হোম > মতামত

আধিপত্যবাদের নিগড়ে বাংলাদেশকে বেঁধে রাখার কৌশল

মাহবুব উল্লাহ

২০২৪-এর গণঅভুত্থানের পর বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে, যার ফলে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, মনে হচ্ছে আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী আদাজল খেয়ে লেগেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব খর্ব করার জন্য। আমাদের স্বাধীনতা কখনোই খুব নিরাপদ ছিল না। বাংলাদেশ তার ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় এমন সব শাসকদের পেয়েছে, যারা আধিপত্যবাদী প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির কাছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে দ্বিধান্বিত হয়নি। এরা মনে করেছে বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির ইচ্ছা পূরণের মধ্য দিয়েই তারা শাসনক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। শাসনক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার জন্য তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুমড়েমুচড়ে তছনছ করে দিয়েছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে এমন সব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়েছে, যারা তাদের অনুগত এবং তাদের প্রভুরাষ্ট্রের প্রতিও অনুগত। এভাবে দেশটি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব সোনার থালায় করে প্রতিবেশীকে উপহার দিয়েছে। প্রতিবেশীর স্বার্থ রক্ষাই হয়েছে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি। এজন্য প্রায়ই শেখ হাসিনার সরকারের আমলে আমরা শুনতে পেতাম, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো, সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি শত্রুতা নয়। এটা কোনো জাতিরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হতে পারে না। কারণ রাষ্ট্র মানেই তার মিত্র থাকবে, শত্রু থাকবে। পৃথিবীতে এমন কোনো রাষ্ট্র আমরা দেখতে পাই না, যে রাষ্ট্র অন্য কোনো রাষ্ট্রকে অথবা কয়েকটি রাষ্ট্রকে নিজ জাতীয় স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে না, অথবা শত্রু হিসেবে গণ্য করে না। ভারতীয়রা চাণক্য নীতিতে বিশ্বাসী। চাণক্যের শিক্ষা হলো তাদের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য নিরূপণকারী। চাণক্যের একটি বক্তব্য হলো প্রতিবেশী রাষ্ট্র মাত্রই শত্রু। তাই একে ছলেবলে কৌশলে পোষ মানিয়ে নিতে হয়। আর যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্র তার ঔদ্ধত্য পছন্দ না করে, তাহলে তাকে বাহুবলে নতি স্বীকার করানোই শ্রেষ্ঠ পন্থা।

প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশের প্রতি যে আচরণ করে, তার মধ্যে ট্রোজান ওয়ার বা ট্রয়ের যুদ্ধে শত্রুপক্ষ স্পার্টা একটি ধূর্ত কৌশল অবলম্বন করেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল ট্রয়ের সঙ্গে সম্মুখ সমরে জয়লাভ করা সম্ভব নয়। তারা একটি বিশাল কাঠের ঘোড়া তৈরি করেছিল। ট্রয়ের বাসিন্দারা এই কাঠের ঘোড়া দেখে বিস্মিত হয়ে পড়ে। তাদের এই বিস্ময় ও আকর্ষণ দেখে স্পার্টানরা প্রস্তাব করল, তারা এই ঘোড়াটি ট্রয়কে উপহার দিতে চায়। ট্রয়ের বাসিন্দারা আনন্দের সঙ্গে এই প্রস্তাব গ্রহণ করল। এই ফাঁকে স্পার্টানরা নিজেদের বেশ কিছু সশস্ত্র সৈনিককে ঘোড়ার পেটে প্রবেশ করিয়ে ট্রয়ের দুর্গে ঢুকিয়ে দিল। ট্রয়বাসীরা যখন রাতের বেলায় নিদ্রামগ্ন, তখন ওই কাঠের ঘোড়ার পেট থেকে স্পার্টার সৈন্যরা বেরিয়ে পড়ল এবং ঘুমন্ত ট্রয়বাসীদের হত্যা করল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত একই কৌশল গ্রহণ করেছে। তাদের ট্রয়ের ঘোড়ার পেটে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা র-এর অসংখ্য চর, রয়েছে অনুগত রাজনীতিবিদ, অনুগত আমলা এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বেশকিছু কুশীলব—যুদ্ধজয়ের চমৎকার কৌশল।

শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের অনেকগুলো দেশবিরোধী চুক্তি হয়েছে। সেসব চুক্তি কখনোই প্রকাশ করা হয়নি। এই চুক্তিগুলো প্রকাশিত হওয়া উচিত। গণভোটের মাধ্যমে যেসব চুক্তি দেশবিরোধী, সেগুলো বাতিলের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এই একগুচ্ছ চুক্তির মধ্যে এমন একটি চুক্তির কথা শোনা যায়, যে চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তাদের সন্দেহভাজন যে কাউকে ধরে নিয়ে যেতে পারে। শেখ হাসিনার সময় যারা গুম হয়েছিলেন, তাদের বেশ কজনকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে ঠেলে দিয়েছিল। তাদের ভারতের পুলিশ বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গ্রেফতার করে মামলা দিয়ে জেলে পুরেছে। এটাও হয়েছে দুই দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে। এভাবে যারা গুম হয়েছেন, তারা ভিন দেশে থেকে প্রচণ্ড দুশ্চিন্তার মধ্যে সময় কাটিয়েছেন এবং তারা সেখানে থাকা অবস্থায় তাদের আপনজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। কী যে অসহায় অবস্থায় তারা দিনাতিপাত করেছেন, তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। একটি সার্বভৌম দেশ কী করে তার বন্দিদের ভিন দেশের হাতে তুলে দেয়, তা ভাবা যায় না। এভাবে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব চরমভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। পৃথিবীর আর কোনো দেশ এ ধরনের কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত কি না, তা আমার জানা নেই। তবে বৃহৎ শক্তির স্যাটেলাইট রাষ্ট্রগুলো এরকম কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে থাকতে পারে বলে অনুমান করা যায়। বিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের পাশে ছিল ওয়ারশ জোটভুক্ত বেশ কয়েকটি স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। এসব রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য হলেও সেখানে সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর ঘাঁটি ছিল এবং এই রাষ্ট্রগুলোকে সোভিয়েত ইউনিয়নের হুকুমবরদারি করতে হতো। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে শেখ হাসিনার আমলে এমন ধরনের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, যার ভিত্তিতে বলা যায়, বাংলাদেশও ভারতের স্যাটেলাইট রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর যারা ভারতের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন, তাদের কাছ থেকে এমন ধরনের কাহিনি শুনতে পাওয়া যায়। জুলাই-আগস্টের অভুত্থানের পর একজন-দুজন করে ভারতের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছেন। তবে তারা খুব সামান্যই তথ্য দিচ্ছেন। তারা হয়তো আতঙ্কের মধ্যে আছেন— যে কোনো সময় তাদের ভাগ্যে পুরোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কতটা অবনমিত হয়েছিল। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নিমসার্বভৌম দেশ বললেও অত্যুক্তি হবে না। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ওপর ভারতের খবরদারি অনেকটাই বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এ কারণে ভারত বাংলাদেশের প্রতি খুবই উদ্ধত হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশকে ভারতের রাডারের মধ্যে রাখার জন্য উদ্যোগ-আয়োজনের অভাব নেই। বেশ ক’বছর আগে ভারতীয় এক সমরনায়ক বাংলাদেশকে ভারতীয় রাডারের রেঞ্জের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের উপকূলে একাধিক রাডার স্থাপনের চুক্তি হয়েছিল, যেগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতের হাতে। এই রাডার স্টেশনগুলো যদি চালু হয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বঙ্গোপসাগরের অনেক তথ্য ভারতের হস্তগত হয়ে পড়বে।

শুধু এখন নয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের ওপর কঠোর নজরদারি করত। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও পত্রযোগাযোগের ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখা হতো। এই উদ্দেশ্যে ভারত সরকার এ কে রায় নামে এক আমলাকে সর্বক্ষণের জন্য নিয়োগ দিয়েছিল। এই ব্যক্তিটি ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বরিশাল জেলার মানুষ। তিনি পাকিস্তানের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় ১৯৪৯ সালে উত্তীর্ণ হয়ে সিএসপি অফিসার হয়েছিলেন। কিছুদিনের মধ্যে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। তার ব্যাপারে এসব তথ্য আমাকে জানিয়েছিলেন প্রয়াত ড. আকবর আলী খান। ভারতে যাওয়ার পর তাকে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাকে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস পরীক্ষা দিতে হয়নি। তিনি বাঙালি ছিলেন বলে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের ওপর নজরদারি করা সহজ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ভারত সরকারের যুগ্ম সচিব। ভারতের সিভিল সার্ভিসে যুগ্ম সচিবের পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভারতের পক্ষে জানা সহজ হয়েছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিশিষ্ট কর্মকর্তা জি পার্থ সারথি, ডিপি ধর প্রমুখদের বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিবিড় সংযোগের মাধ্যমে। কলকাতা বিমানবন্দরে ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা জে আর জ্যাকবের সঙ্গে ডিপি ধরের দেখা হয়েছিল। জ্যাকব ডিপি ধরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে আমরা কখন প্রবেশাধিকার পাব? জবাবে ডিপি ধর বলেছিলেন, ‘অপেক্ষা কর। এসব রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিক নেতারাই দেখবেন।’ শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত অগ্রাধিকারমূলকভাবে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পায় একটি চুক্তিবলে। ভারত চট্টগ্রাম বন্দর এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সড়কপথ ব্যবহার করে অনেক কম সময়ে এই চুক্তির ফলে পণ্যসামগ্রী ও সামরিক সম্ভার নিয়ে যেতে পারবে মিজোরামে। শেখ হাসিনার শাসনামলে এ ধরনের আরও অনেক চুক্তি হয়েছে। এখনকার চ্যালেঞ্জ হলো এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলোর বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের উপায় খুঁজে বের করা। এই আলোচনা থেকে পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের গোড়া থেকেই ভারত বাংলাদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নানা সময়ে নানা কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করেছে। ভারত যদি এসব কৌশল থেকে বের হয়ে আসে, তাহলেই কেবল দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সৎ প্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত