বিশ্ব আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির মহাসড়কে, যেখানে সাইবার নিরাপত্তা এখন এক অনিবার্য বাস্তবতা। বাংলাদেশও বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশ থেকে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের এই যাত্রা প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রযাত্রা যেমন দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে আমূল পরিবর্তন আনছে, তেমনি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জগুলোও ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
এখন অস্ত্র বন্দুক নয়, কোডে রূপান্তরিত হয়েছে। শত্রু শুধুই সীমান্ত পেরিয়ে আসে না, তারা স্ক্রিনের ওপার থেকে নীরবে ঢুকে পড়ে সার্ভারে, অর্থনীতির শিরদাঁড়ায়, আর রাষ্ট্রের গোপন ডাটাবেসে। এটি সেই নতুন যুদ্ধ, যেখানে বিস্ফোরণের শব্দ নেই, কিন্তু ধ্বংস সর্বগ্রাসী। এক ক্লিকে উড়ে যায় কোটি কোটি টাকা, নীরবেই বিপর্যস্ত হয় জাতীয় গ্রিড আর গোপনে ফাঁস হয় সামরিক ও কূটনৈতিক নথি। সাইবার হামলা মানে শুধু একটি ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া নয়, এটি একটি রাষ্ট্রকে নিঃশব্দে অচল করে দেওয়ার সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র।
স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন যদি সাইবার নিরাপত্তার বর্মে সুরক্ষিত না হয়, তবে সেই প্রযুক্তির অগ্রগতি আত্মঘাতী হয়ে উঠবে। সাইবার খাত শক্তিশালী না হলে, প্রযুক্তির মহাসড়কে বাংলাদেশ এগোবে না, বরং থমকে যাবে। সাইবার নিরাপত্তাহীনতা মানেই ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের বিপর্যয়। তাই আত্মতুষ্টি লাভের পরিবর্তে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, যে দেশ সাইবার নিরাপত্তায় দুর্বল, সে দেশ প্রযুক্তির বিশ্বযুদ্ধে টিকে থাকতে পারবে না।
সাইবার নিরাপত্তা বলতে সেই প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যার মাধ্যমে ডিজিটাল তথ্য ও নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখা হয়। এটি একপ্রকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা সাইবার আক্রমণ, তথ্য চুরি, ম্যালোয়ার, ফিশিং এবং হ্যাকিংয়ের মতো হুমকি থেকে আমাদের রক্ষা করে। বিশ্ব আজ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে, যা সূচিত হবে তথ্যপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রযাত্রার ধারায়। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হলেও সাইবার হামলা, তথ্য চুরি, ডিজিটাল অপরাধ এবং নিরাপত্তাহীনতা সেই অগ্রযাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে মানুষের জীবনযাত্রা যেমন সহজতর হয়েছে, তেমনই সাইবার নিরাপত্তার হুমকিও বাড়ছে বহুগুণে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।
সরকারি সেবা থেকে শুরু করে আর্থিক লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা প্রায় সবখানেই তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাব স্পষ্ট। ফলে সাইবার হামলার শিকার হলে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এজন্য বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তার যে দুর্বলতা রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠে সাইবার খাতকে শক্তিশালী করতে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দেশে ইতোমধ্যে বিদ্যমান আইনগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে প্রচলিত সাইবার আইনের ভুলত্রুটি খুঁজে বের করে সংস্কারের মাধ্যমে আরো শক্তিশালী সাইবার নীতি ও আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে।
ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে আরো উন্নত করা এবং তথ্য সুরক্ষায় ‘ডাটা প্রটেকশন অ্যাক্ট’ প্রণয়ন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ‘সাইবার সিকিউরিটি’ কোর্স বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় যৌথভাবে সাইবার ড্রিল আয়োজন করতে হবে। হতাশার বিষয় হচ্ছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক এবং সফটওয়্যার সুরক্ষায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা কম দেখা যায়। কিন্তু দেশকে সাইবার নিরাপত্তার হুমকি থেকে রক্ষা করতে উন্নত প্রযুক্তি ও কৌশলগত আধুনিকায়ন প্রয়োজন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও মেশিন লার্নিং (ML)-ভিত্তিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফরম’ তৈরি করা যেতে পারে।
কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নেই। গ্লোবাল সাইবার সিকিউরিটি ইনডেক্স অনুসারে, বাংলাদেশ দক্ষ জনবলের ঘাটতিতে পিছিয়ে আছে। সাইবার নিরাপত্তা খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করে দেশীয় ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সাইবার খাত উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হবে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে স্বতন্ত্র সরকারি সংস্থা গঠন করতে হবে। কেননা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্যবিনিময়ে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে সাইবার আক্রমণ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এ জন্য নির্দিষ্ট একটি সংস্থার মাধ্যমে সমন্বয় এবং এই সংস্থার অধীনে সাইবার আর্মি কিংবা সাইবার পুলিশ টিম গঠন করতে হবে। এতে সাইবার নিরাপত্তা খাতকে আরো জোরদার করা সম্ভব।
সাইবার নিরাপত্তার ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের এখনো পাসওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, ফিশিং এবং র্যানসমওয়্যার সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই। ফলে অজ্ঞতাবশত ক্ষতিকর বিভিন্ন লিংকে ক্লিক করে সর্বনাশ ডেকে আনেন। তাই সর্বস্তরের মানুষের জন্য সাইবার নিরাপত্তার হুমকি এবং করণীয় সম্পর্কে কর্মশালা কিংবা সেমিনারের আয়োজন করা জরুরি। পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকে সাইবার নিরাপত্তাকে পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণ করতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি অস্ত্র। কোডের পেছনে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের রুখতে না পারলে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণ হবে না। কারণ উন্নয়ন শুধু প্রযুক্তি দিয়ে হয় না, এ জন্য প্রয়োজন নিরাপদ প্রযুক্তির। তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, শক্তিশালী সাইবার আইনপ্রণয়ন এবং জনগণের মধ্যে প্রযুক্তির সচেতনতা বৃদ্ধি করে বাংলাদেশকে একটি সাইবার সচেতন এবং নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব।
এ জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি ডিজিটাল অবকাঠামোকে রক্ষা করতে হবে দুর্ভেদ্য সাইবার বর্ম দিয়ে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং সর্বস্তরের মানুষ সমন্বিতভাবে সাইবার প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তির স্রোতে শুধু গা ভাসালেই হবে না, আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এই সাইবার যুদ্ধ জিততেই হবে। তবেই বিশ্বের সামনে বাংলাদেশ সাইবার ক্ষেত্রে নিরাপদ, অগ্রসর এবং উন্নত দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ