গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার বহন করছে দেশ। রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নতুন সংসদকে এগিয়ে যেতে হবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদরা যে চিন্তা-চেতনা বুকে ধারণ করে জীবন দিয়ে দেশ থেকে স্বৈরাচার সরকারকে অপসারণ করেছে, তাদের রেখে যাওয়া চিন্তা-চেতনা এই সংসদের মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। আমরা এই সংসদের কাছে আশাবাদী। তবে এত দ্রুত এই সংসদকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন মাইলফলক বলা যাবে না। এই সংসদ কতটা জনবান্ধব তা বোঝা যাবে আগামী বাজেট অধিবেশনে এবং সংসদের মূল্যায়ন করা হবে সব অধিবেশন শেষ হওয়ার পর। আমাদের ঐক্যই আমাদের মুক্তির পথ। আমরা যদি পূর্বের মতো বিভক্তির রাজনীতিতে বিশ্বাস করি, তবে আমরা গণতন্ত্রের শত্রুতে পরিণত হবো।
গতকাল বুধবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সিটিজেন ফোরাম বাংলাদেশ (সিএফবি) আয়োজিত ‘বর্তমান জাতীয় সংসদ; গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে একটি নতুন মাইলফলক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, রাজনীতিক ও সংসদ সদস্যরা এসব কথা বলেন। সিএফবি চেয়ারম্যান ইমেরিটাস অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে গোলটেবিল আলোচনায় উঠে এসেছে সংবিধানের মিশ্র প্রয়োগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রতিষ্ঠানের ধ্বংসস্তূপ এবং নতুন সংসদের কার্যকারিতা নিয়ে নানামুখী বিশ্লেষণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খান এতে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের অধিকাংশই প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছে। এর কারণ দীর্ঘদিন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়া। এই সদস্যদের গ্রুমিংয়ের মাধ্যমে এবং সবার সদিচ্ছার মাধ্যমে এই সংসদ শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে স্থান পাবে বলে আশাবাদী।
অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে, ইট ইস টু আর্লি টু সে, দিস পার্লামেন্ট ইজ এ নিউ মাইলস্টোন ইন ডেমোক্রেটিক পলিটিক্স। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বাংলাদেশ চলছে অংশত ৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী, অংশত সংবিধানবহির্ভূত প্রয়াসের মাধ্যমে। এই মিশ্রণ শংকর জাতীয় পরিস্থিতি।
তিনি সাবধান করে দিয়ে বলেন, বিশ্বে এখন গণতন্ত্রের ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখা যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকার বহন করছে। কেবল সংবিধান সংশোধন করলেই গণতন্ত্র ফিরবে না, বরং ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
সাবেক মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক অধ্যাপক ড. আব্দুল মঈন খান বর্তমান সংসদের কার্যকারিতা ও সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সংসদ আইন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সংস্কারটি হচ্ছে মূল কাজ। তবে বাস্তবতা ভিন্ন।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের যে কনসার্ন, আমার কাছে মাঝে মাঝে অপরাধী মনে হয়- আমি কি রাবার হয়ে বসে আছি? তবে আমি আশাবাদী ২০২৪-এর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সংসদকে মানুষের কল্যাণে পরিচালিত করা সম্ভব হবে। চব্বিশের আগস্টে যারা জীবন দিয়েছিল এদেশ থেকে একটি জগদ্দল পাথর সরানোর জন্য, তারা সফলভাবে সে অর্জনটি করেছিল। তারা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে কিছু চিন্তা-চেতনা আমাদের সামনে রেখে গেছে। আমি বিশ্বাস করি, সেই চিন্তা-চেতনাকে এই সংসদের মাধ্যমে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, ২০২৪-এর রেনেসাঁ আমাদের একটি সুযোগ করে দিয়েছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক সংস্কারের ধীরগতি সেই মাইলফলক অর্জনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র সফল হতে পারে না। একটিমাত্র অধিবেশনের পর এ সংসদকে মাইলফলক বলা যাবে না। তবে আমি যে সৌহার্দ্য ও আচরণ দেখেছি, মনে হচ্ছে যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের যে ভঙ্গুর পথ তা অতিক্রম করতে হলে শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে হবে। আমাদের গণতন্ত্রকে সফল করতে হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন একটি আধুনিক ও বাস্তবমুখী শিক্ষানীতি। অতীতে অনেক শিক্ষা কমিশন হলেও সেগুলোর ইতিবাচক সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। আমি সরকারের কাছে আহ্বান জানাই, অনতিবিলম্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে একমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করা হোক, যাতে আমরা শিক্ষিত সুনাগরিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টি করতে পারি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ১৯৭৩, ২০০১, ২০০৮ এবং ২০১৮ সালসহ মোট পাঁচবার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আগের চারবারের কোনোবারই কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়নি; এটি একটি অশুভ সংকেত। এ বিষয়টিকে স্মরণে রেখে বলতে চাই, অতীতে আমরা বিফল হয়েছি, কিন্তু এবার যেন আমরা সফল হই।
তিনি বলেন, অতীতে স্বৈরাচারের সময় সংসদ সদস্যরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আমাদের এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার যাতে আমরা ব্যর্থ না হই এবং যে রক্তের বিনিময়ে এ পরিবর্তন এসেছে, তার সঙ্গে যেন আমরা বিশ্বাসঘাতকতা না করি। আমরা যেন রক্তের ঋণ শোধ করে সফল হতে পারি।
বিশিষ্ট সাংবাদিক এম আবদুল্লাহ বলেন, মর্নিং শোজ দ্য ডে। তাই আমরা আশাবাদী। বর্তমান স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এই সংসদ কতটা জনবান্ধব তা বোঝা যাবে আগামী বাজেট অধিবেশনে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, জাতীয় সংকটের সময় সফল না হলেও মানুষের কাছে স্বচ্ছ থাকা উচিত। পাশাপাশি জেন্ডার বাজেট ও সংসদীয় কমিটিতে নারীদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ২০১৪, ১৮ বা ২৪-এর ‘নামমাত্র’ সংসদের তুলনায় ত্রয়োদশ সংসদ নিঃসন্দেহে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জায়গায় আছে। তবে ২০২৫-এর সংস্কার প্রস্তাব ও বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো এবং সংস্কার কমিশন দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত অনেক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন হয়েছে। বিশেষ করে গণভোট বা গণপরিষদ প্রশ্নে নানা বিতর্ক ছিল। বিএনপি যেন পুরাতন স্বৈরাচারী তরিকায় না হাঁটে।
সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মোজাহিদ বলেন, এখানে দুইটা ভোট হয়েছে। দুইটাই কিন্তু জনগণ আপনাকে বৈধতা দিয়েছে। আপনি একটা নিয়েছেন, একটাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। আপনি জনগণের বৈধতাকে যখন দুর্বল করে ফেলবেন তখন আপনিও দুর্বল হয়ে যাবেন। দুর্বল হলে আপনাকে অনেকের সহযোগিতা নিয়ে টিকে থাকতে হবে। সুতরাং এটা করাটা খুবই অন্যায় হবে। জনগণের ক্ষমতাকে যদি আপনি শতভাগ সম্মান করতে চান। তবে কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবে না। জনগণের রায় মেনে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সিএফবি মহাসচিব ড. ইশারফ হোসেনের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম প্রমুখ।
এএস