পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে অনেকেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন। নাড়ির টানে মানুষের এখন বাড়ি ফেরার পালা। গতকাল শনিবার ভোর ৬টায় ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ট্রেনে এবারের ঈদযাত্রা শুরু হয়। পরে সূচি অনুযায়ী, একে একে বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়ে ট্রেনগুলো। তবে ঈদযাত্রার প্রথম দিনে ট্রেনে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ দেখা যায়নি।
প্রতিটি ট্রেন ছাড়তে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মতো সময় দেরি হওয়ার কথা জানান যাত্রীরা। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন কমলাপুর স্টেশনে কয়েকটি প্ল্যাটফর্ম ঘুরে দেখেন। এ সময় অনলাইনে টিকিট কাটতে কোনো সমস্যা হয় কি না, যাত্রীদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না জানতে চান তিনি। যাত্রীরা জানান, ঈদযাত্রার প্রথম দিনে খুব বেশি চাপ না থাকায় তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। তবে ট্রেনে সেবার মান উন্নয়নের দাবি জানান যাত্রীরা। ধীরে ধীরে তা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়।
যাত্রীদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে রেলওয়ে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়ে রেল সচিব ফাহিমুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে রেলের যে প্রস্তুতি রয়েছে, তাতে ঈদযাত্রায় বড় ধরনের শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখছে না কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, গত ঈদুল ফিতরে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ভালোই ছিল। তবে পশ্চিমাঞ্চলে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া এবং কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় লেভেল ক্রসিংয়ে বাসের সঙ্গে দুর্ঘটনার মতো দুটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল।
লোকোমোটিভ সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন রেল সচিব। তিনি বলেন, মিটারগেজ লোকোমোটিভের কিছু সংকট রয়েছে। তাই আমরা আগে থেকেই কর্মপরিকল্পনা নিয়েছি। ঈদের সময় ৮৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সচল রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলোয় ম্যাজিস্ট্রেটসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত দায়িত্ব পালন করবে। স্টেশনে টিকিটবিহীন যাত্রী প্রবেশ ঠেকাতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ।
তিনি বলেন, যাত্রী চাপের কারণে এবারও ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট রাখা হয়েছে। ঈদের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ত্যাগ করে, সেজন্য রেলের চাহিদা অনেক বেশি থাকে, যা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হয় না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী, জিআরপি, মেট্রোপলিটন পুলিশ, এপিবিএন, র্যাব ও আনসার সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করছেন। কমলাপুর স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছিনতাই, পকেটমার ও বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। যাত্রীরা যেকোনো অভিযোগ, তথ্য বা সহায়তার জন্য রেলওয়ের ১৩১ হটলাইনে যোগাযোগ করতে পারবেন।
সাতদিন ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ
ঈদে ঘরমুখী মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে মহাসড়কে পণ্যবাহী যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। গতকাল জারি করা সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা জানানো হয়। এতে বলা হয়, ঈদের আগের তিনদিন এবং ঈদের পরের তিনদিনসহ মোট সাত দিন অর্থাৎ ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ থাকবে।
তবে পশুবাহী যানবাহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালী ও খাদ্যপণ্য, পচনশীল দ্রব্য, গার্মেন্টসামগ্রী, ওষুধ, সার এবং জ্বালানি বহনকারী যানবাহন এ নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মোবাইল নম্বর ০১৫৫০০৫১৬০৬, ০১৫৫০০৫৬৫৭৭, ০১৫৫০৭২২০৬৫ ও ০১৫৫০৭২২০৬৬-এ যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
১০ শতাংশ কম ভাড়া নেবে লঞ্চ মালিকরা : প্রতিমন্ত্রী
গতকাল বিকালে নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পরিদর্শন করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। তিনি বলেন, আমরা জাহাজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ১০ শতাংশ কম ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে জাহাজ ঘাটে ফেরা এবং ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে।
নৌ প্রতিমন্ত্রী বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে লঞ্চে ওঠানামার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে নদীপথে নতুন চারটি লঞ্চ যুক্ত করা হয়েছে এবং সি-ট্রাক নিয়মিত চলাচল করছে। যাত্রীদের সুবিধার্থে প্রতিটি লঞ্চে ডিজিটাল ভাড়া চার্ট ও সময়সূচি প্রদর্শনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত বছরের মতো এবারও ট্রলি সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থায়ী ট্রলি ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীদের আরো ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। ঈদের আগের পাঁচদিন এবং পরের পাঁচ দিন এই সেবা চালু থাকবে। অসুস্থ ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য ট্রলি, হুইলচেয়ার, চিকিৎসক ও স্বেচ্ছাসেবক টিম কাজ করবে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী লঞ্চের মালিক, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
২৩ মে থেকে ২ জুন বাল্কহেড চলাচল বন্ধ
নৌপথে যাত্রী চলাচল নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে নতুন কয়েকটি নৌরুটে লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা কাজী আরিফ বিল্লাহ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, আগামী ২৪ মে থেকে কাঞ্চন ব্রিজ সংলগ্ন শিমুলিয়া টুরিস্ট ঘাট থেকে শিমুলিয়া-চাঁদপুর-ঈদগাঁও এবং ঢাকার বসিলা লঞ্চঘাট থেকে বসিলা, হাকিমুদ্দিন, চাঁদপুর, মুলাদি, গলাচিপা, বরিশাল ও ইলিশা নৌরুটে লঞ্চ চলাচল করবে। সেবা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বিআইডব্লিউটিএর হটলাইন ১৬১১৩ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।
এছাড়া সদরঘাট থেকে ঈদের আগের পাঁচদিন সব যাত্রীবাহী নৌযানে মালামাল পরিবহন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ঈদের পরবর্তী পাঁচদিন অন্যান্য নদীবন্দর থেকে সদরঘাটগামী যাত্রীবাহী নৌযানেও মালামাল পরিবহন নিষিদ্ধ থাকবে। এতে আরো বলা হয়, ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত দিন-রাত সার্বক্ষণিক সব ধরনের বাল্কহেড চলাচল বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় ও দ্রুত পচনশীল পণ্যবাহী ট্রাক ছাড়া সাধারণ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ফেরিতে পারাপার বন্ধ থাকবে।
বলা হয়েছে, যাত্রীদের জরুরি প্রয়োজনে বিআইডব্লিউটিএর হটলাইন ১৬১১৩, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯, সরকারি তথ্য ও সেবা ৩৩৩, ফায়ার সার্ভিস ১০২, কোস্ট গার্ড ১৬১১১ এবং নৌপুলিশের ০১৭৬৯-৭০২২১৫ নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের নৌকা বা ট্রলার থেকে লঞ্চে ওঠানামা না করার এবং ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে নেমে হেঁটে ওঠার অনুরোধ জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
আব্দুল্লাহপুরে ১৬০ মিটার রিজিড পেভমেন্ট চালু
রাজধানী থেকে উত্তরাঞ্চলগামী যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর ইন্টারসেকশনে ১৬০ মিটার রিজিড পেভমেন্ট যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। গতকাল সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ নবনির্মিত অংশটি পরিদর্শন শেষে যান চলাচলের জন্য খুলে দেন।
সেতু সচিব বলেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতে যানজট কমানো এবং রাজধানীতে প্রবেশ ও বহির্গমন সহজ করতেই দ্রুততার সঙ্গে এই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। ঈদের আগেই গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক অংশ চালু হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে কমবে।
চন্দ্রার অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের নির্দেশ
উত্তরের পথে ঈদযাত্রায় ভোগান্তি কমাতে আগামীকাল সোমবার থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় অর্ধশতাধিক বাস কাউন্টার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। এতে ওই এলাকাটিতে যানবাহন ও ভাড়ার নৈরাজ্য অনেকটাই কমবে বলে ধারণা প্রশাসনের। গতকাল দুপুরে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর হাইওয়ে পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ। এসব বাস কাউন্টারে ঈদের আগ মুহূর্তে অধিক মূল্যে টিকিট বিক্রি ও যাত্রী হয়রানির অভিযোগ উঠায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।