বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীতে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি এলাকায় সামান্য বৃষ্টি হলে তাতে তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও দুপুর থেকে মেঘলা আকাশে ভ্যাপসা গরম বেড়েছে। প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরমে জনজীবন ওষ্ঠাগত, বৃষ্টির পূর্বাভাস সত্ত্বেও সহসা স্বস্তির লক্ষণ নেই।
শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশে তীব্র ভ্যাপসা গরমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মে মাসের এই সময়ে এসে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য বা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে গরমের অনুভূতি বহুগুণ বেড়ে গেছে। আবহাওয়া অফিস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস দিলেও বাস্তব চিত্রে গরম থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় স্বস্তির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের ওপর দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর আগাম প্রভাব এবং বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা প্রচুর জলীয় বাষ্পের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। থার্মোমিটারে তাপমাত্রা যা-ই দেখা যাচ্ছে, অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে মানুষের শরীরে গরম অনুভূত হচ্ছে তার চেয়ে ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ফলে সামান্য পরিশ্রমেও শরীর ঘেমে যাচ্ছে এবং এক ধরনের অস্বস্তিকর গুমোট পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বিকালে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা আমার দেশকে বলেন, বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যে এ ধরনের ভ্যাপসা গরম অনুভুত হচ্ছে। রাতে ও শুক্রবার রাজধানীতে বৃষ্টি হলেও খুব বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। ফলে রাজধানীতে এ ধরনের গরম আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
সামান্য বৃষ্টির পরও কেন এতো গরম অনুভুত হচ্ছে এ প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির আমার দেশকে বলেন, বৃষ্টির পরিমাণ বেশি না হলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যায়; এতে গরম আরো বেশি অনুভুত হয়। কেননা ঘায়ের সহজে ঘাম শুকাতে দেয় না। রাজধানীসহ সারাদেশে গরম কমার সম্ভাবনা সহসাই দেখা যাচ্ছে না।
এর আগে গত বুধবার রাজধানীতে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায় । আগের দিনের তুলনায় তাপমাত্রা ২ দশমিক ২ ডিগ্রীর মতো কমে বৃহস্পতিবার ৩৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে; যা আগের দিন ছিল ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। বুধবারের মতো বৃহস্পতিবার রাজধানীতে তাপপ্রবাহ না থাকলেও সকাল থেকে ভ্যাপসা গরম অনুভুত হচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহের মতো। এছাড়া গত ৪-৫ দিন থেকে প্রচণ্ড গরম পড়েছে রাজধানীতে। এছাড়া বৃষ্টির প্রবণতা কমে ও তাপমাত্রা বেড়ে দেশের অধিকাংশ এলাকায় তীব্র ভ্যাপসা গরম অনুভুত হচ্ছে।
দেশের কোথাও তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেই তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলে ধরা হয়। এদিকে থেকে বৃহস্পতিবার খুলনা বাগেরহাট সাতক্ষীরা ও যশোর জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে যায়; যা আগের দিন ১০ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল।
আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বৃহস্পতিবার রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ভারী বৃষ্টি হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা কমে ভ্যাপসা গরম ছিল।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী ৫ দিনের এই পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, দেশের তিনটি বিভাগে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু অঞ্চলের ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, যা অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর দেওয়া তথ্য মতে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রামের রাজারহাটে সর্বোচ্চ ১০৯ মিলিমিটার; নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯৯, দিনাজপুরে ৯৮, রংপুরে ৬২, পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ৫০, নওগাঁর বদলগাছীতে ৪৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। যা আগের দিন সিলেটে সর্বোচ্চ ১০৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছিল।
এদিকে প্রচণ্ড গরমে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান শহরগুলোতে শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। রিকশাচালক, দিনমজুর ও হকারদের তীব্র রোদে কাজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দুপুরের দিকে রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল আগের তুলনায় বেশ কমে যাচ্ছে।
তীব্র গরমে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসকেরা সুতি ও হালকা রঙের পোশাক পরার এবং প্রচুর পরিমাণে নিরাপদ পানি, ডাবের পানি ও স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের এই আবহাওয়ায় বাড়তি সতর্কতায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী দু-তিন দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে রংপুর ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলে মাঝারি ভারী থেকে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এই বৃষ্টিপাত একটানা না হওয়ায় এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায়, বৃষ্টির ঠিক পরপরই মেঘ কেটে গেলে রোদের কারণে গরম আরও বাড়তে পারে।
আপাতত দেশের কোথাও দীর্ঘমেয়াদি বা একটানা ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা কম, যার ফলে মে মাসের বাকি দিনগুলোতে এই ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তি আরও কিছু সময় বজায় থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাসে বলা হয়, লঘুচাপের বর্ধিতাংশটি পশ্চিম বঙ্গ থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চল হয়ে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এতে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়; রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা কিংবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারী ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলাসমূহের উপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। এছাড়া বর্ধিত পাঁচ দিনের দেশের দক্ষিণপূর্বাাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে এবং তাপমাত্রা কমতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।