রাষ্ট্র ও উৎসবের রসায়ন
১. কোনো কিছুকে ‘জাতীয়’ করতে ক্ষমতার ‘কোমল’ বা ‘কঠোর’—এই দুই রূপের যেকোনো একটিকে ব্যবহার করা প্রয়োজন পড়ে। জাতীয় উৎসবের ধারণাকে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিকতার জন্য জরুরি মনে করা হয়। একক জাতীয়তা ও সংস্কৃতিবোধের নির্মাণে জাতীয় উৎসব ভূমিকা রাখে। তাই কোনো কোনো উৎসবকে ‘রাষ্ট্র’ জন্ম দেয় বা পৃষ্ঠপোষকতা করে। অথবা শাসকগোষ্ঠী তাদের মতাদর্শকে ছড়িয়ে দিতে, প্রশ্নহীন করতে বা সর্বজনীনতার বাতাবরণ তৈরি করতেও উৎসবের শরণ নেয়। স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেও উৎসব-আয়োজন ও অনুষ্ঠানের বিকল্প নেই। স্মৃতিচর্চারও নীতি ও রাজনীতি আছে। উৎসবের ধর্ম আছে, রাজনীতি ও অর্থনীতি আছে। তাই রাষ্ট্রীয়/শাসকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উৎসবে অংশগ্রহণ সর্বদা ততটা নির্দোষ ব্যাপার নয়, যেমনটা পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ হয়।
২. পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মানুষের হৃদয়ে যে সাড়া ও আকুতি থাকে, জাতীয়/রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তার কতটা থাকে তা অনুসন্ধানসাপেক্ষ। ভাতা ও আদেশের বদৌলতে উৎসবের আমেজ আসে যদিও-বা, তবে তাতে থাকে তড়িঘড়ি ও নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতাÑযেন শেষ হলেই বাঁচি-ভাব। উৎসব পালনের রাষ্ট্রীয় আইনি বাধ্যবাধকতা উৎসবে আনে ‘ধর্মীয় গাম্ভীর্য’ (সরকারি চাকুরেরা জানেন এটা)। উৎসব যেন রাষ্ট্রের ধর্মাচার। ধর্মের উৎসব আছে, দিবস আছে। রাষ্ট্রের দিবস ও আচারগুলো তাই হয়তো ধর্ম-প্রশ্নকেও সামনে আনে। উৎসব বা মিখাইল বাখতিন কথিত ‘কার্নিভ্যাল’-এর ভেতর দিয়ে সামাজিক স্তরায়নজনিত অসাম্য স্থগিত হয়—কিয়ৎকালের জন্য হলেও। তাই রাষ্ট্র বা ক্ষমতাকাঠামো লোকদের মধ্যে এক ধরনের সাম্যের কৃত্রিম বোধ দিতেও উৎসবকে গুরুত্ব দেয় বা উৎসব উৎপাদন ও উদযাপনের আয়োজন করে।
৩. এমিল দুর্খেইম উৎসবকে মূলত সামাজিক সংহতি পুনঃস্থাপনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন। তার ‘collective effervescence’ ধারণা অনুযায়ী, উৎসবের সময় মানুষের মধ্যে তীব্র আবেগ ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়, যা সমাজের বিদ্যমান কাঠামোকে আরো পোক্ত করে এবং মানুষকে তাদের সামষ্টিক পরিচয়ের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত করে। ফলে উৎসব এখানে পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতিশীলতা ও ঐক্য বজায় রাখার কাজই বেশি করে। অন্যদিকে, ভিক্টর টার্নার উৎসবকে একটি রূপান্তরমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার ‘liminality’ ও ‘communitas’ ধারণা অনুযায়ী, উৎসবের সময় স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং এক ধরনের anti-structure ও পবিত্র বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যেখানে মানুষ সাময়িকভাবে সমান হয়ে যায়। এই মধ্যবর্তী অবস্থায় (in-betweenness) অংশগ্রহণকারীরা আগের সামাজিক পরিচয় থেকে বের হয়ে নতুন অভিজ্ঞতা লাভ করে, যা তাদের মধ্যে পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পরিচয়ের রাজনীতি
৪. ‘দ্য ইনভেনশন অব ট্র্যাডিশন’ রচনায় ব্রিটিশ মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক এরিক হবসবম ঐতিহ্য সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন, তা সংস্কৃতি ও উৎসবের তাৎপর্য বুঝতে সহায়ক। আমরা প্রায়ই যে উৎসব, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যকে প্রাচীন বলে মনে করি, তা প্রায়ই একটি উদ্ভাবিত বা ‘ইনভেন্টেড’ ব্যাপার। ওই উদ্ভাবিত ঐতিহ্য সমাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন রেজিম উৎসবকে তাদের রাজনৈতিক লেজিটিমেসি বা ন্যায্যতা সংহত করার জন্য এবং বিশেষ সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে ব্যবহার করে। রাষ্ট্র-প্রযোজিত উৎসব আলথুসার কথিত ‘Ideological State Apparatus’ বা মতাদর্শ বিস্তারের কোমল হাতিয়ার। ইন্টারিম সরকার উৎসবের মধ্যে ‘মুসলিম উপাদান’ ব্যবহার করতে আগ্রহী হয়েছিল। এটি দেশের বৃহত্তর মুসলমান সমাজ, যাদের সাংস্কৃতিকভাবে দীর্ঘকাল ‘অপর’ করে রাখা হয়েছিল, তাদের নিজত্বের অনুভূতি দেওয়ার চেষ্টা ছিল। এই প্রচেষ্টা একই সঙ্গে মতাদর্শ ও ইনসাফ। আবার ধরা যাক ঈদের কথা—বাঙালি মুসলমানের ঈদগুলো নিষ্প্রাণ ও নিরানন্দ করে রাখা হয়েছে দশকের পর দশক। আমাদের সেক্যুলার ও উপনিবেশী মন এই নিষ্প্রভ ঈদের পেছনে অনেকটাই দায়ী। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও সামাজিক উদ্যমের অভাবের কারণও নিহিত আছে এতে। যদিও ঈদ কেন্দ্র করে বিপুল ব্যবসা-বাণিজ্য লক্ষণীয়, কেনাবেচায় আগ্রহেরও খামতি নেই কোথাও, তারপরও ঈদের দিনগুলো এমন নীরস-নিস্পৃহ কেন যায়? ঈদের দিন আসার আগেই যেন ঈদ ফুরিয়ে যায়! লক্ষ করা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঈদ উদযাপনে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়ায় অনেক শহরেই বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ঈদ পালিত হয়েছে। এই করতে দোষ নেই যে, নতুন আমলেও এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে।
৫. বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী এক অর্থে মাইনোরিটি; কারণ মাইনোরিটি ব্যাপারটা যতটা সংখ্যার লঘুত্ব বোঝায়, তারও চেয়ে বেশি বোঝায় ক্ষমতার সংশ্রবহীনতাকে এবং ক্ষমতার বিবিধ কেন্দ্র থেকে বিযুক্ততাকে। পতিত রেজিমে এবং ‘ওয়ার অন টেরর’-এর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম পরিচয় যে কাউকে একজন ক্ষমতাহীন ও প্রান্তিক মানবে পরিণত করে ফেলত। তাই পহেলা বৈশাখ উদযাপনে বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক চেতনাকে বিশেষ সংবেদনশীলতায় দেখা একটি ইনসাফপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। তাছাড়া এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, উৎসব-আয়োজন জাতিগঠন ও জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ও জনসংহতি তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। উৎসবের কিছু স্থায়ী অনুষঙ্গ থাকে (timeless) এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন নতুন মাত্রাও উৎসবে যুক্ত হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত ও ধারাবাহিক বা পরিবর্তনহীন উপাদান উৎসবকে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক রাখে। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, পহেলা বৈশাখ জমিদারদের খাজনা ও ব্যবসায়ীদের বকেয়া আদায়ের দিন ছিল; তাই এই দিন আনন্দের ছিল শুধু এই দুই সম্প্রদায়ের জন্যই। কিন্তু ধীরে ধীরে জাতিগঠনের প্রয়োজনে পহেলা বৈশাখের উৎসবকে ফলিয়ে তোলা হয় এবং এটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৬. ধর্ম, ভাষা, ভূগোল ইত্যাদি পরিচয়ভিত্তিক উৎসব সর্বজনীন হয় না। উৎসবকে সর্বজনীন হতেই হবে—এমন গোঁয়ার্তুমি ধীরে ধীরে কমবে অবশ্য (নাকি বাড়বে!)। যখন কোনো উৎসবকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে সর্বজনীন করার আয়োজন চলে, তখন এর ভেতরকার মতাদর্শিক উদ্দেশ্য অগোচর থাকে না। রাষ্ট্র যখন উৎসবকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তা ‘মতাদর্শিক হাতিয়ার’ হয়—সত্য; কিন্তু কখনো কখনো উৎসব নিজেই নিপীড়ক শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা হয়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখ বা রমনার বটমূলের আয়োজন ষাটের দশকে পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে একটি সাংস্কৃতিক ‘প্রতিরোধ’ (Resistance) হিসেবে শুরু হয়েছিল।
গ্রামীণ শেকড় থেকে শহুরে মধ্যবিত্ত
৭. বিগত কয়েক দশক ধরে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের উদ্ভাবন হিসেবে বৈশাখ উদযাপন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একসময় গ্রামীণ মেলা বা হালখাতার লোকজ ঐতিহ্য জনপ্রিয় ছিল; কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তা শত বছর ধরে টিকে ছিল। এদিক থেকে দেখলে উৎসব শুধু ‘রাষ্ট্রীয় প্রজেক্ট’ নয়, বরং তার একটি শেকড়ও থাকে, থাকতে পারে।
৮. মুখোমুখি পরিচয়ের সুযোগ থাকার সুবাদে এবং ক্ষমতা-সম্পর্ক কম জোরালো হওয়ায় পরিবার ও সমাজ নিত্যনতুন উৎসব সৃজন করতে পারে বা বহমান কোনো প্রচলনকে নতুন চেহারায় উদযাপন করতে পারে। পরিবার ও সমাজের ছোট পরিসরে সৃষ্টিশীলতায় যতটা প্রাণ থাকে, রাষ্ট্রের বৃহৎ পরিসরে ততটা থাকে না। যোগাযোগের তীব্রতা ও তাৎক্ষণিকতায় অবশ্য রাষ্ট্র বহু দূরত্বে অবস্থানরত মানুষের মধ্যেও সমাজবোধ তৈরি করতে পারেÑযেভাবে জাতীয়তাবোধ তৈরি হওয়ার কথা বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন বলেছিলেন, সেভাবে। তবে ভিজ্যুয়াল ও সামাজিক মাধ্যম দিন দিন যেভাবে শক্তিশালী হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে কোনো একক ধারণা, উৎসব বা মতাদর্শ সর্বজনীন কিংবা আধিপত্যশীল হওয়ার সম্ভাবনা কমবে বলে ধারণা করি।
সাম্প্রতিক রাজনীতি ও আগামীর সম্ভাবনা
৯. মানুষ যা বিশ্বাস করে, যেভাবে জীবনযাপন করে, তা-ই তার সংস্কৃতি। এটাকে বলা যায় সংস্কৃতির আরোহী সংজ্ঞা (inductive)। আবার, সংস্কৃতির একটা সংজ্ঞা চাপিয়ে দিয়ে সে অনুযায়ী মানুষকে বা জনগোষ্ঠীকে সংস্কৃতিবান করে তোলা অবরোহী চিন্তা। সংস্কৃতির আরোহী চিন্তা যতটা প্রাণময় ও স্বতঃস্ফূর্ত, অবরোহী ভাব ততটা নয়। উৎসব কেমন করে উদযাপিত হবে—এই ক্ষেত্রে শ্রেণি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে নিজেদের মতো করে পালন করুক, অবরোহী যুক্তির চাপ ছাড়াই; এটি অধিক জনলগ্ন হবে ও আনন্দময় হবে।
বিগত আওয়ামী রেজিম বাঙালি সংস্কৃতির এক হিন্দুয়ানি সংজ্ঞা ও অবয়ব হাজির করেছিল এবং তারা এই আয়োজনকে এমনভাবে উদযাপন করার উদ্যোগ নিত, যেন তা কলকাতায় উদযাপিত পূজার সমতুল্য হয়ে ওঠে। ফলে বাঙালি মুসলিমদের এক বিপুল অংশ বৈশাখী উদযাপন থেকে বিযুক্ত বোধ করত।
১০. যাহোক, সবার ছুটির দিন হওয়াতেও পহেলা বৈশাখের সর্ববিস্তারী উৎসব হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিপড়ুয়া মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের সন্তানরা এই উৎসবের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই উদযাপন হয়তো আরো প্রসার ও জনপ্রিয়তা লাভ করবে এবং অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও পহেলা বৈশাখ পালন আরো বিস্তৃত হবে। ধর্মীয় প্রসঙ্গ তুলে যারা এই উৎসবের বিরোধিতা করেন, তারা শিগগিরই হয়তো ফতোয়া খুঁজবেন—কীভাবে ইসলামি আদব বজায় রেখেই উৎসবে শামিল হওয়া যায়। হয়তো এভাবে বলা হবেÑ‘পর্দার সঙ্গে উৎসবে অংশগ্রহণ করতে হবে। শালীনতার সঙ্গে আনন্দ করলে এই উৎসবে অংশগ্রহণ নাজায়েজ কিছু নয়। এটাকে গ্রহণ করতে হবে নির্দোষ বিনোদন হিসেবে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ বন্ধ করে দূরত্ব বজায় রেখে উৎসব উপভোগ করা যাবে। নামাজ-কালাম ঠিক রেখে এই উৎসব-আয়োজনে যোগদান করা যাবে।’
১১. জোর দিয়েই বলা যায়, পহেলা বৈশাখের সম্ভাবনা আছে সবচেয়ে বৃহৎ উৎসবে পরিণত হওয়ার—আমি, আপনি চাই বা না চাই। বাঙালি মুসলমান সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে এই বৈশাখেই। বাঙালি হিন্দুর পূজার আয়োজন বিপুল-বিশাল; তার আনন্দের জন্য ও বাঙালিয়ানা প্রদর্শনের জন্য পহেলা বৈশাখ অত জরুরি নয়। বাঙালি হিন্দু মাত্রই সেক্যুলার বলে বিবেচিত; তাদের ধর্মীয় উৎসবও ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাপার হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়।
অর্থনীতি ও উৎসবের ব্যাপ্তি
১২. এই উৎসব ধর্মীয় আবেগকেও ছাড়িয়ে যায়! সম্ভবত এ যুগ ভোগের যুগ হওয়ায় আনন্দ করার কোনো উপলক্ষই মানুষ হাতছাড়া করবে না। আর বৈশাখী ভাতা প্রবর্তনের ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও আয়োজনের উদ্যম তৈরি হচ্ছে এবং হবে। বেসরকারি পর্যায়েও এই ভাতা দেওয়া শুরু হবে বা হয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানে। এই ভাতা পোশাকশ্রমিকদেরও পাওয়া উচিত—নামমাত্র হলেও। সরকারি তাগিদ থাকলে মালিকরাও শ্রমিকদের এই ভাতা দিতে আগ্রহী হবে। এভাবে এই উৎসব অধিকসংখ্যক মানুষকে আনন্দ-সম্মিলনীতে যুক্ত করতে পারে। স্থানীয় কারুশিল্পীদের যে বিরাট অর্থনৈতিক বাজার এই উৎসবকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে, তা উৎসবের ‘সর্বজনীনতা’ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
১৩. তবে আমার ধারণা, পহেলা বৈশাখের ব্যাপ্তি আরো বাড়বে। ভবিষ্যতে আরো নানা করপোরেট হাউস উৎসবের আমেজ তৈরি করে মুনাফা করবে এবং এই উৎসবকে জনগণের বিনোদন ও বার্ষিক অবকাশ উদযাপনের বড় ক্ষেত্রে পরিণত করবে। গান, নৃত্য, খানাপিনার আয়োজনের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্তের এই উদ্ভাবন ছড়িয়ে পড়বে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। পশ্চিম বাংলার মিডিয়া যদি পহেলা বৈশাখ উদযাপনে আরো বেশি অনুষ্ঠান আয়োজন করে (এ সম্ভাবনা অবশ্য কম), তবে আমাদের দেশি ও ওপার বাংলার আয়োজন মিলিয়ে বৃহৎ এক উৎসবে পরিণত হতে পারে পহেলা বৈশাখ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, পশ্চিমবঙ্গে পূজাপার্বণের যে জাঁকজমক ও উৎসাহ, তা পহেলা বৈশাখের উদযাপনকে ছাড়িয়ে যায়। ওপার বাংলায় সংস্কৃতিই ধর্ম; ধর্ম ও সংস্কৃতির ভেদ তাদের মধ্যে নেই।
১৪. সংস্কৃতি মাত্রই শংকর; বিশুদ্ধ সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। হোমি ভাবা কথিত ‘হাইব্রিডিটি’-ই সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃতির ভেতরে লেনাদেনা আছেই। বাঙালি সংস্কৃতি বলেও একমাত্রিক কিছু নেই। ক্ষমতা সংস্কৃতি তৈরি করে, সংস্কৃতি তৈরি করতে পারে মিডিয়াও আর এটিকে ছড়িয়ে দিতে পারে উদ্যমী মানুষের একদল। এই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রভাবগুলো থাকলেও, উৎসবের চূড়ান্ত প্রাণশক্তি আসলে তার স্বতঃস্ফূর্ত চরিত্রের মধ্যেই নিহিত। বিশেষভাবে বললে, পুঁজিবাদী সমাজের উৎসবের অবশ্যই দরকার হয় এবং তা টিকিয়ে রাখারও প্রয়োজন হয়। রাজনীতি ও অর্থনীতি ছাড়াও আছে উৎসবের মনস্তত্ত্ব, যেটার অনুসন্ধান এ তল্লাটে হয়নি এক ফোঁটাও। তবে এতটুকু বলে রাখি—আনন্দ ও উৎসব এমনই সংক্রামক ও বিস্তারী যে, এর বিরোধীরাও লুকিয়ে-ছাপিয়ে হলেও এর আমেজটুকু উপভোগে বিরত থাকতে পারেন না।