বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার কারিগর শ্রমিক শ্রেণির সুরক্ষা, মর্যাদা, অধিকার রক্ষা এবং শিল্প খাতের টেকসই বিকাশে সরকার ও মালিকপক্ষের প্রতি সাতটি করে সুপারিশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি(এইচআরএসএস)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মালিক মিয়া হলে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে এইচআরএসএস আয়োজিত আলোচনা সভা থেকে সুপারিশগুলো করে সংগঠনটি। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম সুপারিশগুলো তুলে ধরেন।
শ্রম অধিকার নিশ্চিতে সরকারকে কঠোর ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে সাতটি সুপারিশ করে এইচআরএসএস। সুপারিশেগুলো হলো –শ্রম আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, শ্রম পরিদর্শন জোরদার, ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, শ্রম আদালত সংস্কার, গৃহকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক সুরক্ষা, প্রবাসী শ্রমিক সুরক্ষা এবং নারী শ্রমিকবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা।
শিল্প মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে করা সাতটি সুপারিশে বলা হয়, শ্রমিককে ‘ব্যয়’ নয় বরং ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখতে হবে। এছাড়া এখানো আরো যে সুপারিশগুলো করা হয়—সময়মতো বেতন ও বোনাস প্রদান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, ট্রেড ইউনিয়নের প্রতি সম্মান, নারী শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন বিনিয়োগ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন।
এসময় সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনের সমন্বয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন ইজাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে যেকোনো সমস্যা সমাধানের করতে হবে। এটিই উন্নয়নের একমাত্র টেকসই পথ। শ্রমিকদের ঘাম যেন শোষণের নয় বরং সম্মানের প্রতীক হয়। কারণ, ‘শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প বাঁচলে দেশ এগোবে’।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার প্রকৃত কারিগর শ্রমিক শ্রেণি। তাদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-শ্রমিকের ঘাম যেন শোষণের নয়, সম্মানের প্রতীক হয়।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকরা সকল আন্দোলন-সংগ্রামে পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মহান দায়িত্ব পালন করে। তাদের সবচেয়ে প্রিয় নিজের জীবন বিলিয়ে দেয়। কিন্তু তার ফলশ্রুতিতে তারা যে আশা করেন, যে আকাঙ্ক্ষা তাদের থাকে -কখনোই আমরা সেটা পূরণ হতে দেখিনি। মালিকরা বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নেন, কিন্তু শ্রমিকরা ঢাকা মেডিকেলে এসেও চিকিৎসা নিতে পারেন না।
শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কর্মক্ষেত্রে তার নিরাপত্তা বলে মনে করেন নূর খান। তিনি বলেন, কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে কত দুর্বলতা সেটি আমরা গত দুই দশক খেয়াল করলেই বুঝব। পেছনে তাকালে আমরা দেখব, বিল্ডিং ধ্বসে শত শত শ্রমিক্র মৃত্যু, আগুন লেগে শ্রমিকের মৃত্যু, নানা ধরনের দুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যুর কারণে যে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা সেটা মালিক ও সরকার দুদিক থেকেই অপ্রতুল। বড় ধরনের ক্ষতির পর যে আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়, সেটিরও অধিকাংশ পায় মালিকপক্ষ। নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মঘন্টা ও বেতনের সমতার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শ্রমিকদের বিষয়ে তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে মালিকরা নিজেদের অভাবের কথা ও কষ্টের কথা বলেন। এখন দেশের রাজনীতি একটি বায়বীয় অবস্থায় আছে। এখানে সরকারি দল আছে। নামের একটি বিরোধী দলও আছে। তারা কতটুকু মানুষের কথা বলতে পারবেন কতটুকু মানুষের দাবি-দাওয়া ও অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবেন এবং জনগণের দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলন এগিয়ে নিতে পারবেন -সেটা বোঝা যাবে শীঘ্রই।
সংবিধান সংস্কারে শ্রমিকের কোন স্বার্থ আছে কি-না জানতে চান মান্না। তিনি বলেন, এই যে সংস্কার বা সংশোধন হবে এটার মধ্যে শ্রমিকের স্বার্থ কোথায় কীরকম করে আছে? সে স্বার্থকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কী কী দেখেন -তা জানতে চান।
আলোচনা সভায় আরো অংশ নেন বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশনের সভাপতি শাহ মো. আবু জাফর, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিকজোটের সভাপতি আব্দুল কাদের হাওলাদার, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি চৌধুরী আশিকুল আলম, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক জোট সাধারণ সম্পাদক বাদল খান, বাংলাদেশ লেবার ফেডারেশন সাধারন সম্পাদক শাকিল আখতার চৌধুরী প্রমুখ।