হোম > মতামত

শাহবাগের বিনাশেই নতুন বাংলাদেশ

রেজাউল করিম রনি

একটা দেশে ফ্যাসিবাদ হুট করে কায়েম হয় না বা আকাশ থেকে আসে না। এর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতন তৈরি হতে থাকে ঐতিহাসিক বয়ানকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক অর্জন কিন্তু ভারতীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা এই জনযুদ্ধকে একটা আওয়ামী যুদ্ধ ও ভারতের অবদান হিসেবে বয়ান করেছে। আর এই বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তথাকথিত অসাম্প্রদায়িকতা, প্রগতিশীলতা ইত্যাদির নামে আসলে ইসলামবিদ্বেষী বয়ানের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামক এক ঘৃণাবাদী সাংস্কৃতিক উন্মাদনা তৈরি করে। যার সঙ্গে মুক্তিসংগ্রামের বহুমুখী জনযুদ্ধের ইতিহাসের কোনো সম্পর্ক নেই। এক অলীক মিথ্যা গর্ব ও ইতিহাসের নামে ভারতীয় বাঙালিদের সাহিত্যিক আবেগের কাসুন্দিসমেত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ফ্যাসিবাদ কায়েমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে গিয়ে তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিল।

এক. মুক্তিযুদ্ধের বয়ানের আলোকে এক কৃত্রিম জনজাগরণ তৈরি করে দেশকে চিরতরে ভারতীয় সাংস্কৃতিক বয়ানের কলোনি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

দুই. ইসলামকে সামাজিকভাবে হেয় করার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের রাজনৈতিক বিকাশের ধারাকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা।

এ জন্য পুরো ইসলামি জনগোষ্ঠীকে জামায়াত-হেফাজত-জঙ্গি ইত্যাদি বলার পাশাপাশি ইসলামি মূল্যবোধের মধ্যে ভিন্নতা থাকার পরও পুরো মুসলিম তৌহিদবাদী কমিউনিটিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, তথা বাংলাদেশবিরোধী হিসেবে হাজির করে চিরতরে বাংলাদেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কায়েম করার প্রকল্প আকারে শাহবাগকে নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে আমাদের মতো গোটা-কয়েক ব্যতিক্রম মানুষ বাদে বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া, সাংস্কৃতিক জগৎসহ প্রায় পুরো মধ্যবিত্ত আরবান তরুণ প্রজন্মকে শাহবাগের আফিম আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। সে সময় শাহবাগের ফাঁসিবাদী এবং পরে এর হাত ধরে ফ্যাসিবাদী উন্মাদনার আড়ালে যে গভীর ইসলামবিদ্বেষ আছে, তা জাতির সামনে তুলে ধরতে এগিয়ে আসে দৈনিক আমার দেশ। লেখা হয় ঐতিহাসিক শিরোনাম : শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি। ধীরে ধীরে ভুল ভাঙতে থাকে। জাগতে থাকে বাংলাদেশের মানুষ। কওমি ও তৌহিদবাদী জনতার বিষয়ে শত সমালোচনা ও তাদের অনেক ত্রুটি থাকার পরও এক কথা বলতে হবে-সেদিন শাপলার উত্থান বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল।

কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, এখনো এই ইসলামবিদ্বেষী শাহবাগী ধারাই মূলধারা হিসেবে রয়ে গেছে। ভারতীয় বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী বয়ানের আলোকেই যেহেতু এ দেশের তথাকথিত প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতা গড়ে উঠেছে, ফলে এরা স্বাভাবিকভাবেই ভিন্নচিন্তা বা ইসলামের সঙ্গে কোনো কিছুর সম্পর্ক থাকলে তাকে প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে দেখেন। কিন্তু সত্য হলোÑ এই তথাকথিত প্রগতিবাদীরাই আসলে প্রতিক্রিয়াশীল ও অসহিষ্ণু। এরাই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি তৈরি করেছে এবং মিডিয়া নিজে এখনো এই সাংস্কৃতিক বয়ানই নিজে ধারণ করে এবং জনগণের জন্য প্রচার করে। মিডিয়ার নিজের সংস্কৃতি হলো শাহবাগী সংস্কৃতি।

কাজেই শাহবাগকে পুরোপুরি ডিজমেন্টাল বা বিনাশ করেই নতুন বাংলাদেশের সূচনা করতে হবে। আপনি যদি লীগ না চান, গোমূত্রখোরদের অত্যাচার না চান, জাহেলিয়াত না চান, তাহলে শাহবাগও চাইতে পারেন না। যারা বাইনারির কথা বলেন এবং যুক্তি দেন শাহবাগের বিপরীত প্রতিক্রিয়ায় শাপলার জন্ম হয়েছে, এরা ভুলে যান শাপলার কোনো রাজনীতি নেই (যদিও তাদের একাংশ হাসিনাকে কওমি জননী ঘোষণা করে সমাজের প্রভূত ক্ষতি করেছে, এতে সমাজের নৈতিক স্পিরিট মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফ্যাসিবাদ শক্তিশালী হয়েছে)। আমরা শাপলার একাংশেরও শাহবাগী পরিণতি হতে দেখেছি। এখানে কোনো বাইনারি নেই। শাহবাগই মূলধারা এবং শাহবাগের আছে পটেনশিয়াল স্বৈরাচারী শাসন কায়েমের সাংস্কৃতিক লজিক, অর্থ, ভারতীয় বল ও প্রতিষ্ঠান। বাইনারি দিয়ে সমাজ চলবে না। কিন্তু বহু পুরোনো এই দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করার মধ্যে কোনো ফায়দা নেই। প্যাগান (পশুপূজারি) চিন্তার সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক আতি আব্রাহামিক বিশ্বাসের লড়াইয়ের সমান পুরোনো এই দ্বন্দ্ব। তাই শাহবাগকে অতিক্রম করে পোস্ট শাহবাগ যুগে আমাদের প্রবেশ করতে পারতে হবে।

পরে আমরা দেখেছি, শাহবাগের অনেক কুতুব জনগণের কাছে ক্ষমা না চেয়ে ঠিকই মূলধারায় সক্রিয় হয়ে গেছেন। যারা শাহবাগের কৃত্রিম জোয়ার তৈরিতে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছেন, এমন বাচাল আজ জাতীয় বুদ্ধিজীবী। যারা তাদের অবস্থান ভুল ছিল এবং এটা স্বীকার করেছেন, জনগণের কাছে ব্যাখ্যা দিয়ে নতুনভাবে জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের কথা বলছি না। কিন্তু যে অংশটা শাহবাগের সময় সক্রিয় শাহবাগী ছিল, শাহবাগকে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। জামায়াত-বিএনপির সমর্থকদের রাষ্ট্র যেন বলপ্রয়োগ করে হলেও দমন করে, এমন বয়ান টিভিতে ঝেড়েছিল, তারা পরে কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে, আবেগী জনতাকে ভালো ভালো নসিহত দিয়ে ভোল পাল্টে এখন বিপ্লবী চরিত্রে অভিনয় করছেন এবং আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, এরা সুযোগ পেলে আগামীতে আরো ভয়ংকর শাহবাগী হিসেবে আবির্ভূত হবেন। ঠিক যেমন ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির লোকগুলো অগ্রগামী শাহবাগী হিসেবে হাজির হয়েছিল ২০১৩ সালে। কিন্তু যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এসব ভন্ড ও ছদ্ম বুদ্ধিজীবীর দ্বারা তাদের অনেকেই এদেরই এখন মাথায় তুলে নাচেন।

যারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে জনগণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, তাদের কথা বলছি না। আমি আত্মপ্রতারকদের কথা বলছি। যারা সরাসরি গণহত্যার পক্ষে মতামত তৈরি করেছে। পুরো কালচারাল ক্যাডার বাহিনী নামিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ব্যাপক অ্যাকটিভিটি শুরু করেছিল, তারাই আজ জাতির বিবেক। এর মধ্যে এমন বুদ্ধিজীবী পাবেন যে কমপক্ষে পাঁচটনি ট্রাকের পাঁচ ট্রাক বই পড়েও শাহবাগকে বলেছিল দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। তাদের অনেকে আবার বিশাল জ্ঞানী মনে করে পূজা করেন।

শত্রু-মিত্র না চেনার খাসলত আপনাদের যুদ্ধের আগেই হারিয়ে দেয়। কেন আপনার এমন টাউট বুদ্ধিজীবী লাগবে? কোনো বুদ্ধিজীবী দরকার নেই। দু-চারজন ব্যতিক্রম বাদে শাহবাগে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবিতা নিহত হয়ে গেছেন। আপনারা সেসব জিন্দা লাশ দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়তে পারবেন না। ৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশে যাদের জেলে থাকার কথা, এরা এখন জাতির বিবেক। এ দেশ নিয়ে আপনি আশাবাদী হলে মিথ্যাবাদী হতে হবে।

মনে রাখতে হবে, শাহবাগ হলো রাজনীতির কষ্টিপাথর। এটাতে ঘষা দিয়ে যে কারো রাজনৈতিক চরিত্র সহজেই চিন্তে পারবেন। আরো মনে রাখতে হবে-শাহবাগের দু-তিনটি ধরন বা ধারা আছে-

এক. অনেক লোক আছে পলিটিক্যালি এন্টি শাহবাগী কিন্তু কালচারালি শাহবাগী। এরা সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদী ক্যালকেশিয়ান বা কলকাতাপন্থি বামপন্থার ধারক। এর সঙ্গে সমন্বয়বাদী ইসলামের কথাও মাঝে মাঝে বলেন কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এন্টি শাহবাগী। এদের সক্রিয়তা শেষ পর্যন্ত আওয়ামী সাংস্কৃতিক ধারা ও তাদের বয়ানের মিডিয়াকেই শক্তিশালী করে।

দুই. আরেকটি দল আছে পলিটিক্যালি শাহবাগী কিন্তু কালচারালি এন্টি শাহবাগী। এরা মোটাদাগে ফেনাটিক। এরা ইসলামি অংশেও থাকতে চায় আবার সুশীলও হতে চায়। শাহবাগের সংস্কৃতি নিতে চায় না কিন্তু রাজনীতির মডেলটা ছাড়তে পারে না। আর এর বাইরে যারা দুটোই ধারণ করে। কালচারালি এবং পলিটিক্যালি শাহবাগী-সেই হলো সবচেয়ে জঙ্গি আওয়ামী লীগার। পুরাই ক্র্যাক বলতে পারেন এ ধারাকে।

আর একটা অতি ক্ষুদ্র দল আছে কালচারাল ও পলিটিক্যাল দুদিক থেকেই এন্টি শাহবাগীÑ এরাই বাংলাদেশের পক্ষের লোক। বাকিগুলো গোমূত্রের সন্তান। কেউ আপন সন্তান, কেউ পর সন্তান। হিসাব পরিষ্কার।

লেখক : চিন্তক ও সম্পাদক, জবান

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত