হোম > মতামত

নিজেদেরই হতে হবে ত্রাতা

মারুফ কামাল খান

বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কমতি নেই। আমরা অভিযোগপ্রবণ জাতি। আমি নিজেও চাইলে এক শ একটা অভিযোগ তুলতে পারি। আমরা তাদের কাছে আশা করেছিলাম অনেক বেশি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের গত পাঁচ মাসের পারফরম্যান্সে সে আশা পূর্ণ হয়নি। আমরা মনে করি, ‘বড়ো ভালো হতো আরো ভালো হলে’।

এখন সভা-সমিতির ঝাঁজালো ভাষণে কান পাতলে, টিভির টকশো শুনলে, চায়ের কাপে তোলা ঝড়ের আওয়াজে মনোযোগ দিলে, পত্রিকাগুলোর উপসম্পাদকীয় পড়লে দেখা যায়, শোনা যায় শুধুই আক্ষেপ। যার সার কথা, ‘এত রক্ত দিয়ে পরিবর্তন এনে কী লাভ হলো?’ কেউ কেউ আবার এক কদম আগে বাড়িয়ে ঠারে-ঠোরে বলে দিচ্ছেন, ‘আগেই ভালো ছিল’। সব মানা যায়, কিন্তু ‘আগেই ভালো ছিল’ শব্দগুচ্ছ শুনলেই মেজাজ তিরিক্কি হয়ে যায়। চোখ বুঝে বলে দেওয়া যায়, এরা পতিত ফ্যাসিস্ট রেজিমের দোসর কিংবা সুবিধাভোগী। তবে ওরা মিথ্যে কিন্তু বলছে না। আগে তো ভালোই ছিল ওরা। একমাত্র ওরাই ভালো ছিল দেশের সবার ভালো কেড়ে নিয়ে।

আচ্ছা, এরা কি মানুষ? মানুষের তো একটু হলেও হায়া-শরম থাকে, চক্ষুলজ্জা থাকে। কিন্তু এদের তো চোখের কোনো পর্দাই নেই। পতিত ফ্যাসিবাদের পলাতক মক্ষীরানি হাসিনা ও তার স্বজনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে লীগের ওয়ার্ড শাখার পাতি নেতাটি পর্যন্ত লুটপাট, দুর্নীতি, অনিয়ম ও চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে দেশ-জনতার যে পরিমাণ সম্পদ করায়ত্ত এবং বিদেশে পাচার করেছে, তার বীভৎস ছবি তো এখন একটু একটু করে রোজ প্রকাশিত হচ্ছে। ওদের পালের গোদা হাসিনার পরিবার যে আপাদমস্তক একটা লুটেরা ও দুর্বৃত্ত পরিবার, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও ওদের শাগরেদ-চ্যালারা সমাজে মুখ দেখায় কী করে? ‘আগেই ভালো ছিল’ বলতে ওদের বুক কি একটুও কাঁপে না?

স্বাধীনতার পর মুজিবী দুঃশাসনে দেশে যখন শতাব্দীর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমেছে, লঙ্গরখানায় এক টুকরো শুকনো রুটির জন্য যখন কংকালসার শিশুরা শীর্ণ হাত বাড়িয়ে থাকত, কাফনের কাপড় জোটাতে না পেরে কলাপাতা মুড়িয়ে যখন লাশ দাফন করতে হতো, তখন শেখ মুজিব তার পারিবারিক সব বিলাসবহুল উৎসবের ফাঁকে আবেগঘন কণ্ঠে বলতেন, বাংলার মানুষকে আমি বড় ভালোবাসি!’ একইভাবে সম্পদ ও ক্ষমতার প্রকট লোভী হাসিনার নিকটাত্মীয়রা যখন তার প্রশ্রয় এবং অনুমোদনে দেশ-বিদেশে অবৈধ সম্পদের পর্বত তৈরি করছিল, তখন হাসিনাও তার ব্যঙ্গাত্মক ক্রূর হাসি চেপে স্তাবকদের শোনাতেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমি দেশের মানুষকে কিছু দিতে এসেছি।’ এমনই জালিয়াত, প্রতারক ও অভিনয়-পটু এই পরিবার আগাগোড়া মানুষের আবেগ নিয়ে খেলে দেশটার সাড়ে সর্বনাশ করে ছেড়েছে। এখনো ওরা অন্যদের সমালোচনা করে এবং কেঁদেকেটে আরেকবার সুযোগ চায় দেশ লুট করার, ফ্যাসিবাদী রেজিম পুনঃস্থাপনের।

কত নিরপরাধ মানুষ যে হত্যা করেছে হাসিনা তার সাড়ে পনেরো বছরের জালিমি শাসনে, তার কোনো লেখাজোখা নেই। ছাত্র গণঅভ্যুত্থান দমাতে ‘চব্বিশের জুলাই-আগস্টেই নারী ও শিশুসহ দুই হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে তার হুকুমে। ভিন্নমতের মানুষদের অপহরণ-গুম-খুন, গেস্টাপো কায়দায় পৈশাচিক নির্যাতনের কুখ্যাত গুপ্তকরা ‘আয়নাঘর’ স্থাপন, মিথ্যা ও কল্পিত অভিযোগে গায়েবি মামলায় বিরোধী দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকরিসহ সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা এবং ভিন্নমত প্রচারের সব অধিকার রহিত করার মাধ্যমে হাসিনা এই রাষ্ট্রকে মধ্যযুগীয় এক সামন্ত শাসনে ঠেলে দিয়েছিলেন।

ক্ষমতা করায়ত্ত করার আগে হাসিনা মানুষের ‘ভোট ও ভাতের অধিকার’ প্রতিষ্ঠার নামে নৈরাজ্যকর ও বিধ্বংসী আন্দোলনের নজির স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর তিনি মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেন। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে বাড়তে তার শাসনে আকাশ ছুঁলেও প্রতিবাদ করার কোনো জো ছিল না। আর এখন তার বশংবদরা দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোন মুখে কথা বলে? মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এই ফ্যাসিবাদীদের নির্বাচনে জনগণের ভোট চাওয়ার কোনো অধিকার কি আদপেই আছে? এই যে হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিমের যৎকিঞ্চিৎ নমুনা তুলে ধরলাম, এখন দেশে কি সে অবস্থা আছে? ড. ইউনূসের সরকার প্রত্যাশিত ভালো হয়তো করতে পারছে না কিন্তু হাসিনার শাসনকালের ভয়াবহ অন্যায়-অনাচারগুলো থেকে তো অন্তত বিরত আছে। এটাই বা কম কীসে? এখান থেকে আগের বীভৎসতায় ফিরে যাওয়ার কথা কোনো সুস্থ মানুষ কি ভাবতে পারে?

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের একটি পুরোনো অস্ত্র হচ্ছে মিথ্যার তুবড়ি ছোটানো, অপপ্রচার ও ইতিহাসের বিকৃতি। যেকোনো তথ্যকে চোখের পলকে মুচড়ে অন্য আদল দিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ও নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে ওদের জুড়ি মেলা ভার। মানুষের জীবনবিনাশী আন্দোলনে ক্ষমতার মসনদ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর হাতেগোনা কয়েক মাস না পেরোতেই ওরা আবার সেই পুরোনো অপকৌশল নিয়ে মাঠে নামার পাঁয়তারা করছে। মুজিব ও হাসিনা উভয়েই তাদের ক্ষমতার জন্য কত মানুষকে যে উসকে দিয়ে আত্মাহুতির পথে ঠেলে দিয়েছেন, তার ইন্তেহা নেই। কিন্তু কখনো কারো বিপদে তারা পাশে দাঁড়াননি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মুজিব দেশবাসীকে হানাদার বাহিনীর কামানের গোলার সামনে অরক্ষিত রেখে নিজে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। হাসিনাও বিপদ দেখলেই বারবার নিজে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। হাসিনা প্রায়ই বলতেন, ‘প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দিয়ে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করব।’ নিজেকে সাহসী এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাপুরুষ প্রমাণ করতে হাসিনা হরেক রকম গল্প ফাঁদতেন, কথামালা সাজাতেন। কিন্তু বাস্তবে জনগণ তার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা মাত্র এক আত্মপ্রেমী ভীতু নারী নিজের প্রাণ বাঁচাতে ইন্ডিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন। ক্ষমতা ছেড়ে নিজের দেশে থেকে জেল ও মামলা মোকাবিলার সাহসশূন্য হাসিনা কি আর কখনো এ দেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখেন?

হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমে হত্যা-পীড়ন, দখল, দলীয়করণ, বিচারহীনতা তো ছিলই, তার ওপর ছিল অসম্মান ও মানসিক অত্যাচার। শাসক দলের বাইরে সব নাগরিককে হাসিনা অধিকারবঞ্চিত দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকে অধঃপতিত করেছিলেন। কোথাও সামান্য একটু প্রতিবাদ হলেই হাসিনা দেশের নাগরিকদের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানিসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি এমনভাবে দিতেন, যেন এগুলো তার পৈতৃক সম্পত্তি। যখন-তখন যাকে-তাকে অপমান করে বলতেন, ‘এ দেশ আমার। আমার বাবা এ দেশ স্বাধীন করেছেন।’ বিপুল প্রাণের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে যে স্বাধীনতা এনেছে, সেই স্বাধীনতাকে হাসিনা তার বাবার অর্জন বলে জাহির করতেন। জাতির কাছে যে মুজিবের কৃতজ্ঞ থাকার কথা, সেই মুজিবের কাছে জাতিকে কৃতজ্ঞ থাকতে বলতেন হাসিনা। এমন উদ্ধত ও গণবিরোধী মানসিকতার কাউকে কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুযোগ দেওয়া উচিত?

মেঘে মেঘে বেলা তো কম হলো না। বাংলাদেশের বয়স ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক ছুঁয়েছে। জাতি হিসেবে আমাদের আবেগ থিতিয়ে এখন অনেকটাই সাবালক হওয়ার কথা। কারো উসকানিতে নয়, নিজেদের ভালোটা এখন খুব ঠান্ডা মাথায় নিজেদেরই বুঝে নেওয়ার সময়। আমাদের দেশের সর্বস্তরের মানুষ ফ্যাসিবাদের লেলিয়ে দেওয়া ঘাতকের মারণাস্ত্রের সামনে তাদের সাহসী তরুণ সন্তানদের বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে দেখে, গোলাপের মতো রক্ত ঝরিয়ে তাদের একের পর এক নৃশংসভাবে হত্যা করতে দেখে ফুঁসে উঠেছিলেন। কোনো বিদেশি পরাশক্তি এসে এখানে দুর্বিনীত খুনি স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করেনি। কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপানে চেয়ে তারা বসে থাকেননি। মানুষ দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হয়ে যখন নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে সম্মিলিতভাবে রাজপথে নেমে এসেছেন, তখনই ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেছে।

দুঃশাসনের রেজিম বিতাড়নের পর এ দেশের সাধারণ মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছেন, এখন রাজনীতি সুন্দর হবে, গণতন্ত্রের পথ মসৃণ হবে, দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, মানুষ সব অধিকার ফিরে পাবেন, অন্যায় অপরাধের বিচার হবে, সাধারণের ভাগ্য বদলাবে। এসব স্বপ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত না হলে হতাশায় মুষড়ে পড়লে চলবে না। কারো খেয়ালখুশির ওপর সবকিছু সঁপে না দিয়ে নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই বদলাতে হবে। অধিকারগুলো আদায় করতে হবে। জনগণ যখন যা যেমন করে চান, তাতেই সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্মত হতে বাধ্য করতে হবে। যে জনগণ কারো খেলার ঘুঁটি হয়, তাদের মুক্তি নেই। জনগণের সাহসী সংগ্রামে যে পরিবর্তন এসেছে, সে পরিবর্তনকে তাদের জীবনে তাদেরই অর্থবহ করে তুলতে হবে। কোনো ত্রাতা এসে আমাদের ত্রাণ করে দিয়ে যাবে না। তাই কারো কাছে নয় ত্রাণের প্রার্থনা। তরিতে পারার শক্তি নিজে অর্জন করতে হবে। নিজেদের ভেতরে অসম্ভবকে সম্ভব করার যে প্রবল আত্মশক্তি লুকিয়ে আছে, আজ হোক সেই শক্তির বোধন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক

ই-মেইল : mrfshl@gmail.com

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত