হোম > মতামত

ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়ান

মারুফ কামাল খান

বাংলাদেশে বাহাত্তুরে সংবিধান নিয়ে অনেক আবেগী ব্যাখ্যান সেই মুজিবামল থেকে হরহামেশাই শুনে আসছি। সেই কথকতা নিয়ে কিছু বলার আগে বাহাত্তুরে সংবিধান প্রণয়নের সময়কাল সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিতে চাই। সেটা ছিল দুনিয়াজোড়া সোশ্যালিজম বা সমাজতন্ত্রের লোকপ্রিয়তার কাল। সমাজতন্ত্রকে কটাক্ষ করে যদিও ওই কালেই একটি হালকা কথা চালু ছিল। সেটা হলো : ‘Socialism is young men’s fashion.’ এর মানে : ‘সমাজবাদ হচ্ছে তরুণ বয়সের ঠমক।’ তবে যে-যাই বলুন সে-কালে সমাজতন্ত্র শুধু সদ্য যৌবনপ্রাপ্তদেরই নয়, বয়স্ক লোকদেরও নাড়া দিয়েছিল। বুঝে হোক, না-বুঝে হোক, সমাজতন্ত্রের পক্ষ নেওয়াটাই তখন সময়ের ধারা হয়ে উঠেছিল।

সমাজতন্ত্রের পতাকা ও রঙ টকটকে লাল। এই উজ্জ্বল রক্তবর্ণ সহজেই তরুণ হৃদয়ে দোলা দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী বৃদ্ধ বয়সেও হৃদয়ে তারুণ্য বহন করতেন বলেই হয়তো সমাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। সে-কালের সমাজতন্ত্রবিরোধী রাজনীতিবিদরাও সেটা জানতেন। কোনো এক উপলক্ষে একবার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা বৈঠকে বসেছিলেন। তারা একটা যৌথ বিবৃতিতে সই করার সিদ্ধান্ত নেন। ওসমানী সাহেব সই করার জন্য কলম খুঁজছিলেন। অলি আহাদ তার দিকে একটা কলম বাড়িয়ে দিলেন। যৌবনে অলি আহাদ সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শে বিশ্বাসী থাকলেও পরে তার মত পরিবর্তিত হয়েছিল। তার বাড়িয়ে দেওয়া কলম হাতে নিয়ে ওসমানী সাহেব বললেন : ‘Oops, I see it's a red ink pen.’ (ওহো, এটা দেখছি লাল কালির কলম)। অলি আহাদ সাহেব তার ঠোঁটের কোনায় রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বললেন : ‘Yes, this is your favorite color.’ (জি, এটা আপনার প্রিয় রঙ)।’ কালবিলম্ব না করে জেনারেল বললেন : ‘Of course. Because this color is the brightest.’ (অবশ্যই। কারণ এটাই সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ)।’

সমাজতন্ত্রের প্রতি যার এত অনুরাগ, সেই ওসমানী সাহেব সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে শেখ মুজিবুর রহমানের একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তনের ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির যে সভা হয়েছিল, তাতে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে গণতন্ত্র হত্যার শামিল বলে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। দলনেতা শেখ মুজিবকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রের পক্ষে সংগ্রাম করার কারণে বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ভালোবেসে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে ডাকে। কিন্তু আজ যদি আপনি গণতন্ত্র হত্যার এ উদ্যোগ নেন, তাহলে এই দেশবাসী আপনাকে ‘মুজিব খান’ বলে মনে করবে। তারা আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানকে যেমন ক্ষমা করেনি, মুজিব খানকেও তেমনই ক্ষমা করবে না।

এই হুঁশিয়ারিতে কর্ণপাত করার মতো মানসিক অবস্থা তখন শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল না। তিনি বাকশাল কর্মসূচির বিরুদ্ধে আর কাউকে কথা বলতে না-দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যান। এর প্রতিবাদে জেনারেল ওসমানী মন্ত্রিসভা, জাতীয় সংসদ ও আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। মুজিবোত্তর বাংলাদেশে জেনারেল ওসমানী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন : ‘একদলীয় বাকশাল শাসনপদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের যে ক্ষতি করা হয়েছে, ততটা ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার স্টাইন আইজেনহাওয়ারের আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সমাজতন্ত্রের চরম শত্রু জন ফস্টার ডালেসও করতে পারেননি।’ সমাজবাদীরা বলে থাকে, বুর্জোয়াদের একটা অপকৌশল হচ্ছে, লাল পতাকা দিয়ে লাল পতাকা ঠেকানো। মুজিব হয়তো তার রাজনৈতিক জীবনের একটা পর্যায়ে এসে সেই অপকৌশলই গ্রহণ করেছিলেন।

প্রখ্যাত সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ মরহুম খন্দকার আবদুল হামিদ মুজিবামলে জনপ্রিয় দৈনিক ইত্তেফাক-এ মঞ্চে-নেপথ্যে শিরোনামে নিয়মিত কলাম লিখতেন স্পষ্টভাষী ছদ্মনামে। মুজিববাদী সমাজতন্ত্র কায়েমের জজবায় রাষ্ট্রায়ত্ত সব প্রতিষ্ঠানে তখন চলছে হরিলুট। কল-কারখানা লোপাট হচ্ছে। জ্বলছে পাটের গুদামগুলো। চোরাচালান, মজুতদারি, মুনাফাখোরি অবাধে চলমান। দেশে শতাব্দীর ভয়াল দুর্ভিক্ষে কাতারে কাতারে মানুষ মরছে। লঙ্গরখানায় কংকালসার বুভুক্ষু মানুষের সারি। জাতীয় অর্থনীতি ছিবড়ায় পরিণত। দেশ পেয়েছে ‘আন্তর্জাতিক বাস্কেট কেস’র বদনাম। এই পরিস্থিতিতে সোশ্যালিজমকে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপে জর্জরিত করে খন্দকার সাহেব নাম দিয়েছিলেন ‘চোষালিজম’।

সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ‘তরুণ বয়সের ঠমক’-এর মতো আরেকটি কোটেশন আছে। সেটা অবশ্য সমাজতন্ত্রের উচ্চতর ধাপ কমিউনিজম সম্পর্কে। এই বিখ্যাত উক্তিটি এক জগদ্বিখ্যাত মনীষীর। তার বিশদ কোনো পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, নামই যথেষ্ট। তিনি হলেন জর্জ বার্নার্ড শ। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার ‘কোটেবল কোট’টি হচ্ছে : ‘If at age 20 you are not a Communist then you have no heart. If at age 30 you are not a Capitalist then you have no brains.’ (যদি কুড়ি বছর বয়সে তুমি কমিউনিস্ট না হও, তাহলে বুঝতে হবে তোমার কোনো হৃদয় নেই। আর যদি ৩০ বছর বয়সেও তুমি পুঁজিবাদী না হও, তাহলে তুমি মগজশূন্য)। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনে এর উল্টোটাই ঘটেছিল। ২০ বছর বয়সে তিনি মোটেও সমাজতন্ত্রী ছিলেন না, বরং ছিলেন পুঁজিবাদের ঘোর সমর্থক। আর পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে এসে তিনি নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলে জাহির করেন। এই বাস্তবতার আলোকে মুজিবের হৃদয় ও মগজের পরিমাপ করা বার্নার্ড শ-এর থিওরি অনুযায়ী সত্যিই ভারী কঠিন।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে যুক্তরাজ্য ও ভারত হয়ে দেশে ফেরেন। ১৯৭১ সালের মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য যে প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়, মুজিবকে সেই সরকারের অনুপস্থিত রাষ্ট্রপতি বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। তার অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মুজিব ফিরেই তাজউদ্দীনকে হটিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রী হন। মুক্তিযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক সমীকরণে নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ তখন প্রবেশ করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত-ভারত অক্ষশক্তির বলয়ে। এই মেরূকরণকে পাল্টানোর সাধ্য মুজিবের ছিল না। তাই মার্কিনপন্থি মুজিব রাতারাতি ভোল পাল্টে সমাজতন্ত্রী বনে যান। তিনি গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্র কায়েম করবেন বলে ঘোষণা দেন। তিনি এই পদ্ধতির নাম দেন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র। তার অনুসারীরা এটিকে মুজিবের নতুন তাত্ত্বিক দর্শন বলে প্রচার করতে থাকেন। তারা এর নাম দেন ‘মুজিববাদ’।

মুজিববাদের নামে দলের নেতাকর্মীদের বক্তৃতা ও স্লোগান চলতে থাকে। অনুগত বুদ্ধিজীবীরা থান ইটের মতো ভারী কিতাব লিখতে থাকেন। সেই মুজিববাদের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি সংবিধান রচনার নির্দেশ দেন মুজিব। কারা সেই সংবিধান লিখবে? ১৯৭০ সালে অখণ্ড পাকিস্তানে সামরিক শাসনের আওতায় সর্বশেষ নির্বাচনটি হয়েছিল লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এলএফও) নামের সামরিক অধ্যাদেশ অনুযায়ী। কথা ছিল ওই কেন্দ্রে জাতীয় পরিষদ ও প্রতিটি প্রদেশে প্রাদেশিক পরিষদ নামের অ্যাসেম্বলি গঠিত হবে। জাতীয় পরিষদের দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি শাসনতন্ত্র রচনার। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর সেই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্বপাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের যেসব সদস্য বাংলাদেশে ছিলেন, তাদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা গণপরিষদ গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। ইতোমধ্যে যারা মারা গিয়েছিলেন এবং যে সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন, তাদের বাদ দেওয়া হয় এবং মনোনীত কয়েকজন মহিলা সদস্যকে যুক্ত করা হয়। এই গণপরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানের খসড়া রচনার জন্য ৩৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। সেই কমিটি প্রণীত খসড়া গণপরিষদ পাস করে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি নাকচ করে শুধু একদলীয় বা আওয়ামী লীগের সরকার গঠন এবং সেই সরকারের আদেশে গণপরিষদ গঠনের বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন তুলে প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুস সালাম ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লেখেন। এই অপরাধে বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক পদ থেকে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও তার দলও এই গণপরিষদ গঠনকে অবৈধ বলে মত দেয়। সে সময় নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গণপরিষদে পাস হওয়া সংবিধানের প্রতি জনগণের অনুমোদন আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোট আয়োজনের দাবি জানায়। কিন্তু এসব দাবি ও মতামত নাকচ করে দেওয়া হয়।

প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতি দেশের জনগণের কোনো অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এতে জনগণের মনোভাব বা আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে কি না, তাও যাচাই করা হয়নি। এই সংবিধানপ্রণেতারা মুজিববাদের অস্পষ্ট এক রাজনৈতিক তত্ত্বের ঘোরে আচ্ছন্ন ছিলেন। যে তত্ত্ব সম্পর্কে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ এই শব্দবন্ধটুকু ছাড়া বিশদ কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। এই তত্ত্বই ছিল ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের চালিকাশক্তি।

তত্ত্বগত অস্পষ্টতার কারণে শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে মুজিববাদের বাস্তব প্রয়োগ করতে গিয়ে বারবার তাই হোঁচট খেতে হয়েছে আর প্রতি পদক্ষেপে সংবিধান বদলাতে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বদলটা ঘটাতে হয় ১৯৭৪ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। মুজিববাদকে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র’ বলা হলেও প্রয়োগ করতে গিয়ে মুজিববাদীরা গণতন্ত্রকেই সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখতে পায়। আর তাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ছুড়ে ফেলে দিয়ে প্রবর্তন করা হয় একদলীয় ব্যবস্থা বাকশাল। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বাকশাল প্রবর্তন করতে গিয়ে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র সম্পূর্ণ বদলে ফেলা হয়। কিন্তু এর জন্য জনগণের কাছ থেকে কোনো ম্যান্ডেট কিংবা গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদন নেওয়া হয়নি। চতুর্থ সংশোধনীকেও দ্বিতীয় বিপ্লব নাম দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করা হয়, যদিও মুক্তিযুদ্ধের মতো জনগণের কোনো সম্পৃক্ততাই এর সঙ্গে ছিল না।

বাহাত্তুরে সংবিধান নিয়ে ওই সময়কালেই অনেক কেচ্ছা-কাহিনি ও গুজব রটেছিল। তার একটির কথা বলি। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল। তখনকার আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনকে সেই কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। সংবিধানের খসড়া করা হয়েছিল ইংরেজিতে। এর বাংলা তরজমা করার জন্য একটি কমিটি করা হয়েছিল ড. আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে। আনিসুজ্জামান সে সময়কার কাজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন : ‘১৩ জুন কামাল হোসেন ভারত হয়ে ইংল্যান্ডে রওনা হন। উভয় দেশেই সংবিধান-বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আমাদের প্রস্তাবিত সংবিধানের মূল কাঠামো সম্পর্কে তিনি আলোচনা করেন। আলোচনা যে হয়েছে, সেই খবর কাগজে বের হয়, যদিও তার মর্মবস্তু কী, তা প্রকাশিত হয়নি। এতেই দেশে রটে গেল, ভারত সরকারকে দিয়ে সংবিধানের খসড়া অনুমোদন করিয়ে আনতে কামাল হোসেন দিল্লি গেছেন, বিলেত যাওয়াটা আসলে কিছু নয়।’ মোদ্দা কথা, ১৯৭২ সালেই জনমনে এই সন্দেহ বদ্ধমূল হয়েছিল, বাংলাদেশের সংবিধানটি এ দেশের জনগণের নয়, ভারত সরকারের অনুমোদিত। জনগণের এত অনাস্থা ও সন্দেহ এই সংবিধান কখনো বাংলাদেশের সমস্যা ও সংকট নিরসনের নির্দেশনা হিসেবে কাজ করেনি। বরং প্রতিটি সংকটকালে সমাধান খুঁজতে হয়েছে এই সংবিধানের বাইরে গিয়ে এবং পরে সংবিধানকে সেই সমাধানের আলোকে কাটাছেঁড়া করে পুনর্বিন্যস্ত করতে হয়েছে।

সেই বাহাত্তুরে সংবিধানের একটি বিধানের কথা বলি। ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে উপাধি, খেতাব, ভূষণ ও সম্মাননা দিতে পারত না। শুধু সাহসিকতা ও একাডেমিক পুরস্কার ছিল ব্যতিক্রম। অর্থাৎ বীরত্বসূচক খেতাব ও একাডেমিক পুরস্কার ছাড়া কোনো নাগরিকের মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া থেকে রাষ্ট্রকে বিরত রাখা হয়েছিল। কারণ সমাজতন্ত্র। মুজিব ছাড়া নাগরিকরা সবাই সমান। তাদের আবার কৃতিত্বের স্বীকৃতি কীসের? জিয়াউর রহমান এসে সেই বন্ধ্যানীতি উড়িয়ে দিলেন। নাগরিকদের অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিতে, মেধা ও মননশীলতাকে উৎসাহিত করতে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক নামে মর্যাদাসম্পন্ন দুটি রাষ্ট্রীয় পদক প্রবর্তন করলেন। সেই পদক নিয়ে আওয়ামী-বাকশালীরা কম খেয়োখেয়ি করেনি। এ ক্ষেত্রে তাদের সবচেয়ে বড় দুষ্কর্মটির কথা আজ সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জননির্বাচিত সরকার ২০০৩ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্ষেত্রে দুজন ব্যক্তির নাম মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার বিজয়ী বলে ঘোষণা করে। তাদের একজনের নাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরেকজনের নাম জিয়াউর রহমান। উভয়ের নামে নিবেদিত মেডেল আর সম্মাননাপত্র জাতীয় জাদুঘরে রেখে প্রদর্শনীর সিদ্ধান্ত হয়। আর সবকিছু বাদ দিলেও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক ঔদার্যের দিকটা এ ঘটনায় দারুণভাবে প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক ইতিহাসের রহমান-যুগলকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার এই ঘোষণায় মুজিবকন্যা হাসিনার প্রতিক্রিয়া ছিল বিষজর্জর। এর মাধ্যমে নাকি মুজিবের মহিমাকে ক্ষুণ্ণ করে তাকে জিয়ার পাশে এনে দাঁড় করানোর দুরভিসন্ধি প্রকাশিত হয়েছে বলে হাসিনা বয়ান দেন। আরো পরে তার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা এলে হাসিনা কী করেছেন মনে আছে? ২০১৬ সালে জাতীয় পুরস্কার-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা পুরস্কার প্রত্যাহারের পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘর থেকে ওই পুরস্কারের মেডেল ও সম্মাননাপত্র সরিয়ে ফেলা হয়। মন্ত্রিসভা কমিটি মনে করে, এই পুরস্কার যদি জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্মের কাছে ভুল ইতিহাস উপস্থাপিত হবে এবং একটি ভুল বার্তা যাবে।

এ দেশে অবশেষে দানবের বিরুদ্ধে মানবের সংগ্রাম জয়ী হয়েছে। ছাত্র-জনতার চব্বিশের উত্তাল বিপ্লবী অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট রেজিম ধসে পড়েছে। হাসিনা পালিয়ে গেছেন। এই হাসিনা তার বাবাকে খালেদা জিয়া সরকারের দেওয়া স্বাধীনতা পুরস্কার বহাল রেখে তার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের নামে দরিদ্র মানুষের দেশের কোটি কোটি টাকা খোলামকুচির মতো উড়িয়েছেন। সারাদেশে তার ম্যুরাল অঙ্কন ও মর্মর মূর্তি গড়েছেন হাজারে হাজার। পারিবারিক বাসভবনকে করেছিলেন স্মৃতি জাদুঘর। মুজিবের ব্যক্তিপূজার আয়োজন চলেছে দেশজুড়ে দিনরাত। কিন্তু কোথায় আজ মুজিবের সেই মহিমা এবং জবরদস্তি করে আরোপিত সম্মান? জেগে ওঠা নির্যাতিত মানুষের আঘাতে ধূলিসাৎ হচ্ছে আজ তার সব স্মৃতির স্মারক। আর সারাদিন যে জিয়াকে তুচ্ছ ও অসম্মান করতে হাসিনাগং অহর্নিশি কুৎসা রটাতেন, তার স্মৃতি আজ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। হিংসার রাজত্ব ভেঙে পড়েছে। এখনো জিয়ার স্বাধীনতা পুরস্কার উপযুক্ত মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতায় পুনঃস্থাপিত হয়নি। জনগণের সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে বলি, দেরি না করে কাজটা করে ফেলুন। ইতিহাসের রেকর্ড ঠিক করুন। ইতিহাসের সঠিক পক্ষে দাঁড়ান।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক

ই-মেইল : mrfshl@gmail.com

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত