* দুদেশের মধ্যে ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত
* বাংলাদেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করবে চীন
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মাধ্যমে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন যুগের শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের আগামী দিনের পথচলার রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তিও রচিত হয়েছে এ সফরের মাধ্যমে। সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে— দুদেশের মধ্যে ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়’ গঠনের সিদ্ধান্ত। চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটাকে সর্বোচ্চ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আগামী দিনগুলোতে অটুট রাখতে দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়েছেন। চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ রাজনৈতিক সমর্থনের কথা জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর তাইওয়ান ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের অবস্থানই বাংলাদেশের অবস্থান। অন্যদিকে শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশের ব্যাপারে তার প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিশ্ব পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বন্ধুত্ব কখনোই বদলাবে না। যেকোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পাশে থাকবে চীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষায় চীনকে সব সময় পাশে পাবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করবে চীন।
এদিকে চীন সফরকে অত্যন্ত সফল আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গতকাল শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে দুদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ এখন মর্যাদার আসনে আসীন। এ সফরের মাধ্যমে তা-ও প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের সবাইকে নিজেদের আত্মমর্যাদার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। একজন প্রধানমন্ত্রীর সফরে কোনো দেশের কাছ থেকে আমরা কী সহযোগিতা পেলাম, সে ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহায্যের জন্য ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেইজিং যাননি। তিনি সেখানে গেছেন দুদেশের সম্পর্ককে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে। আর এক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি সফল হয়েই দেশে ফিরেছেন।
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন যুগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর শেষে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ঘোষিত ১৫ দফা যৌথ ঘোষণাপত্রে জানানো হয়েছে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেবে চীন। এক্ষেত্রে দুদেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করবে।
দুদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, উচ্চপর্যায়ের সফর এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথভাবে দুদেশের মধ্যে ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায় গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। এর ফলে বিদ্যমান কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব আরো উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হলো।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু প্রতীকী ঘোষণা নয়, বরং আগামী বছরগুলোতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ খাতে সহযোগিতা জোরদার করবে চীন, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা যৌথভাবে রক্ষা করা যায়।
বাংলাদেশকে ১০০ শতাংশ শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়ায় চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়, যা চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে। দুপক্ষ যৌথভাবে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নিতে সম্মত হয়।
চীন ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের আবেদনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। বাংলাদেশ ও চীন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ের ফলাফল দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা এবং ফ্যাসিবাদ ও সামরিকীকরণের পুনরুত্থানের যেকোনো চেষ্টার বিরোধিতা করা জরুরি বলে একমত পোষণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগ সহায়তা, জিডিআই, মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়তা, চীনের ভাষা শিক্ষা এবং গণমাধ্যমের নানা পরিসরে সহায়তা।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। যদিও এ নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে এ ধরনের করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সংযোগ ব্যবস্থায় নতুন সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ চীনের প্রস্তাবিত গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে (জিডিআই) যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৬ সালে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) যোগ দেওয়ার পর এটিই চীনের আরেকটি বড় বৈশ্বিক উদ্যোগে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা। এর ফলে উন্নয়ন অর্থায়ন, দারিদ্র্যবিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে চীনা প্রেসিডেন্টের চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থেকে চীন সরে আসবে না। চীন সব সময় বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের পাশে থাকবে। চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের পক্ষে রয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীন নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায় গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে দুদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো উচ্চপর্যায়ে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, চীন সব সময়ই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিতে অবিচল রয়েছে। বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সামগ্রিক দিকনির্দেশনা থেকে চীন সরে আসবে না।
চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের পক্ষে রয়েছে। একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময়, বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি, কৌশলগত সংলাপ জোরদার এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা আরো গভীর করতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং।
শি জিনপিং আরো বলেন, বাংলাদেশে নতুন সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমে সমর্থন অব্যাহত রাখবে চীন। পাশাপাশি উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) সহযোগিতা বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয়, অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে সুশৃঙ্খল সহযোগিতা এবং সবুজ ও নিম্ন কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চায় চীন।
তিনি স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিনিময় বৃদ্ধির পাশাপাশি আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের (সিএমবিসি) উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে শি জিনপিং বলেন, উভয় দেশ সমতা ও শৃঙ্খলাভিত্তিক বহু মেরু বিশ্বব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন প্রতিষ্ঠায় যৌথভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ এবং দুদেশের বৈধ অধিকার রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করবে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চায়না কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, চীন একটি মহান দেশ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যৎসম্পন্ন সম্প্রদায়ে উন্নীত করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন অসাধারণ উন্নয়ন অর্জন করেছে এবং চীনা আধুনিকায়ন বাংলাদেশের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য মডেল। বাংলাদেশ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, বিআরআই সহযোগিতা জোরদার এবং অর্থনীতি, বাণিজ্য, সংযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে চায়।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে এক চীন নীতি অনুসরণ করে, তাইওয়ানকে চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবের কর্তৃত্বকে সমর্থন করে।
তিনি আরো বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায় গঠন এবং চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ বিশ্ব শান্তি, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ এসব উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন জানায় এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা আরো জোরদার করতে প্রস্তুত। বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক সর্বোচ্চ উচ্চতায় : পররাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, এ সফরে দুই দেশ ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গঠনে সম্মত হয়েছে। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এবারের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো ঘনিষ্ঠ ও সর্বোচ্চ বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকালীন বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে বাংলাদেশের গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে, যা কুয়ালালামপুর ও বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ককে আরো জোরদার করেছে।
ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হুমায়ুন কবির বলেন, রাজনৈতিক পর্যায়ে সহযোগিতা জোরদারে দুপক্ষ দলীয় পর্যায়ে একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করেছে, যা আনুষ্ঠানিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীন সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরো গভীর করতে সম্মত হয়েছে। মালয়েশিয়া ও চীন সফর শেষে গত শুক্রবার রাতে দেশে ফেরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশে তার ছয় দিনের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর শেষ হয়।
যে ১৭ চুক্তি-সমঝোতা সই
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে ১৭ চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, প্রটোকল ও অ্যাকশন প্ল্যান সই হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল এসব সমঝোতা ও চুক্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়। যেসব চুক্তি ও সমঝোতা সই হয়েছে, তা হলো—
১. বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি। ২. মোংলা বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের কাঠামো চুক্তি। ৩. ‘২০২৬ মানবসম্পদ উন্নয়ন সহযোগিতা পরিকল্পনা’ যৌথ বাস্তবায়নের বিষয়ে সমঝোতা স্মারক। ৪. চীন এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ’-এর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিতকরণ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। ৫. বাংলাদেশ থেকে চীনে তাজা কাঁঠাল রপ্তানির ক্ষেত্রে উদ্ভিদ স্বাস্থ্য (ফাইটোস্যানিটারি) সংক্রান্ত শর্তাবলিবিষয়ক প্রটোকল। ৬. চীনা মিডিয়া গ্রুপ এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারকরণ বিষয়ক স্মারক। ৭. চীনা মিডিয়া গ্রুপ এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক। ৮. ‘গ্লোবাল সাউথ মিডিয়া অ্যান্ড থিংক ট্যাংক ফোরাম’-এর কাঠামোর আওতায় চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) মধ্যে সমঝোতা স্মারক। ৯. চীনের সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি এবং বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক। ১০. চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চীনা ভাষা শিক্ষায় সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তি। ১১. বৃত্তিমূলক শিক্ষায় সহযোগিতা জোরদারকরণ বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। ১২. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। ১৩. সবুজ উন্নয়নে বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক। ১৪. বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা। ১৫. চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের ডেভেলপার ও ভূমি ইজারা চুক্তি। ১৬. চীন-বাংলাদেশ মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের লক্ষ্যে সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক। ১৭. দুদেশের মধ্যে বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তি।