড রাষ্ট্রের একটা বিনিয়োগ। যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তাই আমাদের হিসাব হচ্ছে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না, বরং কমবে। বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের (হাসনাত আব্দুল্লাহ) সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনতে হলে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা বার্ষিক খরচ হবে। প্রক্রিয়াকরণ খরচসহ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। আবার ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষক কার্ড দেওয়া হবে। সেখানে ৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এটি দেশের অর্থনীতি কতটুকু স্বনির্ভর করবে? এই অর্থ কি বর্তমানে চলা সামাজিক সুরক্ষা হতে কেটে এনে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না কি নতুন করে এ খাতে টাকা দেওয়া হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মুদ্রাস্ফীতি ঘটনার সম্ভাবনা আছে কি না?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষ ফ্যামিলি কার্ড গ্রহণ করেছে। আমরা পর্যায়ক্রমে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেব। পৃথিবীর কোনো সরকারের কাছে একবারে এটা করা সম্ভব না। সবার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে দেওয়া হবে। ধীরে ধীরে বাজেট তৈরি করব এবং কার্ড দেওয়া বাড়াব। সে কারণে আমাদের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী বাজেটের ওপর চাপ পড়ার তেমন কারণ নেই।
তিনি বলেন, বর্তমানে যতগুলো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প চালু আছে, তার সবগুলোর অর্থ সহযোগিতা যোগ করা হলে ফ্যামিলি কার্ডের পরিমাণ হবে না। আমরা গবেষণা করে দেখেছি অনেকগুলো ব্যক্তি আছেন, কয়েকটি সুবিধা একজন ব্যক্তি পাচ্ছেন। সেগুলোকে আমরা কাটডাউন করব, সবগুলোকে কাটডাউন করব না। এভাবে করে ধীরে ধীরে নিয়ে যাব।
এসব সুবিধার কারণে দেশে মুদ্রাস্ফীতি হবে না বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা টাকা ছাপিয়ে দেব না। ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ বলছেন জামা-কাপড় কিনবে, কেউ বলছেন বাচ্চাদের জন্য বই কিনবে। যে মানুষগুলো পাচ্ছে তারা ব্র্যান্ডের জিনিস ব্যবহার করে না। তারা প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করে। তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেশীয় কারখানায় তৈরি। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা খরচ হলে গ্রামীণ অর্থনীতি ব্যবহার হচ্ছে। কেনা জিনিসগুলো স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় শিল্পায়নে যাবে। স্থানীয় দোকানেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হবে বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপি দলীয় সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা রাজধানী ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের বহুমাত্রিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানী ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রীন সিটি রূপে গড়ে তুলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশ এলাকার রোড মিডিয়ান, সড়ক দ্বীপ ও উন্মুক্ত স্থানসমূহে সবুজায়নের লক্ষ্যে বৃক্ষরোপন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। সিটি করপোরেশন কোরিয়াভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তর করার মাধ্যমে সব বর্জ্যকে জিরো বর্জ্যতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় নগর বনায়ন (মিয়াওয়াকি ফরেন্ট) উন্মুক্ত মিডিয়ান জিরো সয়েল-সবুজে আবৃত করা হচ্ছে। সিটির আওতাধীন এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ বৃক্ষোরপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেট্রোরেলের নিচের খালি অংশ (মিরপুর ১২ নম্বর থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত) এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (আবদুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত) নিচের খালি জায়গায় বৃক্ষরোপন করা হবে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রীণ সিটি রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার বায়দূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে আধুনিক বাস সার্ভিস ও ২৫০টি ইলেক্ট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কালো ধোঁয়া নির্গমণকারী যানবাহন, কনস্ট্রাকশন কার্যক্রম ও নির্মাণ সামগ্রি দ্বারা বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ রোধে ঢাকার চারদিকে অবৈধ দূষণকারী ইটভাটাসমূহ বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বাইপাসকে বাইপাস করার জন্য আরেকটা বাইপাস দরকার
ময়মনসিংহ-৬ আসনের সদস্য কামরুল হাসানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ময়মনসিংহের শহরের পরিধি বেড়েছে। আপনি যে বাইপাসের কথা বললেন, আমার নিজ জেলায় (বগুড়া) একটি বাইপাস আছে। যেটি শহরকে বাইপাস করে চলে গেছে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সে বাইপাসের দুইপাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এখন মনে হচ্ছে বাইপাসকে বাইপাস করার জন্য আরেকটা বাইপাস দরকার। হয়তোবা ময়মনসিংহ রেলস্টেশন শহর থেকে অন্যদিকে নেওয়া যাবে। কিন্তু আমাদের দেশ আয়তনে ছোট। অনেকগুলো বিষয় চিন্তা করতে হয়। জমি নষ্ট করবেন কিনা, অর্থ ব্যয় করবেন কিনা, সবকিছু বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। সব শহরের জন্যই বড় পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ঢাকার আশপাশে ইটভাটা নিষিদ্ধ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধিকন্তু ঢাকা মহানগরীর বায়ুদূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে ঢিাকার সাভার উপজেলাকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড (অবনমিত বায়ূমণ্ডল) ঘোষণা করা হয়েছে এবং উক্ত এলাকায় ইটভাটার কার্যক্রম পরিচালনা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো ইত্যাদি কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয় দূষণরোধে তরল বর্জ্য নির্গমণকারী প্রতিষ্ঠানমূহে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৪৮টি ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে এবং স্থাপিত ইটিপির রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণের জন্য ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) ক্যামেরা স্থাপন চলমান রয়েছে।
ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস এবং প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে ক্লিন এবং গ্রীণ সিটি রূপে গড়ে তুলতে বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় বৃক্ষরোপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। আশা করি, এ সব কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা শহর গড়ো তোলা সম্ভব হবে।
সংসদ সদস্য আবুল কালামের সম্পূরক প্রশ্নে সম্পূরক প্রশ্নে রাজধানীমুখী মানুষের স্রোত কমানোর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের সব সুযোগ-সুবিধা, চাকরি-বাকরি, চিকিৎসা, পড়ালেখাসহ সবকিছু ঢাকা কেন্দ্রীক গড়ে উঠেছে। এটা একদিন-দুইদিন না, এটি বহুবছর ধরে গড়ে উঠেছে। আমরা সারা দেশকে ঘিরে সুবিধাগুলো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। সে কারণে স্বাভাবিকভাবে সারাদেশ থেকে মানুষ ঢাকামুখী হয়ে থাকে। সেটি কর্মসংস্থানের সুবিধার জন্য হোক, সন্তানদের লেখাপড়ার জন্যই হোক, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্যই।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে দেশের সব অংশে পর্যায়ক্রমিকভাবে সারা দেশে বেসিক সুবিধা গড়ে তোলা। বর্তমান সরকার দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ করছে। একই সঙ্গে চেষ্টা করছি দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা সেবাও গড়ে তুলতে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমাদের আগামী ভবিষ্যৎ প্রজন্মদের লেখাপড়ার জন্য ধীরে ধীরে ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য। এই সুবিধাগুলো যদি আমরা গড়ে তুলতে পারি তাহলে মানুষ ঢাকা শহরে আসার জন্য কম উৎসাহিত হবে। ধীরে ধীরে ঢাকার উপরে চাপ কমাতে সক্ষম হব।