বঙ্গোপসাগরে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে সাগরের গভীর ও অগভীর অঞ্চলের মোট ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যেখানে অংশ নিতে পারবে বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো। দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৭ সালের মধ্যে অনুসন্ধান কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে যোগ্য কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস উত্তোলনে ২৫ বছর এবং তেল উত্তোলনে ২০ বছর মেয়াদি চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬’ ও বিডিং রাউন্ড বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে দরপত্রের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি বিভাগের সচিব সাইফুল ইসলাম। দরপত্রের ওপর প্রবন্ধ ও অন্যান্য তথ্য উপস্থাপন করেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান।
বঙ্গোপসাগরে তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধানের গুরুত্ব তুলে ধরে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এ খাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ বহু আগেই নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রতিবেশী মিয়ানমার ও ভারত নিজ নিজ জলসীমায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন করে ইতোমধ্যে রপ্তানিও করছে। অথচ আমাদের এখানে অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা করা হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ উল্লেখ করেন, ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের সময় দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন গতি আসে এবং এবারও বিএনপির হাত ধরেই এ খাতে নতুন সাফল্য অর্জিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানান, দেশের তেল ও গ্যাস মাটির নিচে রেখে আমদানিকে উৎসাহিত করে গেছে পলাতক আওয়ামী লীগ সরকার। আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে বিদেশনির্ভরতা কাটিয়ে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাই।
মডেল পিএসসি ২০২৬ (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) ও দরপত্রের বিভিন্ন শর্তের কথা তুলে ধরে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা সংবাদ সম্মেলনে জানান, খসড়া চুক্তি অনুযায়ী, অনুসন্ধানের সময় মোট ৯ বছর। এর মধ্যে ভূতাত্ত্বিক জরিপ, দ্বিমাত্রিক বা ত্রিমাত্রিক জরিপ করতে হবে চার বছরের মধ্যে। তারপর কূপ খননের সময় দেওয়া হবে দুই বছর। পরের তিন বছরের মধ্যে যেতে হবে উৎপাদনে। চুক্তি করার পর অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ভূতাত্ত্বিক জরিপ করতে হবে। শুধু ভূতাত্ত্বিক জরিপ করায় বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, দরপ্রস্তাব পর্যালোচনা করার পর কাজ পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে জরিপ করার আগেই ৩০ লাখ ডলার ব্যাংক জমানত দিতে হবে। তারপর কূপ খননের আগে দিতে হবে দুই কোটি ডলার। আবার গ্যাস বা তেল পাওয়া গেলে তা উত্তোলনের আগে দুই কোটি ডলার ব্যাংক জমানত দিতে হবে। বিদেশি কোম্পানি এখানে যত বিনিয়োগ করবে তা গ্যাস বা তেল বিক্রি থেকেই তুলে নেবে। পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের টাকা তুলতে হবে। বছরে খরচের ৭৫ শতাংশের বেশি নিতে পারবে না বলেও দরপত্রের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
লভ্যাংশ বণ্টনের বিষয়ে বলা হয়েছে, খরচ বাদ দিয়ে যা থাকবে তা পেট্রোবাংলা ও বিদেশি কোম্পানির মধ্যে ভাগ হবে। অগভীর সমুদ্রে পেট্রোবাংলার লাভের অংশ হবে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশের মধ্যে। আর গভীর সমুদ্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। গ্যাস বা তেলের বাকি অংশ পাবে বিদেশি কোম্পানি। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন ও উন্নয়নের সব পর্যায়ে সব ধরনের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানিতে শুল্ক মওকুফ থাকবে।
কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে নতুন পিএসসিতে। সমুদ্রে তেল বা গ্যাস পেলে বিদেশি কোম্পানি রপ্তানি করতে পারবে। তবে পেট্রোবাংলা নিতে চাইলে অগ্রাধিকার পাবে। পেট্রোবাংলা না নিলে উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তা রপ্তানি করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যাস বা তেলের দাম নির্ধারণ করা হবে উল্লেখ করে কর্মকর্তারা জানান, চুক্তিতে উচ্চ দাম ও নিম্ন দাম নির্ধারণ করা থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন জ্বালানি তেলের যে দাম থাকবে গভীর সমুদ্রের জন্য সেই দামের ১১ শতাংশ হবে গ্যাসের দাম। অর্থাৎ প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১০০ ডলার হলে প্রতি এমএমসিএফডি গ্যাসের দাম হবে ১১ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এর চেয়ে বেশি হলেও কখনোই গ্যাসের দাম ১১ ডলারের বেশি দাম হবে না। আবার তেলের দাম যতই হোক না কেন, গ্যাসের দাম কখনোই সাড়ে সাত ডলারের নিচে নামবে না। ফলে গ্যাসের দাম সর্বোচ্চ ১১ এবং সর্বনিম্ন সাড়ে সাত ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। আর অগভীর সমুদ্রের জন্য সর্বোচ্চ দাম হবে সাড়ে ১০ ডলার।
শ্রম আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে সব বিনিয়োগকারীকে তার মোট লাভের পাঁচ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দিতে হলেও সমুদ্রে বিনিয়োগকারীদের শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে দেড় শতাংশ জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গ্যাস বা তেল পেলে তা আনতে যে পাইপলাইন করতে হবে সেই খরচ বিনিয়োগকারী বহন করবে। সে ক্ষেত্রে দূরত্ব, পানির গভীরতা ও তেল বা গ্যাসের পরিমাণ বিবেচনায় রাখা হবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা জানান, অগভীর সমুদ্রে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ হিস্যা রাখা হয়েছে। তবে গভীর সমুদ্রে বাপেক্সের কোনো অংশ থাকবে না। প্রাথমিকভাবে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে গ্যাসক্ষেত্রের জন্য ২৫ বছর আর তেলখনির জন্য ২০ বছরের চুক্তি করা হবে। তবে চাইলে তা আরো ১০ বছর বাড়ানো যাবে। সব প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালের শেষের দিকে সমুদ্র গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা যাবে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।
জ্বালানি অনুসন্ধানে নতুন যুগের সূচনার হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, মরহুম প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও দেশীয় গ্যাস কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছে। সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম অধিক চ্যালেঞ্জিং হওয়ায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়া ১৯৯৩ সালে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন আর তার সুযোগ্য পুত্রের হাত ধরে ২০২৬ সালে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের জ্বালানি সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি। নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আমরা ১০০ দিনের মধ্যেই বিড রাউন্ড আহ্বান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কয়েক দফায় কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করে অফশোর মডেল পিএসসির খসড়া চূড়ান্ত করে দিয়েছি। সর্বশেষ অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য মডেল পিএসসির কিছু বিধান সংশোধন ও সংযোজন করা হয়েছে।
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অনেক চ্যালেঞ্জিং উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর জন্য তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীরা তেল-গ্যাস উত্তোলন করতে না পারলে সরকার তাদের বিনিয়োগের কোনো অর্থ তাদের ফেরত দেবে না, উপরন্তু তাদের ব্যাংক গ্যারান্টির অর্থ বাজেয়াপ্ত করবে। এ কারণে আমরা আমরা দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিনিয়োগ যেন আসে, সে বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছি।
বর্তমান সরকার অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের যে উদ্যোগ নিয়েছে তাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাড়া দেবে এবং তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের সমুদ্র এলাকায় নতুন নতুন তেল-গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।