অন্তবর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ভূমিদস্যু ভাইদের সালাম জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। পোস্টে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা নানা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন।
আমার দেশের পাঠকদের জন্য আসিফ নজরুলের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—
তিনি বলেন— ভূমিদস্যুদের পত্রিকাগুলো আমার (এবং আরও কয়েকজন উপদেষ্টার) বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নেমেছে। সাক্ষ্য নেই, প্রমাণ নেই—যা খুশি লিখে যাচ্ছে তারা। এমন উদ্ভট দাবি পর্যন্ত করেছে যে দুর্নীতির টাকায় আমি নাকি সন্তানের নামে ইস্কাটনে বাড়ি কিনে ফেলেছি!
ভূমিদস্যু ভাই, আপনাদের তো অনেক ক্ষমতা, অনেক সাংবাদিক, অনেক প্রভাব। চ্যালেঞ্জ করলাম, সেই বাড়ি কেনার ডকুমেন্ট দেখান পারলে! যদি পারেন, আপনাদের সব অভিযোগ মাথায় পেতে নেব। পারবেন এটা করতে? পারবেন না।
এর বছরখানেক আগে, আমেরিকায় বাড়ি কিনে ফেলেছি—এমন আজগুবি দাবি করেছিল এক বেপরোয়া ইউটিউবার। আমেরিকায় বাড়ি কিনলে তার তথ্য-প্রমাণ যে কারও পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব। আমি টক-শো-তে গিয়ে সবাইকে বললাম, তথ্য-প্রমাণ দিতে। সেটা কেউ পারল না। পারার কথাও না, কারণ এরকম কিছু কখনো হয়নি।
কিন্তু নতুন প্রচারণা থেমে থাকল না তাতে।
২.
উপদেষ্টা জীবন শেষ হওয়ার পর অনেকে নেমে পড়লেন নতুন উদ্যমে। একটি ভুঁইফোঁড় অনলাইন মিডিয়া ফটোকার্ড বানিয়ে দাবি করা হলো—আমি নাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছি! পনেরো হাজার কোটি! এই সংবাদ বিশ্বাস করা দূরের কথা, উন্মাদ ছাড়া কেউ শেয়ার করার কথা না। এমন উন্মাদের অভাব হলো না দেশে।
কিছুদিন বিরতির পর ১৫ হাজার কোটি টাকা নেমে এলো ১০০ কোটি টাকায়। সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে নাকি অনিয়মের মাধ্যমে এই দুর্নীতি হয়েছে। অথচ নতুন সরকারের আইন মন্ত্রণালয় নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানায়—কোনো অনিয়ম হয়নি। আগে যেমন হতো, ঠিক সেভাবেই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে বদলি হয়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আবেদনের ভিত্তিতেই তা হয়েছে। জানানো হয়, মনীষা নামে যাঁর নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনিও নিজে পারিবারিক কারণে বদলির আবেদন করেছিলেন। বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আমি নিজেও এসব বললাম। ব্যাখ্যা করলাম কেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্য সব জায়গার মতো ফ্যাসিস্টদের অনুগত সাব-রেজিস্ট্রার বদলিও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এবং এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের অনেকে কত তীব্রভাবে দাবি করেছিলেন। চ্যালেঞ্জ করলাম দুর্নীতির প্রমাণ দিতে।
তাদের বোধোদয় হলো না তবু। অবিকল আগের রিপোর্ট আমার বা আইন মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছাড়াই কপি করে (এবং আরও কিছু উদ্ভট অভিযোগ জুড়ে) ছাপাতে শুরু করল ভূমিদস্যুর নিজের ও তার প্রভাবাধীন পত্রিকাগুলো। সাব-রেজিস্ট্রার তো আছেই—আইন কর্মকর্তা, বিচারক, রিক্রুটিং এজেন্ট, জামিন প্রক্রিয়া—সব জায়গায় দুর্নীতি করে আমি নাকি ফাটিয়ে ফেলেছি!
আমি শুধু না, আরও কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির উদ্ভট অভিযোগ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। মনে হচ্ছে, তাদের প্রিয় ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে ভূমিকা রেখে এবং অন্তবর্তী সরকারে দায়িত্ব পালন করে যেন মহা অপরাধ করে ফেলেছি আমরা কয়েকজন উপদেষ্টা!
৩.
প্রথমে এরা পত্রিকায় খবর ছাপে, তারপর সেটা ফটোকার্ড বানিয়ে অনলাইনে ছড়ায়, এরপর নিজেদের লোকজন দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তা প্রচার করে। দিনের পর দিন যায়, তাদের নির্মম অপপ্রচার একটুও থামে না। কোথাও একটা তথ্য-প্রমাণ নেই, সাক্ষ্য নেই, কোনো দলিল নেই, কোনো ফোনালাপ ও মেসেজ নেই! স্রেফ একের পর এক শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির লোমহর্ষক অভিযোগ। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে থাকি, কাঁচাবাজারে গিয়ে কমদামী জিনিষ কিনি, অধিকাংশ সময় রিকশায় চড়ে চলাফেরা করি, বাচ্চার স্কুল ছুটি হলে বিশ টাকার চিপস কিনে দিই, কালেভদ্রে বাইরে স্ত্রীর সঙ্গে কফি খেয়ে ছুটি কাটাই। আমার জীবনযাপন দেখে কারও ইচ্ছে হয় কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির কিচ্ছা লেখার!!
৪.
ভূমিদস্যু (এবং বিভিন্ন ধরনের দস্যু) ভাইজান, আমার সালাম নিন। আমাকে কেউ কেউ বলে আপনাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে, কেউ বলে প্রেস কাউন্সিলে যেতে। আমি যাই না, কারণ আমি জানি গিয়ে তেমন লাভ নেই। আমার আছে একটা কলম, আপনাদের হাজার হাজার। আমার আছে একটা মামলা করার এনার্জি, আপনাদের আছে শতশত মামলা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা। আমার আছে মিথ্যা অভিযোগে আহত মন, আপনাদের আছে পাপের চূড়ায় ওঠার উদ্ধত সাহস। ভূমিদস্যু ভাই, আপনি বরং আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন। এই দেশটা আপনার, আপনাদের মতো মানুষের। আমার মতো কারও না।
এমবি