হোম > মতামত

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত

ইমরান হুসাইন

বিশ্ববিদ্যালয় হলো জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের কেন্দ্রবিন্দু। এটি শুধু উচ্চশিক্ষা দেওয়ার স্থান নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া হওয়া উচিত অত্যন্ত স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। কিন্তু বাস্তবতা কি আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে? বর্তমান নিয়োগ ব্যবস্থা কতটা গ্রহণযোগ্য এবং তাতে কী কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তি পরিচয়, রাজনৈতিক সংযোগ কিংবা প্রশাসনিক পক্ষপাত বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে অনেক মেধাবী প্রার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হন, যা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নিয়োগ কমিটিতে স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের প্রবণতা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই অনৈতিক সংস্কৃতি যদি চলতে থাকে, তাহলে একসময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানের উৎকর্ষ হারিয়ে ফেলবে এবং শিক্ষার মানও ক্রমেই নিচের দিকে নামতে থাকবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা আরেকটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর বছর পার হয়ে গেলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হয় না। এতে শুধু যোগ্য প্রার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মেধাবী তরুণরা বিদেশে ভালো সুযোগের সন্ধানে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন, যা দেশের জন্য একপ্রকার মেধাপ্রবাহ হারানোর শামিল।

এ অবস্থার পরিবর্তনে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক অর্জন, গবেষণা, প্রকাশনা এবং শিক্ষাদানের দক্ষতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ বোর্ডকে নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র রাখতে হবে, যেখানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখা হবে। এটি নিশ্চিত করতে হলে নিয়োগ কমিটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। তা ছাড়া, প্রার্থীদের জন্য একটি স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি থাকতে হবে, যেখানে তাদের গবেষণার মান, পাঠদানের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থী মূল্যায়নের ভিত্তিতে যথাযথ স্কোরিং করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শুধু পাঠদানের জন্য নিয়োগ দিলে হবে না, বরং গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য তাদের সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। তাই নিয়োগের সময় প্রার্থীদের গবেষণা প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ, সাইটেশন সংখ্যা এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পে অংশগ্রহণের বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা উচিত। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বাংলাদেশেও শিক্ষকদের জন্য গবেষণা অনুদান ও গবেষণামূলক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, যাতে তারা একাডেমিক উৎকর্ষের দিকে আরো মনোযোগ দিতে পারেন।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গবেষণা কার্যক্রম এবং গবেষণা প্রকল্পে সম্পৃক্ততার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পাঠদানের দক্ষতা নয়, বরং শিক্ষক কতটা গবেষণামুখী এবং তাদের গবেষণার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটি নিয়োগের অন্যতম শর্ত হওয়া উচিত।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত শিক্ষক নিয়োগের সময় গবেষণামূলক কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নতুন প্রজন্মকে গবেষণায় আগ্রহী করে তোলা।

শিক্ষকতার পাশাপাশি অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমমূলক কার্যক্রমের গুরুত্বও অনস্বীকার্য। শুধু ক্লাসরুমে জ্ঞান বিতরণ করাই একজন শিক্ষকের একমাত্র কাজ নয়। তাকে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও সামাজিক বিকাশেও ভূমিকা রাখতে হবে। বিভিন্ন একাডেমিক ক্লাব, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ক্রীড়া ও নেতৃত্বমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় শিক্ষকের সম্পৃক্ততা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত এই দিকগুলোকেও নিয়োগের সময় বিবেচনায় নেওয়া, যাতে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শুধু একাডেমিক দিক থেকেই নয়, বরং সামগ্রিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের যোগাযোগ দক্ষতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষাদানের পাশাপাশি গবেষণা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকতা শুধু তথ্য বিতরণ নয়, বরং জ্ঞান বিনিময়ের একটি শিল্প। যদি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ছাত্রদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আলোচনা করতে না পারেন, তবে শিক্ষাদান অর্থহীন হয়ে যায়। নিয়োগের সময় সাক্ষাৎকার ও ক্লাসরুম ডেমোনেস্ট্রেশন নেওয়া যেতে পারে, যাতে বোঝা যায়, একজন প্রার্থী শুধু গবেষণায় নয়, বরং শিক্ষাদানের ক্ষেত্রেও কতটা দক্ষ।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) এবং ডেমো ক্লাস একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রার্থীরা একাডেমিক দিক থেকে শক্তিশালী হলেও ক্লাসরুম পরিচালনায় ততটা দক্ষ নন। তাই মৌখিক পরীক্ষা এবং ডেমো ক্লাসের মাধ্যমে একজন প্রার্থী কতটা স্বতঃস্ফূর্ত, কতটা যুক্তিসংগতভাবে জ্ঞান বিতরণ করতে পারেন, সেটি পর্যালোচনা করা উচিত। শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো করা যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষকতার জন্য মৌখিক উপস্থাপনার দক্ষতা অপরিহার্য।

প্রযুক্তির এই যুগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরো আধুনিক এবং ডিজিটালাইজড করা প্রয়োজন। স্বয়ংক্রিয় স্কোরিং সিস্টেম চালু করা গেলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সহজ হবে। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু রয়েছে, যেখানে নিয়োগ প্রার্থীদের যোগ্যতা ও গবেষণাকর্মের মূল্যায়ন ডিজিটাল পদ্ধতিতে করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার গতিশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি স্বজনপ্রীতির সুযোগও কমে আসবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আসল কাজ শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়ন, তাই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ছাত্রদের মতামত অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া এবং তাদের শেখার অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হলে একজন শিক্ষক কতটা দক্ষ, সেটি নির্ধারণ করা সহজ হবে। বিশ্বের অনেক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের প্রতিক্রিয়া ও রেটিংয়ের ভিত্তিতেও শিক্ষক নিয়োগ এবং মূল্যায়ন করা হয়। বাংলাদেশেও যদি এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ শুধু একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মান নির্ধারণের অন্যতম নিয়ামক। এ জন্য নিয়োগব্যবস্থাকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি শিক্ষকরা যথাযথ যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ পান, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক হবে। এ জন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক সদিচ্ছা, নীতিগত সংস্কার এবং সমগ্র সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

একটি কার্যকর শিক্ষক নিয়োগব্যবস্থা শুধু উচ্চশিক্ষার মান উন্নত করবে না, বরং পুরো জাতির শিক্ষাব্যবস্থার জন্য দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গুণগত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই একমাত্র পথ।

লেখক : প্রভাষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত