দীর্ঘ দুইমাসেরও বেশি সময় রহস্যজনক নীরবতা ভেঙেছে মন্ত্রণালয়ের। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল রিভিউ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এজন্য একটি কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ‘তাড়াহুড়ো’ করে এমসিকিউ পরীক্ষা নিয়ে ফল প্রকাশ করা হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সেটি আমলে না নিয়ে দ্রুত মৌখিক পরীক্ষা শেষ করে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করার ফলে বিতর্ক আরো জোরালো হয়। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের কয়েকদিন পরই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মন্ত্রীর কাছে এ নিয়োগ নিয়ে একাধিক অভিযোগ জমা হওয়ায় তিনি পুরো বিষয়টি রিভিউ করার দিকে এগুচ্ছেন।
মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্রটি আরো বলছে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রথম থেকেই বিতর্ক উঠেছিল। ‘তাড়াহুড়ো’ করে পরীক্ষা আয়োজন, বিভিন্ন জেলায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ এবং অসংখ্য চাকরিপ্রার্থী ডিভাইসসহ আটকও হয়েছিলেন। এসব বিতর্কের কারণে পুরো নিয়োগ পরীক্ষা রিভিউ হতে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ওভারনাইট পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এজন্য পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া রিভিউ করা হতে পারে। আমরা একটি কমিটি গঠনের বিষয়ে ভাবছি। এ কমিটি পুরো বিষয়টি দেখভাল করবে।’
এদিকে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও চাকরিতে যোগদান নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় সংবাদ সম্মেলন করে অবিলম্বে দ্রুত যোগদানের তারিখ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। একই সঙ্গে দেশের ৬১ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন তারা।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি পার্বত্য ৩ জেলা ছাড়া দেশের ৬১ জেলায় সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। একমাসের ব্যবধানে গত ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে প্রার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডোপ টেস্টসহ সব ধরনের সনদ যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি আবেদনকারীর মধ্যে ৬৯ হাজার ২৬৫ জন মৌখিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন । পরে চূড়ান্তভাবে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন নিয়োগের সুপারিশ পান।
নিয়ম অনুযায়ী এর পরপরই যোগদান প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে গত দুই মাস ধরে প্রক্রিয়াটি থমকে আছে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় কিংবা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে। সংস্থা দুটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ঘোষণা দেয়নি।
এ বিষয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দুই মাস পরেও নিয়োগপত্র না পাওয়ায় এবং ফলাফল ‘রিভিউ’ হওয়ার গুঞ্জনে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। তারা দ্রুত যোগদান কার্যক্রম সম্পন্নের দাবিতে গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। একই সঙ্গে দেশের ৬১ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন তারা। মঙ্গলবার বিকালেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সামনে সংবাদ সম্মেলনে থেকে দ্রুত নিয়োগপত্র দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
লিখিত বক্তব্যে হুমায়ুন বলেন, 'দীর্ঘদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় প্রায় ১৫ হাজার সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী এবং তাদের পরিবার বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক উদ্বেগের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। এই অবস্থায় দ্রুত নিয়োগ ও পদায়নের দাবিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।'
এর আগে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর দেওয়া স্মারকলিপিতে প্রার্থীরা বলেন, চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর দুই মাস অতিবাহিত হলেও রহস্যজনক কারণে নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে না। এর আগে ১৩ এপ্রিল একই দাবিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়েও স্মারকলিপি দেন তারা। এতে তারা আরো বলেন, ৬১টি জেলার হাজারো প্রার্থীর মেডিক্যাল ও ডোপ টেস্ট সম্পন্ন হওয়ার পরও মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা না দেওয়ায় তারা সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন।
এদিকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত চাকরিপ্রার্থীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সব আনুষ্ঠিকতা শেষ করছি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এবং পরে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু এ পর্যন্ত আশানুরূপ কোনো কিছু দেখতে পাইনি। আগামী ১০ দিনের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে আমরা কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।’
ওই চাকরিপ্রার্থী আরো বলেন, ‘কোনো কারণে আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে টালবাহানা করলে আমরা আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব।’
এমপি