আওয়ামী সরকারের সময় পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মসূচি পালন করা ছিল মহা-অপরাধ। এমনকি অনুমতি নেওয়া কর্মসূচিতেও যখন-তখন হানা দিত পুলিশ। বিশেষ ধর্মীয় দল ও ব্যক্তিদের ওপর পুলিশি নিপীড়নের ঘটনা লেগেই থাকত। এমনই এক বর্বরতার শিকার হন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আব্দুল কাইয়ুম। দলীয় একটি কর্মসূচি থেকে তার ওপর হামলা চালিয়ে পুলিশ শুধু তাকে গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এ সময় তার দাড়ি ধরে টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়। বিনা অপরাধে মামলা দিয়ে তাকে কারারুদ্ধ করে রাখা হয় দেড় মাস। এতে একদিকে কষ্ট, অন্যদিকে পারিবারিক ও আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন তিনি। এভাবে বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে নানাভাবে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন তরুণ এই আলেম।
পতিত আওয়ামী সরকারের সময়ে পুলিশি নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে আহমদ আব্দুল কাইয়ুম আমার দেশকে বলেন, ‘২০১৩ সালের ২৫ মে মুরাদনগর থানা ইসলামী আন্দোলনের কর্মী সম্মেলন ছিল। আমরা পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করি। সম্মেলন শেষে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি শেষ করে মোনাজাত করা হচ্ছিল। এ সময় পুলিশের লোকজন এসে, এক হাতে সিগারেট ও আরেক হাতে টান দিয়ে মাইক কেড়ে নেয়। এতে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে একটু উত্তেজনা দেখা দেয়। প্রথমে পুলিশ দু-তিনজন ছিল। তাদের সঙ্গে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে সবাই যার যার মতো চলে যাওয়া শুরু করেন। এর পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মাথায় পাশের থানা থেকে অনেক পুলিশ আসে। আমি চলে যাওয়ার সময় পেছন দিক থেকে ব্যাপক মারধর শুরু করা হয়। এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আমাকে ঘিরে ধরেন। তারা আমার দাড়ি টেনে টেনে ছিঁড়ে ফেলেন।’
তিনি বলেন, ‘ওই হামলায় জেলা সভাপতি বেলালের ওপর প্রথমেই আক্রমণ হয় বেশি। তাকে রক্তাক্ত করা হয়। আমি নিজেও আঘাতপ্রাপ্ত হই। পরে রাতে আমাদের ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেখানে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা দিয়ে এক হাজার ব্যক্তিকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। পরের দিন সবাইকে আদালতে পাঠানো হয়। এ সময় আমাদের হ্যান্ডকাফ পরাতে চেয়েছিল পুলিশ। আমরা বলেছিলাম, অনুমতি নেওয়া কর্মসূচি থেকে আমাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আমরা তো কোনো দাগি আসামি না। পরে একপর্যায়ে আমাদের কোমরে দড়ি বেঁধে সবাইকে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতের মাধ্যমে পাঠানো হয় কারাগারে। এ সময় রিমান্ড চাওয়া হলেও তা নামঞ্জুর হয়।’
এদিকে এই মামলায় যারা গ্রেপ্তারের বাইরে ছিলেন, তাদের অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি আওয়ামী লীগের দলীয় লোকরাও এ সময় চাঁদাবাজি করেছেন। এটা নিয়ে তারা কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন। ওই মামলায় তিনি প্রায় দেড় মাস কারাবন্দি ছিলেন। বিনা অপরাধে কুমিল্লা কারাগারে নানা কষ্টে দিন কাটান তিনি।
গ্রেপ্তারের সময়কার সেই চিত্র মনে করে আহমদ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘মুসলমানদের একটি দেশে পুলিশ যেভাবে দাড়ি ধরে টেনে আমাকে গ্রেপ্তার করেÑ তা চিন্তা করলে অবাক হয়ে যাই। আমাকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে পেটানো হয়েছে, শরীর ফুলে গিয়েছিল। থানায় ঢোকানোর আগ পর্যন্ত এভাবে পেটানো হয়। তবে এসব ব্যথার চেয়ে দাড়ি ধরে টানার কষ্টটাই বেশি পেয়েছি। মুসলমানের দেশে মুসলমান পুলিশের এমন আচরণ এখনও আমাকে কষ্ট দেয়।’
দেড় মাস জেলজীবনের কষ্টের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন এই আলেম। অর্থাভাবে ঢাকার বাসা ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল তার পরিবার। মুক্তির পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। তবে মামলা চালাতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায় তার। পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বেশ সময় লাগে।
এদিকে কদমতলী থানা এলাকা একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আহমদ আব্দুল কাইয়ুম। দেড় মাস জেলে থাকায় মাদরাসাটির ছাত্র-অভিভাবকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। একপর্যায়ে দুই বছরের মাথায় মাদরাসাটি বন্ধ হয়ে যায়। এতেও অনেক টাকার ক্ষতি হয় তার।
আহমদ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘জেলে থাকাবস্থায় প্রতি সপ্তাহে মামলা আদালতে উঠত। আর কোর্ট হাজতের অবস্থা এত ভয়ানক ছিল, দাঁড়ানোর কোনো ঠাঁই নেই। কোনো রকমে দাঁড়াতে পারলেও নড়াচড়ার উপায় ছিল না। একদিকে সিগারেটের দুর্গন্ধ ও ভয়াবহ গরম, অন্যদিকে জায়গার সংকট। ফলে সেই হাজতে আমিসহ অনেকেই অজ্ঞান হয়ে যেতাম।’ তিনি বলেন, ‘দলীয় কার্যক্রমে আমরা প্রায়ই রাজধানীর পুরানা পল্টনের প্রধান কার্যালয়ে জড়ো হই। সেখানে পুলিশ হানা দিত। ২০১১ সালে ১ মে মাসে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশের ক্র্যাকডাউনের ঘটনা ঘটে।
আব্দুল কাইয়ুম জানান, আওয়ামী সরকারের ইসলামবিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে ওইদিন মুক্তাঙ্গনে একটি সমাবেশ করে ইসলামী আন্দোলন। সেখানে ব্যাপক নেতাকর্মী জড়ো হন। একপর্যায়ে ওই কর্মসূচি থেকে লাগাতার অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়। মাগরিবের নামাজের পর জিকির করতে থাকেন নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে পূর্বঘোষিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের শঙ্কায় দলটির নেতাকর্মীদের ওপর ক্র্যাকডাউন চালায় পুলিশ। সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ছুড়ে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সেখানে আওয়ামী যুবলীগের লোকরাও জিরো পয়েন্টের দিক থেকে এসে হামলা চালান। এতে ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ মাদানীসহ বহুসংখ্যক নেতাকর্মী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ আহত হন। গ্রেপ্তার করা হয় কয়েক শ মানুষকে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা মেরে দেয় পুলিশ। আহত লোকজনকে আশ্রয় দেওয়ার মতো অবস্থাও সেখানে ছিল না।
আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আওয়ামী সরকারের সময় বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায়ই পুলিশি হামলার শিকার হয়েছি। একবার হাউসবিল্ডিং এলাকায় একটি সমাবেশে গুলি চালায় পুলিশ। আমাদের নেতা মরহুম এ টি এম হেমায়েত উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন, আমিও আহত হই। এভাবে ধর্মীয় ও দেশের জাতীয় ইস্যুতে কথা বললেই বাধা দিত পুলিশ। বিশেষ করে টুপি-দাড়িধারীরা সব সময় ভয়ভীতির মধ্যে থাকতেন। যখন-তখন মোবাইল চেক করে সরকারবিরোধী কিছু পেলেই গ্রেপ্তার করত পুলিশ। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সময়ে মানুষ অজানা আতঙ্ক আর ভয়ের মধ্যে কাটিয়েছেন। এই আলেম বলেন, পল্টনে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে স্বস্তিতে থাকতে পারতেন না। সব সময় গোয়েন্দার লোকজন আসা-যাওয়া করতেন। একজন আসেন, আরেকজন যান। এভাবে প্রায় সময় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সেখানে ঘোরাঘুরি করতেন। তাদের নজরদারিতে থাকতেন তিনি। বেশ কয়েকবার তাকে ভারতীয় দূতাবাস থেকে হুমকি দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের দিকে প্রথমে তাকে দূতাবাসে সাক্ষাতের জন্য বলা হয়। টেলিফোনে হিন্দি ভাষায় কথা বলেন একজন। বলা হয়, আপনি ভারতবিরোধী কঠোর বক্তব্য লেখেন কেন ইত্যাদি। আরেকটু নমনীয় ভাষায় বক্তব্য-বিবৃতি লেখার জন্য অনুরোধ করা হয়। পরে তাদের ফোন আর রিসিভ করেননি। এ ছাড়া দেশীয় বিভিন্ন গোয়েন্দা এসে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। দলের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকায় তার অফিসে এ ধরনের তৎপরতা বেশি ছিল বলে উল্লেখ করেন।
আহমদ আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের যেমন পতন হয়েছে, তেমনি ভারতীয় রাহুগ্রাস থেকে দেশ মুক্তি পেয়েছে। কারণ বিগত সময়ে দেশে ধর্মীয় কোনো স্বাধীনতা ছিল না। মসজিদ-মাদরাসাগুলো নিরাপদ ছিল না। মসজিদের খুতবায় কী বলা হবেÑ তাও স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সরকারের পক্ষ থেকে নির্ধারণ করে দিত। সরকারবিরোধী কোনো কথা বা ইঙ্গিত দিলেও সঙ্গে সঙ্গে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। অনেকের চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ রকমভাবে আলেম-ওলামাদের ওপর খড়গহস্তের ঘটনা ছিল নিত্যদিনের।’
কুমিল্লার মুরাদনগরের কোড়েরপাড়ে জন্ম নেওয়া আহমদ আব্দুল কাইয়ুমের লেখাপড়া শুরু হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে কওমি, আলিয়া ও সাধারণ ধারায় শিক্ষা অর্জন করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। বর্তমানে তিনি ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যবসা করছেন।
ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের দলের ও ভারতের বিরুদ্ধে কথাবার্তাকে সমানভাবে দেখত। কেউ এর বিরুদ্ধে কথা বললেই তারা প্রতিবাদ করত। আওয়ামী লীগের কারণে ঠিকমতো ধর্মীয় কর্মকাণ্ড চালানোর কোনো সুযোগ এত দিন ছিল না। ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়েছে। তারা স্বাধীনভাবে চলতে পারছে।
সম্পাদনা: ইসমাঈল