বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ২৯ জুনিয়র পরামর্শককে বিধিবহির্ভূতভাবে কর্তৃপক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা আওয়ামী আমলে কোনো ধরনের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ পেয়েছিলেন। বিষয়টি সরকারের অডিটে উঠে এলে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কমিশনকে একাধিকবার চিঠি দিলেও তাতে কাজ হয়নি। উল্টো নতুন সরকার আসার আগে অবৈধ জুনিয়র পরামর্শকদের তড়িঘড়ি করে পদোন্নতি দেওয়ার তোড়জোড় চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে ২৯ জনকে ‘জুনিয়র পরামর্শক’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সরকারের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই নিয়োগকে ‘অবৈধ’ এবং ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার চিঠি দিলেও বর্তমান কমিশন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো সাত বছর ধরে অডিট আপত্তিতে থাকা এসব কর্মকর্তার পদোন্নতি দিতেই এখন কমিশন সভার তারিখ বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ কর্মীদের।
এদিকে সরকার শ্বেতপত্র কমিটি গঠন করে বিগত ১৫ বছরের টেলিযোগাযোগ খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশনা দেয়। সম্প্রতি কমিটি তাদের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা বরাবর দাখিল করে। শ্বেতপত্র কমিটিও বিটিআরসিতে জনবল নিয়োগে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির সন্ধান পায়। প্রতিবেদনে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মকর্তার নাম উঠে আসে।
বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া জুনিয়র পরামর্শকদের পদোন্নতি দিতে কমিশন এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের পদোন্নতি দিতে দুবার কমিশন সভার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে; যা কমিশনের ইতিহাসে বিরল একটি ঘটনা।
জানা যায়, গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে বিভাগীয় পদোন্নতি সভা (ডিপিসি) অনুষ্ঠিত হয়। এতে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগ সংক্রান্ত অডিট আপত্তি রয়েছে তাদের পদোন্নতি দেওয়া হবে না—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পদোন্নতি সভায় সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, ডাক টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনোনীত তিনজন যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা অডিট আপত্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়ে একমত হন। তবে সেদিন যোগ্যদের পদোন্নতির বিষয়টিও রহস্যজনকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এরপর ২৬ জানুয়ারি জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে বৈঠক হলেও আগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না করে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়।
জানা যায়, বিটিআরসির ২০০৯ সালের প্রবিধানমালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত না হওয়া সত্ত্বেও ২০২২ সাল পর্যন্ত তা দিয়েই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের নতুন প্রবিধানে ‘সহকারী পরিচালক’ থেকে ‘সিনিয়র সহকারী পরিচালক’ পদটিকে পদোন্নতিযোগ্য করা হয়। তবে প্রবিধানের অস্পষ্টতা ও সংশোধনী চূড়ান্ত না হওয়ার সুযোগে একটি মহল প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বর্তমানে বিটিআরসির ৩৫৫ জন স্থায়ী জনবলের মধ্যে ১৫৩ জনের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, যাদের অনেকেই এখন পদোন্নতির দৌড়ে শামিল। বর্তমানে পরিচালক পদে চারজন, উপপরিচালক পদে ছয়জনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রয়েছে। যোগ্য ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অযোগ্যদের পথ সুগম করতে তাদের ন্যায্য পদায়ন বিলম্বিত করা হচ্ছে। ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ছয় থেকে সাতটি পদ শূন্য থাকলেও এই গ্রেডের কর্মচারীরা দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত রয়েছেন।
এ বিষয়ে পরিচালক পদে পদোন্নতিপ্রত্যাশী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা বঞ্চিত আছি। আশা করেছিলাম, আওয়ামী লীগের পতনের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলো, তখন অবৈধ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং যোগ্যদের পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু, উল্টো যারা আওয়ামী সরকারের সময় অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তাদেরই আবার পদোন্নতির জন্য তোড়জোড় চলছে।’
এ বিষয়ে জানতে বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারীকে কল করা হলে তা রিসিভ হয়নি।