হোম > প্রকৃতি ও পরিবেশ

বাংলাদেশও শক্তিশালী ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে

ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তা

আরিফুর রহমান

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশেও একই ধরনের বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চল উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে শুক্রবারের শক্তিশালী কম্পনে ব্যাপক হতাহতের পর শনিবার সকালে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সতর্কবার্তা দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে কম্পন দুটির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৪। এতে দেশ দুটিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস বলছে, ভূমিকম্প মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে, নির্মাণ করতে হবে দুর্যোগ সহনশীল ভবন। ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো ভবনগুলোর সংস্কার জরুরি। এছাড়া বহুতল ও বাণিজ্যিক ভবনগুলোয় অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয় গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইন ঠিকঠাক আছে কি-না, তা নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি টেলিফোন নম্বর যেমন ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি নম্বরগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি সব ভবন কিংবা স্থাপনায় সংরক্ষণ করতে হবে। এগুলো দৃশ্যমান স্থানে লিখে রাখতে হবে।

জরুরি প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সরঞ্জাম, যেমন টর্চলাইট, রেডিও (অতিরিক্ত ব্যাটারিসহ), বাঁশি, হ্যামার, হেলমেট, শুকনা খাবার, সুপেয় পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও শিশু যত্নের সামগ্রী বাসাবাড়িতে নির্ধারিত স্থানে সংরক্ষণ করতে হবে।

এছাড়া গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইন ঠিকঠাক আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি টেলিফোন নম্বর যেমন ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, পুলিশ, হাসপাতাল ও অন্যান্য জরুরি নম্বরগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ের পাশাপাশি সব ভবন কিংবা স্থাপনায় সংরক্ষণ করতে হবে। এগুলো দৃশ্যমান স্থানে লিখে রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের বলছেন, ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে এমন একটি স্থানে অবস্থিত, যা পৃথিবীর এক অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে- ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মা প্লেট। এই প্লেটগুলোর ক্রমাগত গতির ফলে দেশটি ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।ইন্ডিয়ান প্লেট প্রতি বছর প্রায় ৪৬ মিলিমিটার হারে উত্তরের দিকে সরে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করছে এবং এই অস্থিরতার ফলে হিমালয়ান বেল্টে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তীতে ভূমিকম্প আকারে শক্তি মুক্তির মাধ্যমে ভারসাম্য রক্ষা করে।

সম্প্রতিকালে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, যার মধ্যে কিছু ছিল মাঝারি মাত্রার, আর কিছু ছিল মৃদু। চলতি বছরে ২৪ জানুয়ারির রাতে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে, প্রায় ৪৮৯ কিলোমিটার দূরে। এই ভূমিকম্পে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। এরপর, ৫ মার্চ ২০২৫ সালে, বেলা ১১টা ৩৬ মিনিটে আবারও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায়, তবে এর মাত্রা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।

২০২৪ সালেও বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প হয়েছে। ১৮ অক্টোবর, রাত ১২টা ৪৩ মিনিটে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ৪১ কিলোমিটার দক্ষিণে, মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। ৬ সেপ্টেম্বর, রাত ৮টা ২৮ মিনিটে রংপুর অঞ্চলে মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ভুটানে। একই বছরের ২ জুন, মিয়ানমারে ৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যা বাংলাদেশের রাঙামাটিতেও অনুভূত হয়।

ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রকৃতি আমাদের বার বার সতর্ক করছে। কিন্তু আমরা সাবধান হচ্ছি না। ফলে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা আমাদের ঘিরে রাখছে, আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশ রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। বিল্ডিং কোড মেনে না চলা, বন উজাড়, পাহাড় কেটে ধ্বংস করাসহ নানা উপায়ে আমরা যেন ভূমিকম্প নামক মহাবিপদকে ডেকে আনছি। এক সময় পৃথিবীর সব স্থলভাগ একত্রে ছিল।

পৃথিবীর উপরিভাগের প্লেটগুলো ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেছে। এই প্লেটগুলোকে বলা হয় টেকটোনিক প্লেট। এগুলো একে অপরের সঙ্গে পাশাপাশি লেগে থাকে। কোনো কারণে এগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হলেই তৈরি হয় শক্তি। এই শক্তি সিসমিক তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। যদি তরঙ্গ শক্তিশালী হয়, তাহলে সেটি পৃথিবীর উপরিতলে এসে পৌঁছায়। আর সেখানে পৌঁছানোর পর শক্তি অটুট থাকলে সেটা ভূত্বককে কাঁপিয়ে তোলে। এই কাঁপুনিই ভূমিকম্প। ভূমিকম্পে মিয়ানমারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংকট মোকাবেলায় দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি রাখাই হচ্ছে উত্তম।

কম্পনের মাত্রা ও স্থায়িত্বকাল

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প কতটা ভয়াবহ হবে, তা নির্ভর করে দুটি প্রধান বিষয়ের ওপর—এর মাত্রা ও স্থায়িত্বকাল। ভূমিকম্প মাপার প্রচলিত পদ্ধতি রিখটার স্কেল হলেও এখন আরও নির্ভুলভাবে মাপার জন্য ‘মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল’ (এম ডব্লিউ) ব্যবহৃত হচ্ছে। রিখটার স্কেলকে পুরোনো মনে করা হলেও, যেকোনো স্কেলেই কম্পনের মাত্রা বিশ্লেষণ করা জরুরি। ভূমিকম্পের মাত্রা ভূ-অভ্যন্তরের টেকটোনিক প্লেটগুলো কতটা সরেছে এবং সেই সরানোর পেছনে কী পরিমাণ শক্তি কাজ করেছে। পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠ মূলত বিভিন্ন প্লেট দিয়ে তৈরি, যা নরম স্তরের ওপর ভাসছে। যেখানে এক প্লেট আরেকটির সঙ্গে ধাক্কা খায় বা ফাটল ধরে, সেটাই ফল্ট লাইন নামে পরিচিত। এখান থেকেই ভূমিকম্পের উৎপত্তি।

কম্পনের মাত্রা যদি ২.৫ বা তার কম হয়, সাধারণত মানুষ তা টের পায় না, তবে ভূমিকম্প পরিমাপের যন্ত্রে ধরা পড়ে। পাঁচ মাত্রার বেশি কম্পন হলে তা অনুভূত হয় এবং সামান্য ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে। সাত মাত্রার ওপরে গেলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ে, আর আট মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা থাকে। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী ছিল। সেই কম্পনের পরিণতিতে সুনামি আঘাত হানে এবং ১৪টি দেশে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইন্দোনেশিয়া। ভূমিকম্পের মাত্রা ও স্থায়িত্ব তাই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বদলে দিতে পারে। এ কারণেই ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাস ব্যবস্থার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।

এ বিষয়ে ভূতত্ত্ববিদ ড. কারমেন সোলানা বলেন, ভূমিকম্প যদি অগভীর হয়, তাহলে এর শক্তি ও কম্পন প্রশমিত হওয়ার সুযোগ কম থাকে। ফলে মাটির ওপরে প্রভাব তীব্র হয়, ক্ষয়ক্ষতিও বেশি হয়। ভূমিকম্পের মাত্রা যতই বেশি হোক না কেন, যদি সেটি গভীরে ঘটে, তাহলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। তাই ভূমিকম্প বিশ্লেষণে মাত্রার পাশাপাশি গভীরতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ভবনের অবস্থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে সহনশীল ঘরবাড়ি নির্মাণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। এ জন্য এমন ভবন তৈরি করতে হয়, যা প্রবল কম্পনেও স্থিতিশীল থাকে। জাপান এ ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের জন্য এক উদাহরণ। এর পেছনে মূল বিষয়টি হলো, ভবনকে এমন একটি ভিতের ওপর দাঁড় করানো, যা ভূমিকম্পের কম্পন শোষণ করতে পারে। সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পুরু রাবারের ব্লক ব্যবহার করে এমন ভিত তৈরি করা হয়। তবে এই প্রযুক্তি ব্যয়বহুল, ফলে নির্মাণ খরচ অনেকটাই বেড়ে যায়। যেখানে ভূমিকম্পের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়, সেসব এলাকায় সাধারণত ভবনগুলো দুর্বল উপাদানে তৈরি হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মরোক্কোর ভূমিকম্পে যেসব ঘর ধসে পড়েছিল, তার বেশিরভাগই ছিল সূর্যের তাপে শুকানো ইটের তৈরি, যা ভূমিকম্প সহনশীল নয়।

মাটির ধরনের বিষয় নিয়ে তিনি আরো বলেন, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা শুধু কম্পনের শক্তির ওপর নির্ভর করে না, মাটির ধরনও এতে বড় ভূমিকা রাখে। মাটি কতটা শক্ত বা তার ওপরের স্তরের কী প্রকৃতি, তার ওপর নির্ভর করে ভূমিকম্পের প্রভাব কতটুকু বাড়বে বা কমবে। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) অনুযায়ী, যদি ভূ-পৃষ্ঠ বা এর কাছাকাছি স্তরে কাদামাটি থাকে, তবে সেটি শক্তিশালী কম্পন সহ্য করতে পারে না। কম্পন শুরু হলে, মাটি তরল পদার্থের মতো আচরণ করতে শুরু করে, যার ফলে ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়ে। ১৯৬৪ সালে জাপানে নিগাতয় ভূমিকম্পে ঠিক এমন পরিস্থিতি ঘটেছিল। এটি স্পষ্ট যে, ভূমিকম্পের ক্ষতি এবং প্রভাব শুধুমাত্র কম্পনের মাত্রার ওপর নয়, মাটির ধরনও প্রভাবিত করে ক্ষতির পরিমাণ।

৫ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির আভাস

ঢাকার বাতাস ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’

বায়ুদূষণের শীর্ষে লাহোর, ঢাকা দ্বিতীয়

সাগরে লঘুচাপ, বৃষ্টির আভাস

আজ রাজধানীতে তাপমাত্রা কেমন থাকবে, জানাল আবহাওয়া অফিস

ঢাকা-খুলনা-বরিশালে ঝড়-বৃষ্টির আভাস

আজ ঢাকার আবহাওয়া কেমন থাকবে, জানাল অধিদপ্তর

রমজানের বাকি সময় কেমন থাকবে আবহাওয়া?

বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ সৃষ্টি, তাপমাত্রা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই

রাজধানীতে বাড়তে পারে তাপমাত্রা