জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই বিপ্লবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দল হিসেবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচারে শক্ত অবস্থান নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এর মধ্য দিয়ে সরকার জুলাই বিপ্লবের আকঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সম্প্রতি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে দেওয়া বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচারের অগ্রগতি দেখে এমনটাই জানান তারা।
এবারের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে অন্যতম জনদাবি ছিল জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের গণহত্যার বিচার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার। এর আগে গত বছরের অক্টোবরে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে করা প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেছিলেন, ‘দল হিসেবে তারা যদি অন্যায় করে থাকে, তাহলে দেশের আইন অনুযায়ী তার বিচার হবে। দেশের আইন সিদ্ধান্ত নেবে। যারা জুলুম করেছে তাদের তো বিচার হতে হবে।’
এছাড়া বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম অধ্যায়ের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কার অংশে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানসহ আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের সুবিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বিএনপি। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দল হিসেবে বিচার করতে যাচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগ একদিকে যেমন জনদাবি বাস্তবায়ন, তেমনি এটি জনগণের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সেই সঙ্গে সরকারের সদিচ্ছা বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবে শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৪০০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এছাড়া ৩০ হাজারের বেশি আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করার কথা বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে এসেছে।
জুলাই বিপ্লবের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারত পালিয়ে যান ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হওয়ার পর থেকেই জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগের গণহত্যার বিচার দাবি জানিয়ে আসছেন দেশের আপামর জনসাধারণ। সেই সঙ্গে দলটির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আসছে তারা। পরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারে বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম।
এদিকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পরে গত ৯ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে হুবহু বিল আকারে পাস হয়। এটিকে আওয়ামী লীগের বিচারে বর্তমান সরকারের প্রথম দৃশ্যমান পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়ে বলেছেন, নির্বাহী আদেশে এখন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে। গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ট্রাইব্যুনালে এ দলটির বিচার হবে। বিচার শেষে আদালতই রায় দেবে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে এ দেশে থাকবে কি না।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আওয়ামী লীগ তো নিষিদ্ধ হয়নি, তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আছে। তারা একটু অপেক্ষা করুক। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইসিটি থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত চলছে। সেই সময়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেই হবে। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার আইনের ওপর ছেড়ে দেন উপদেষ্টা।
মানবতাবিরোধী অপরাধে আ.লীগের সংশ্লিষ্টতা
আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে এবং এ কারণে তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আইসিটির তদন্ত টিম কাজ করছে। প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতা তো আছেই। তদন্ত সম্পন্ন হওয়া সময়ের ব্যাপার।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রাথমিক সংশ্লিষ্টতার ব্যাখ্যা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, জুলাই আন্দোলনের মধ্যে তাদের (আওয়ামী লীগ) দলগত সংশ্লিষ্টতা আছে। ব্যক্তিগত দায় আছে। সুপিরিয়র দায় আছে। এগুলো নিয়েই আমাদের তদন্ত এগোচ্ছে।
আ.লীগ রাজনীতি করতে পারবে না
আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। গত রোববার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ব্যাপক নৃশংসতা চালালেও তাদের কোনো অনুশোচনা নেই। দলটির আগামী দিনের রাজনীতির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে, দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে শিগগিরই বিচারের মুখোমুখি করা হবে জানিয়ে ওই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, আপনারা দাবি করেছেন; তদন্ত পরিচালিত হচ্ছে। ইনশাআল্লাহ শিগগিরই দল হিসেবে সেই রাজনৈতিক দলকে বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে।’
আ.লীগের একটি অর্গানকেও ফাংশন করতে দেওয়া হবে না
এদিকে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জুলাইযোদ্ধা আবিদুল ইসলাম খান গত সোমবার রাতে ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘স্বৈরাচারের প্রতিটি অর্গানকে বলতে চাই, প্রতিটি ব্যক্তিকে বলতে চাই, আপনারা যে গণহত্যা চালিয়েছেন, তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে বিচারের মুখোমুখি হন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা তো দূরের কথা, দলটির একটি অর্গানকেও দেশের মাটিতে ফাংশন করতে দেওয়া হবে না। এটাই আমাদের শেষ কথা।’
সরকারের সদিচ্ছা বিচার প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে
এদিকে সরকারের সদিচ্ছার পাশাপাশি জুলাইযোদ্ধারাও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবি তুলে আসছে। বিচারের দাবিতে সংসদে ও রাজপথে বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে বিরোধী দল ও তাদের জোট। একই সঙ্গে জুলাই বিপ্লবে রাজপথে থাকা বিএনপি এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারাও আওয়ামী লীগের বিচারের দাবিতে সোচ্চার। আবার আওয়ামী লীগের বিগত ১৭ বছরে গুম-খুন, হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার না হলে জনরোষ রাজপথ আরো উত্তপ্ত করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সে কারণেই দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচারে সরকার এখনো শক্ত অবস্থানেই রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তবে বিচারের দীর্ঘ সূত্রতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ব্যাপারে সরকারকে আরো আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. মহিউদ্দিন আমার দেশকে বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। একই সঙ্গে সংসদের বিরোধী দলসহ সবাইকে একটি নির্দিষ্ট নিয়ম ফলো করে আগাতে হবে। সরকার তাই করছে। বিচারের ব্যাপারেও সরকার অবশ্যই শক্ত অবস্থানে আছে এবং সেটাই থাকা উচিত।
তিনি আরো বলেন, আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলোÑ আওয়ামী লীগ যে অপরাধ করেছে, প্রচলিত আইনেই তারা দোষী প্রমাণিত হবে এবং বর্তমানে যে শাস্তি আছে এই বিচারের জন্য বা তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্যÑসেটাই যথেষ্ট।
ঢাবি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিচারটা আসলে শাসন বিভাগের কাজ না। তবে শাসন বিভাগ বিচারে সহায়তা করতে পারে। তিনি বলেন, আমি সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি ভালোই দেখছি। সদিচ্ছা থাকলে সেটি বিচার কাজকে সহায়তা করবে। কিন্তু এখানে সরকারের সদিচ্ছা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বিচার বিভাগ ও প্রসিকিউশনের গুরুত্ব বেশি। এর পরের কাজটা যদি দেখি ঠিকমতো হচ্ছেÑ তখন এ ব্যাপারে আমরা সঠিক রায় পাব।
তবে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি আমার দেশকে বলেন, বিচারের বিষয়ে সরকারের এই অবস্থানকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে যেভাবে ধীর গতিতে বিচারকাজ চলছে, সেটিও মাথায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিচারে সরকারের একই ধরনের অবস্থান দেখতে চাই।