ভারতের বাংলাদেশবিরোধী অপতৎপরতা, নেতিবাচক প্রচার-প্রোপাগান্ডা এবং মাঝেমধ্যেই সামরিক হুমকি-ধমকি, বিশ্বসভায় বাংলাদেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার আগ্রাসী প্রবণতা এবং বাংলাদেশবিরোধী একটি রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার কর্মীকে অবৈধভাবে ভারতে আশ্রয় এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া- এসব ব্যাপক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার সামর্থ্য কোনো একক রাজনৈতিক দলের নেই।
কোনো একক রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলেই তারা সর্বগ্রাসী এই সুনামি রুখে দিতে পারবে না। হয় তারা এই সুনামিতে ডুবে মরবে, মানে ভারতের হাতের পুতুল হয়ে আগের সরকারের মতো আত্মঘাতী চুক্তি সই করবে, বাংলাদেশকে ভারতের একচেটিয়া বাজারে পরিণত করবে অথবা কঠোর হতে গিয়ে ব্যর্থ সরকারে পর্যবসিত হবে। এ রকম একটি বৃহৎ শক্তিকে মোকাবিলা করার জন্য দরকার সুদৃঢ় দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিশ্ববরেণ্য কোনো ব্যক্তির নেতৃত্ব।
আজ বাংলাদেশের নির্বাহী প্রধানের দায়িত্বে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি না থেকে অন্য যে কেউ থাকলে বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানুষ একটি উগ্র মৌলবাদী দেশের তালিকায় ফেলে দিত। এই লক্ষ্যে ভারতের মদতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ব্যাপক প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে কিন্তু ড. ইউনূসের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা এবং সততার কাছে সব খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে। বিশ্বনেতারা ড. ইউনূসের কথাকে কখনোই অবিশ্বাস করে না। তিনি যা বলেন, তাই তারা গ্রহণ করেন। এটি আমাদের বড় সৌভাগ্য।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী শেখ হাসিনার আমলের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের ঘটনা অনেক কম। হাসিনার শাসনামলে ৭ হাজার শিশুসহ ৪৩ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। কিন্তু বৈরী মিডিয়াগুলো আজকের ঘটনা এমনভাবে প্রচার করছে, যেন এ সরকারের আমলেই শুধু এসব ঘটনা ঘটছে, এর আগে শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের কোনো ঘটনাই বাংলাদেশে ঘটেনি।
এ রকম ঘটনা যেন একটিও না ঘটে, আমরা সবাই তা চাই। আমাদের সেই শুভপ্রত্যাশা পূরণ হবে দেশের নাগরিকরা সচেতন হলে এবং আইনের প্রয়োগ হলে। শেখ হাসিনার আমলে তার দলের ক্যাডার জসীম উদদীন মানিক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ জন ছাত্রীকে ধর্ষণ করে কেক কেটে তার সাফল্য উদযাপন করেছে কিন্তু সরকার তাকে গ্রেপ্তার করেনি, তার কোনো বিচারও হয়নি। বিচার না হওয়ার এমনি অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে হাসিনার শাসনামলে।
১৮ কোটি মানুষের দেশে, জনগণ পুরোপুরি সচেতন না হলে, নৈতিকতার চর্চায় আত্মনিয়োগ না করলে, অপরাধ নির্মূল করা যাবে না। কিছু অপরাধ ঘটবেই। পৃথিবীর সব উন্নত দেশেই ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং খুনের ঘটনা ঘটে। এখন কথা হচ্ছে, ঘটনা ঘটার পর কী হয়? তারা কি এসব ঘটনা ঘটিয়ে নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যায়? সরকার, প্রশাসন কি ঘুস, উৎকোচ গ্রহণ করে অপরাধীকে ছেড়ে দেয়? এই জায়গাটিই আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে।
আছিয়াকে যারা ধর্ষণ করেছে, হত্যা করেছে, তারা কি দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়নি? শুধু গ্রেপ্তারই হয়নি, দ্রুত বিচার কার্যও শুরু হয়েছে। সারাদেশ ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। জাতির বিবেক জেগে উঠেছে। এই জায়গাটায় আমাদের অকৃপণভাবে প্রশংসা করতে হবে, যাতে জাতির বিবেক সব অন্যায় ও অনৈতিক কাজের বিরুদ্ধে এভাবে সজাগ থাকে।
এবার রমজানে, সম্ভবত গত ৫৪ বছরের বাংলাদেশে এই প্রথম, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য কমেছে, মানুষ স্বস্তিতে আছে। এখানেও আওয়ামী লীগের কর্মীরা সরকারের সততা ও আন্তরিকতার প্রশংসা না করে সমালোচনা করছে, বলছে, এত দাম কমে গেলে কৃষক মারা যাবে। কেউ বলছেন, এ বছর মার্চে রোজা হওয়ায় শীতের সবজি এখনো বাজারে আছে, উৎপাদনের মৌসুমে রোজা হয়েছে বলেই কৃষিপণ্যের দাম কম। কিন্তু মার্চ মাসে তো রোজা আরো হয়েছে, প্রতি ৩৫/৩৬ বছরে একবার রোজা পুরো বছর ঘুরে আবার আগের জায়গায় আসে। কই আর কখনো তো রোজায় জিনিসপত্রের দাম কমেনি।
বাংলাদেশের মানুষ তো কমে যায়নি। দ্রব্যের চাহিদাও কমেনি। মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে, তাও তো শুনিনি। তাহলে কেন দাম কমল? এর কারণ দুটি। প্রথমত, কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াত যেসব মধ্যস্বত্বভোগী অসাধু ব্যবসায়ী-সিন্ডিকেট, সেটা ভেঙে পড়েছে। সরকারের সততা এবং সদিচ্ছার কারণেই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয় কারণটি খুব ইন্টারেস্টিং, এটা কেউ ভেবে দেখেনি। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতায় থাকে, বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনামলে, দুর্নীতি ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে, মানুষের হাতে ছিল মাত্রাতিরিক্ত অবৈধ অর্থ। এই অবৈধ অর্থের একটা আগ্রাসী ক্রয়ক্ষমতা প্রতিফলিত হতো বাজারে।
বাজারের সবচেয়ে বড় মাছটার দাম ধরেন ৩ হাজার টাকা। কিন্তু দশজন ক্রেতা বিপুল অবৈধ অর্থের মালিক, দশজনই বড় মাছটা কিনতে চায়, তারা এভাবেই মর্যাদা ক্রয় করে, তখন বিক্রেতা সুযোগ বুঝে দামটা বাড়িয়ে ৬-৭ হাজারে তুলে দেন, এটা কিন্তু প্রকৃত চাহিদা নয়, কৃত্রিম চাহিদা। এই কৃত্রিম চাহিদা প্রায়ই বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, অস্থির করে তোলে।
দুর্নীতি কমে আসায় এই কৃত্রিম চাহিদাটা এখন বাজারে অনুপস্থিত, ফলে নিত্যপণ্যের দ্রব্যমূল্য শুধু নয়, এখন দেশে অ্যাপার্টমেন্টসহ নানা স্থাবর ও বিলাসী পণ্যেরও দাম কমে গেছে। কৃষিপণ্যের দাম কমে গেছে, কৃষক মরে যাচ্ছে, এই হা-হুতাশ যারা করেন, তাদের জন্য বলি, আগেও আমরা দেখেছি, কৃষক মাথায় করে বাজারে এক টুকরি টমেটো এনেছেন, বিক্রি করতে না পেরে বাজারেই ঢেলে ফেলে দিয়ে গেছেন, কারণ দাম এত কম বোঝা বয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিতেও চাননি তারা। তখনো কিন্তু শহরের বাজারগুলোয় টমেটোর দাম কমেনি। কারণ মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের দাপট ছিল তীব্র।
হাসিনার নির্দেশে হাজার হাজার মানুষ খুন করে পুলিশ বিভাগের নৈতিক ভিত্তিটা ভেঙে গেছে। উচ্চপর্যায়ে বাহারুল আলমের মতো কিছু সৎ পুলিশ অফিসার নিয়োগ দিয়ে সেই নৈতিক জায়গাটা সংস্কারের চেষ্টা করে যাচ্ছে ইউনূস সরকার, অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে আর দু-তিন মাসের মধ্যে পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।
আওয়ামী লীগ দাবি করে, তাদের ও তাদের অঙ্গসংগঠনের কর্মী-সংখ্যা কোটির ওপরে। হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরাসহ প্রায় ৪৫ হাজার দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাদের অধিকাংশই ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। দেশের প্রধান গণমাধ্যমে এসেছে তাদের কেউ কেউ নাম বদল করে হিন্দু নাম নিয়ে ভারতের কাগজপত্র করে নিচ্ছে। এই ৪৫ হাজারের সঙ্গে আরো অনেকেই অদূর ভবিষ্যতে যুক্ত হবে। তাদের ভারত প্রশিক্ষণ দিয়ে এমনভাবে তৈরি করবে, যাতে তারা আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসাতে পারে।
দেশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগের কর্মীরা ক্রমাগত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করবে। অতীতের মতো কখনো বাসে পেট্রলবোমা ছুড়বে, কখনো লগি-বইঠার তাণ্ডব চালাবে, শাহবাগি গ্রুপ, ব্লগার গ্রুপ তৈরি করবে, কখনো ভবনে আগুন দেবেÑ এসব নাশকতামূলক কাজ তারা করতেই থাকবে। এই দ্বিমুখী অরাজকতা এবং দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড মোকাবিলা করা কোনো একক রাজনৈতিক দলের সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।
ঠিক এ রকম একটা সময়ে আমাদের দুটি কাজ করতে হবে। সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক শক্তির একটি ঐক্য গড়ে তুলতে হবে, পাশাপাশি চীন এবং অন্যান্য বৃহৎ শক্তির সঙ্গে কৌশলগত কূটনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করতে হবে।
বৃহৎ ঐক্য টেকসই হবে তখনই, যখন ঐক্যবদ্ধ শক্তির সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠিত হবে। এই মুহূর্তে যদি নির্বাচন হয় এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যদি একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তাহলে ঐক্য ধরে রাখা যাবে না। এমনকি কোনো জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করার পরও এই ঐক্য টিকবে না। টেকসই ঐক্য গড়তে হবে একটি জাতীয় সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে।
আমার প্রস্তাব হলো, সব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এক হয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করা হোক। সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি থাকবেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপি থেকে প্রধানমন্ত্রীসহ ১৫ জন, জামায়াতে ইসলামী থেকে ১০, এনসিপি থেকে ১০, অন্যান্য দল থেকে ১৫ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং উপমন্ত্রী থাকবেন।
এই ৫০ জনের ক্যাবিনেট আগামী পাঁচ বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করবে। মন্ত্রিপরিষদের ওপরে একটি সুপ্রিম কাউন্সিল থাকবে। প্রত্যেক জেলা থেকে দুজন প্রতিনিধি, সব রাজনৈতিক দল থেকে মন্ত্রিপরিষদের আনুপাতিক হারে প্রতিনিধি, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশপ্রধানকে নিয়ে গঠিত হবে সুপ্রিম কাউন্সিল। এই কাউন্সিল জাতীয় সরকারের পার্লামেন্টের ভূমিকা পালন করবে। তবে শুধু রুটিনকাজের বাইরে রাষ্ট্রীয় বড় ইস্যুগুলোয় সুপ্রিম কাউন্সিল মিটিংয়ে বসবে এবং সিদ্ধান্ত নেবে।
এই পাঁচ বছরের মধ্যে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড ঘটানোসহ তিনটি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা এবং খুন, গুম, দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ সব অপরাধের বিচার করাও সম্ভব হবে। এরপর একটি দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে বাংলাদেশে আবার পার্টি পলিটিকস শুরু করা যাবে।
এই পাঁচ বছরে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করে একটি নৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো যাবে, বিদেশনীতিও একটি সুস্পষ্ট ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে। ড. ইউনূসের গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে এক অনন্য উচ্চতায় উঠে যাবে।
লেখক : হলিসউড, নিউ ইয়র্ক