হোম > মতামত

আদালত অবমাননা আইন এবং স্বৈরতন্ত্রের বিচার বিভাগ

এহসান এ সিদ্দিক

‘আদালত কলঙ্কিত করা’র নামে ঔপনিবেশিক যুগের একটি পুরোনো আইন আছে, বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলো অনেক আগেই এই আইন ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এটির অপব্যবহার করে দেশের উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ গত ১৫ বছরে ফ‍্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে জনসমালোচনা থেকে রক্ষা করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে অপব‍্যবহার করেছে। এই আইন ব্যবহার করা হয়েছে ভিন্নমত দমন, জন-অসন্তোষ দমন এবং ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন দিতে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের দুঃস্মৃতিকে ফিরিয়ে আনা এই কালো আইনের ব্যবহার বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের জন্য এক অন্ধকার অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেনে যেখানে এই আইন ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে এটি সংরক্ষিত হয়েছে স্বাধীন মতপ্রকাশ দমন, বিচার বিভাগকে নখদন্তহীন বাঘ হিসেবে নিশ্চিত করা এবং সরকারের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করিয়ে দেওয়ার জন্য। এমনকি আরও দুঃখজনক যে, আপিল বিভাগ এই আইন প্রয়োগে বাজেভাবে গবেষণালব্ধ ভারতীয় কিছু দৃষ্টান্ত অনুসরণ করেছে, উপেক্ষা করেছে বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক ধারা।

বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার নামে সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ‘আদালত অবমাননা’ আইন ব্যবহারের শেকড় ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে গ্রথিত। ব্রিটিশ শাসনামলে এই আইনটি প্রায়ই স্থানীয় জনগণের বিরোধ দমনে ব্যবহার করা হতো। ম্যাকলিউড বনাম সেন্ট অবেন (Mcleod v Aybyn) (১৮৯৯) মামলায় প্রিভি কাউন্সিল উল্লেখ করেছিল, যখন ইংল্যান্ডে আদালত অবমাননার ধারণাটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল, তখন এটি ব্রিটিশ উপনিবেশের অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রাধান্য থাকা উপনিবেশগুলোয় বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হিসেবেই রয়ে গিয়েছিল। এই রায়টি ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী চেতনার এক চিত্র তুলে ধরে, যেখানে আদালত অবমাননা ব্যবস্থাটি শৃঙ্খলা রক্ষা, বিদ্রোহ দমন ও শাসকশ্রেণির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের পরও বাংলাদেশ এই ঔপনিবেশিক ধ্বংসাবশেষ বা অনশিষ্টাংশ আঁকড়ে ধরে আছে, যার ফলে বিচার বিভাগ সমালোচকদের বিরুদ্ধে এই আইন কণ্ঠরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে।

আদালত অবমাননা আইনের অপব্যবহারের একটি অন্যতম উদাহরণ হলো দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ঘটনা। ২০১০ সালের ২১ এপ্রিল পত্রিকাটি ‘চেম্বার মানে সরকারপক্ষের স্টে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এই প্রতিবেদনে একটি প্রচলিত ধারণার প্রতিফলন ঘটেছিল, হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক বিরোধী দলের নেতাদের পক্ষে জারি করা অন্তর্বর্তী আদেশগুলো নিয়মিতভাবে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ কর্তৃক স্থগিত করে দেওয়া হচ্ছিল।

এই প্রতিবেদনে তখনকার বাস্তবতা প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, যা অনেক সিনিয়র আইনজীবী কর্তৃক স্বীকৃত ছিল, যেমন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক একবার হাইকোর্টে মজা করে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আপনারা তো হাঁচি দিলে তাও আপিলেট ডিভিশনে স্টে হয়ে যায়।’

আমার দেশ-এর প্রতিবেদনে বিভিন্ন মামলা তুলে ধরে দেখিয়েছিল কীভাবে চেম্বার জজের কার্যকলাপ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করছিল। এতে দেখানো হয়েছিল চেম্বার জজ কর্তৃক কীভাবে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন রোধে-বিকল্প হিসেবে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ-প্রদানে হাইকোর্ট ডিভিশন কর্তৃক গৃহীত প্রয়াস স্থগিত করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে লুতফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনার আরিফের ঘটনাগুলো উল্লেখ করা হয়েছিল, যেখানে তাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশগুলো চেম্বার জজ কর্তৃক স্থগিত করা হয়েছিল। তা ছাড়া, বিএনপির প্রথিতযশা নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং মীর নাসিরের বিদেশ ভ্রমণের অনুমতিও চেম্বার জজ স্থগিত করেছিলেন, এ বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

আরেকটি গুরুতর দৃষ্টান্ত আলোচিত হয়েছিল, যেখানে দুই শিক্ষার্থীর জামিন আদেশ স্থগিত করা, যাদের হাইকোর্ট শুধু পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়ে জামিন দিয়েছিল । এমনকি ওই ছাত্রদের জামিন আদেশে পরীক্ষা শেষে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আত্মসমর্পণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। তবুও চেম্বার জজ সেই জামিন স্থগিত করে। ‘চেম্বার জজ’ নামক এই বিতর্কের একদম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক তিনি প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নেতৃত্ব দেন, যা বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারিক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। সরকারপন্থি আইনজীবীর মধ্যে দুজন আইনজীবী ছিলেন, যারা আদালত অবমাননার মামলা শুরু করেছিলেন, তাদের একজনকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে পুরস্কৃত করা হয় এবং অন্যজনকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা বিচার বিভাগ ও সরকারের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সঙ্গে রাজনৈতিক আনুগত্যের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তুলে ধরে।

যখন এই আদালত অবমাননার আবেদনটির শুনানি চলছিল, তখন একই আইনজীবীদের দ্বারা ‘স্বাধীন বিচারের নামে তামাশা’ শিরোনামে আমার দেশ-এ বিগত ১০ মে ২০১০ তারিখে প্রকাশিত সম্পাদকীয়র বিরুদ্ধে আরেকটি আদালত অবমাননার মামলা করা হয়। আদালত অবমাননার এই মামলায় মাহমুদুর রহমানের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর থেকে বিচারব্যবস্থার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগের বিষয়টি আর আদালত অবমাননা আইনের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে না। সেখানে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, ভারতের সংবিধানের সঙ্গে ভিন্নতা রেখে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সঙ্গে মিল রয়েছে। সেখানে রেফারেন্স হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ‘Craig v. Harney (1947)’ মামলার রায় উল্লেখ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছিল, ‘আদালত অবমাননার আইন বিচারকদের রক্ষা করার জন্য তৈরি হয়নি, যারা জনমত প্রবাহের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারেন।’ এ ছাড়া কানাডার (R v. Kopyto (1987) মামলার রায় উল্লেখ করা হয়, যেখানে অন্টারিও আপিল আদালত বলেছিল, আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার জন্য আদালত অবমাননা আইনের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ ‘আদালত এমন নাজুক ফুল নয়, যা বিতর্কের চাপে ও তাপে ঝরে যাবে’। তবে, আপিল বিভাগ ঔপনিবেশিক যুগের দৃষ্টান্ত এবং অপর্যাপ্তভাবে গবেষণালব্ধ ভারতীয় রায়ের ওপর নির্ভর করে।

উদাহরণস্বরূপ, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের E. M. Shankaran Namboodiripad v. T. Narayanan Nambiar (1970) মামলার রায় উল্লেখ করা হয়, যেখানে আদালত ভুলভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিল, ১৯৩৬ সালের পর থেকে ইংল্যান্ডে আদালত অবমাননার জন্য প্রায়ই মামলা হয়েছিল, যদিও আদালত অবমাননার বিষয়ে বাস্তবে শেষ সফল মামলা হয়েছিল ১৯৩১ সালে। আপিল বিভাগ লর্ড ডেনিং-এর ‘The Road to Justice’ (১৯৫৫) নামক গ্রন্থে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার আইন সমর্থনে করা মন্তব্য উদ্ধৃত করেছিল, অথচ আপিল বিভাগ তার পরবর্তী এবং আরও নির্ভরযোগ্য ও প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘The Due Process of Law’ (১৯৮০), যেখানে এই আদালত অবমাননা আইনের প্রতি বিরোধিতা প্রকাশ করেছিলেন, তা উপেক্ষা করেছিলেন। নিজের অবস্থানকে সমর্থন করার জন্য এই ইচ্ছাকৃত বাদ দেওয়ার রীতি তখনকার আপিল বিভাগের পুরোনো এবং অপ্রাসঙ্গিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভরশীলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

সুতরাং, প্রথম আদালত অবমাননার মামলায় আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়, যা বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম তার বিখ্যাত বই ‘Constitutional Law of Bangladesh’-এ অত্যন্ত কঠোর শাস্তি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। একইভাবে দ্বিতীয় মামলায় তাকে এক দিনের কারাদণ্ড এবং ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়। মাহমুদুর রহমান এই দুটি জরিমানার কোনোটিই পরিশোধ করেননি এবং এর ফলে তাকে আরও দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হয়েছিল।

আপিল বিভাগ রায় প্রদানকালে আমার দেশ পত্রিকায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে। আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার আইনের সঙ্গে ঔপনিবেশিক বিচারিক কাঠামোর সত্য উপেক্ষার রীতি জড়িত। আইনটি ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে তৈরি হয়েছিল এবং যদি সত্যকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরার অনুমোদন করা হতো, তবে এই আইনের মূল উদ্দেশ্য আদতে নষ্ট হয়ে যেত। বিচারকদের ব্যর্থতার কারণে তাদের ত্রুটিগুলো প্রকাশ করা যাবে না এই ধারণাটি মৌলিকভাবে ভ্রান্ত এবং এমন একটি ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য নয়, যা অন্তত জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে গুরুত্বারোপ করে। সবশেষে, একজন ব্যক্তি এমন কিছু বলার অধিকার থাকবে না, যা মূলত সত্য? এই মৌলিক প্রশ্নটি বিগত ১৯ জুলাই ২০২০ তারিখে নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ফরহাদ মজহার উত্থাপন করেছিলেন, যা সত্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার অযৌক্তিকতাকে স্পষ্ট করে। ফরহাদ মজহার, একজন সম্মানিত কলামিস্ট, বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন যে যাচাইয়ের দাবি রাখতে পারে এমন সত্য তথ্য বা ঘটনা বলার জন্যও আদালত অবমাননা আইনে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সম্ভব! একইভাবে, প্রথম আলো-এর কলাম লেখক মিজানুর রহমান খান ২৪ আগস্ট ২০১০ তারিখে দুঃখ করে লিখেছিলেন যে আমার দেশ পত্রিকায় উত্থাপিত অভিযোগগুলো সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি।

আপিল বিভাগ এ বিষয়টি স্বীকার করেনি যে স্বয়ং ইংল্যান্ডের আদালতগুলো ৮০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ’ করার অভিযোগে আদালত অবমাননার আইন প্রয়োগ করা থেকে বিরত ছিল, যদিও এই আইনটি শেষ পর্যন্ত ২০১৩ সালে বাতিল করা পর্যন্ত ইংলিশ কমন ল’-এর অংশ হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। এই আইন বাতিলের সুপারিশ করতে গিয়ে যুক্তরাজ্যের আইন কমিশন যুক্তি দিয়েছিল যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার টুটি চেপে ধরলে তা ক্ষোভ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এমনকি ভারতেও আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে ১৯৭১ সালের ভারতীয় আদালত অবমাননা আইন-এর ১৩(খ) ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি ‘সত্যকে তার রক্ষাকবচ (Truth as a defense)’ হিসেবে তুলে ধরে আদালত অবমাননার অভিযোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করার প্রয়াস পেতে পারে। কিন্তু আপিল বিভাগ এই প্রাচীন আইনকে লেপ্টে ধরে এবং মাহমুদুর রহমানকে সম্পাদকীয়তে উল্লিখিত বিষয়গুলোর সত্যতা তুলে ধরে নিজের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে আদালত নিজেকে জবাবদিহি থেকে রক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে, আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগকে ভিন্নমত দমন এবং শাসকশ্রেণির আধিপত্য রক্ষার জন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। হিউ কলিন্স-এর মতো আইনি তাত্ত্বিক তার (Marxism and the Law, 1984) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন যে, আইন প্রায়ই সমাজের সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো শাসক মতাদর্শের পক্ষে দাঁড় করানোর মাধ্যমে অধিষ্ঠিত ক্ষমতা কাঠামোকে জিইয়ে রাখার জন্য কাজ করে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে আদালত অবমাননার অভিযোগ এই ধারণারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। আদালত অবমাননার এই আইন ভিন্নমতকে নীরব দর্শকে পরিণত করেছে এবং ন্যায়বিচারের দাবি কঠোর হস্তে দমন করেছে। এটি জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ণ করে শাসক দলের ক্ষমতার হাতকে আরও শক্তিশালী করেছে।

আমার দেশ-এর দুটি মামলায় আপিল বিভাগের আদালত অবমাননার রায় বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষা এবং আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষার মধ্যে সীমারেখা ঝাপসা করে দিয়েছে। আমার দেশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে বিচার বিভাগ নিজেকে একটি পক্ষপাতহীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিজের প্রতিমূর্তি তুলে ধরেছে। বিরোধী কণ্ঠকে চেপে ধরার জন্য আদালত অবমাননা নামক ক্ষমতার সন্নিহিত ব্যবহার দেখিয়েছে যে বিচার বিভাগ সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করার চেয়ে শাসক দলকে সমর্থন দেওয়াতেই বেশি ব্যস্ত ছিল। সে সময়ের আপিল বিভাগ তার মর্যাদা রক্ষার দাবি করলেও তার কর্মকাণ্ড বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাকে অনাস্থায় পর্যবেশিত করেছে। ন্যায্য সমালোচনার ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে আদালত পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগসহ কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। বরং, এটি একধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি স্থাপন করেছিল, যেখানে ভিন্নমতের টুটি চেপে ধরা হয়েছিল এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে বালির বাঁধের মতো ধসে দেওয়া হয়েছিল।

আমার দেশ-এর পুনঃপ্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জগতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে চলা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সমালোচনার কণ্ঠ চেপে ধরার জন্য বিচার বিভাগ আদালত অবমাননা আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে, বিশেষ করে আমার দেশ-এর মতো সেসব কণ্ঠকে টার্গেট করে যারা বিচার বিভাগের সীমালঙ্ঘন এবং সরকারের হস্তক্ষেপ উন্মোচন করার সাহস দেখিয়েছিল।

ঔপনিবেশিক যুগের আইনের অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষার চেষ্টা সে সময়ের বিচার বিভাগকে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এখন, আমার দেশ-এর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নতুন করে জবাবদিহি, সংস্কার এবং একটি প্রকৃত স্বাধীন গণমাধ্যমের রেনেসাঁর নতুন স্বপ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

লেখক: আইনজীবী,সুপ্রিম কোর্ট

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত