হোম > মতামত

জনতার চোখে ড. ইউনূস

শাহীদ কামরুল

বর্তমান বিশ্বে জীবিত শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবীদের যেকোনো তালিকায় প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম পাঁচজনের মধ্যে থাকবেন। নোবেল, আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাওয়ার্ড ও মার্কিন কংগ্রেশনাল অ্যাওয়ার্ড- এই তিনটি পুরস্কারই পেয়েছেন বিশ্বে এমন মানুষ মাত্র ১২ জন। তার মধ্যে প্রফেসর ইউনূস একজন।

মেসি হলেন বর্তমান বিশ্বের সেরা তারকাদের একজন। অথচ সেই মেসিই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ড. ইউনূসের সঙ্গে ছবি তুলতে। ধনী দেশগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে অলিম্পিক গেমস আয়োজন করে। এই গেমসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সবচেয়ে সম্মানিত অতিথি ধরা হয় অলিম্পিকের মশাল বাহককে। ড. ইউনূস মশাল বাহক হয়েছিলেন ২০২৪ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ফ্রান্স ও জাপানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক গেমসে।

২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের মূল থিম করা হয়েছে ড. ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে। ফরাসি নাক উঁচু জাতির গর্বের অলিম্পিক গেমসের ওয়েবসাইটের টাইটেল পেজে ড. ইউনূসের ছবি। একজন বাঙালি হিসেবে এই দৃশ্য দেখতে পারাটা সত্যিই গর্বের। ড. ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা এবং থ্রি জিরোÑ এই তিনটি তত্ত্বই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে তার সামাজিক ব্যবসা এবং থ্রি জিরো বা তিন শূন্যÑ এ দুটো খুবই জনহিতকর তত্ত্ব।

বিশ্বের ১০৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনূস সেন্টার আছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের উদ্যোগে এটা করেছে। এর প্রধান কারণ তার ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি যেটা তাকে এবং তার গ্রামীণ ব্যাংকে নোবেল শান্তি পুরস্কার এনে দিয়েছিল। দারিদ্র্যদূরীকরণে ৪০টির বেশি দেশ অনুসরণ করছে তার সামাজিক ব্যবসার মডেল। ড. ইউনূসের চিন্তা, কাজ, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য ও তার জীবনাদর্শ নিয়ে বিশ্বের ৮০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে গবেষণা হয়।

তিনি হচ্ছেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া বক্তা। কিছুদিন আগে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য ড. ইউনূস আমেরিকায় পাঁচ দিন অবস্থান করে প্রায় ৫০টির মতো বৈঠক করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধান এবং বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে।

বাইরে থেকে অনুদানের টাকা এনে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গ্রামীণ ব্যাংকে এখনো সুদের হার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তো নয়ই, মাঝারিও নয়। একটি প্রতিষ্ঠান যদি ব্যবসা করে বা টাকা বিনিয়োগ করে, সেই প্রতিষ্ঠান বা মানুষ ন্যূনতম লাভের ব্যবস্থা না করলে প্রতিষ্ঠান চলবে না। একজন মানুষ ব্যবসা করবে অথচ সেখান থেকে নিজে কোনো লাভ করবে না, এটা কেউ করে? কোনো কিছু না বুঝে বা গভীরভাবে চিন্তা না করে ড. ইউনূসকে সুদখোর বলে গালি দেওয়া কতটুকু যৌক্তিক, সেটা সবারই ভেবে দেখতে হবে।

এবার ড. ইউনূসের তিন শূন্য তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা যাক। বিশ্বের কাছে ‘ড. ইউনিভার্স’ নামে পরিচিত ড. ইউনূস তার ক্ষুদ্রঋণ ধারণার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্যবিমোচনে একটি বিপ্লব সৃষ্টি করেছেন। এ কাজের জন্য তিনি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন।

২০১৭ সালে প্রকাশিত তার বই ‘এ ওয়ার্ল্ড অব থ্রি জিরোস’ এ ড. ইউনূস একটি নয়া এবং সাহসী ধারণা উপস্থাপন করেছেন, যা তিনি ‘থ্রি জিরোস থিয়োরি’ নামে পরিচিত করেছেন। এই থিয়োরি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নিয়ে গঠিত। এগুলো হচ্ছেÑ দারিদ্র্যকে শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনা বা এর সম্পূর্ণ অবসান, বেকারত্বকে শূন্যের ঘরে নামিয়ে বা এর সম্পূর্ণ অবসান এবং কার্বন নিঃসরণকে শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনা।

তিন শূন্যের এই ধারণা বাস্তবায়িত হলে তা আবার ড. ইউনূসকে নোবেল পুরস্কারের মঞ্চে নিয়ে আসতে পারে। কেননা এই থিয়োরি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ড. ইউনূস বিশ্বাস করেন, দারিদ্র্য শুধু অর্থনৈতিক সমস্যার ফল নয়, বরং এটি একটি সামাজিক সমস্যা, যা সঠিকভাবে সমাধান করা সম্ভব। ক্ষুদ্রঋণ ধারণার মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ছোট ঋণ মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারে। এই মডেলটি দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য কার্যকর একটি উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ড. ইউনূস এখন আরো বড় পরিসরে এ ধারণাকে প্রসারিত করতে চান, যাতে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের সম্পূর্ণ অবসান সম্ভব হয়।

বেকারত্বকে শূন্যের ঘরে নামিয়ে বা এর সম্পূর্ণ অবসানের ব্যাপারে ড. ইউনূস বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক মানুষের কর্মসংস্থান একটি মৌলিক অধিকার এবং এই অধিকার নিশ্চিত করার জন্য তিনি সামাজিক ব্যবসার মডেলগুলোর ওপর জোর দেন। এই মডেলগুলো লাভের পরিবর্তে মানুষের কল্যাণে কাজ করে, যা কর্মসংস্থান তৈরি করতে সহায়ক। ড. ইউনূস মনে করেন, এই মডেলগুলো যদি বৈশ্বিকভাবে গৃহীত হয়, তাহলে বিশ্বের সমস্ত মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। তার সর্বশেষ লক্ষ্যÑ কার্বন নিঃসরণ শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনা।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস একটি জরুরি পদক্ষেপ। ড. ইউনূস বিশ্বাস করেন, সোশ্যাল বিজনেস মডেলগুলোর মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলোর প্রসার ঘটানো সম্ভব, যা কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যদি এই মডেলগুলো বৈশ্বিকভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমিয়ে পৃথিবীকে একটি সবুজ ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

ড. ইউনূস ইতোমধ্যে তার ক্ষুদ্রঋণ ধারণার জন্য বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছেন এবং তিনি দেখিয়েছেন, একজন ব্যক্তি কীভাবে বৈশ্বিক পরিবর্তন আনতে পারে। তার বইয়ে প্রস্তাবিত থ্রি জিরো থিয়োরি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী একটি টেকসই, ন্যায়সংগত এবং সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। তার এই সাহসী এবং প্রয়োজনীয় ধারণা বিশ্বকে একটি নতুন পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ, দারিদ্র্যমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব পৃথিবী সম্ভব হবে। ড. ইউনূস তার কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে ইচ্ছুক একজন ব্যক্তি কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন।

আমাদের দেশের অনেকেই হয়তো জানেন না যে, তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অসামান্য অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি একটি নাগরিক কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সমর্থন সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ ইনফরমেশন সেন্টার পরিচালনা করেন। পাশাপাশি ন্যাশভিলের তার বাড়ি থেকে ‘বাংলাদেশ নিউজলেটারও’ প্রকাশ করতেন। এ ছাড়া জনমত গঠনেও ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান।

১৯৮০ সালের শেষের দিকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করতেন। একবার তাদের একটি অনুষ্ঠানে লেখক আহমদ ছফা আমন্ত্রিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস তার সফলতার গল্পগুলো শোনান। একপর্যায়ে তাকে আহমদ ছফা প্রশ্ন করলেনÑ ড. ইউনূস, আমরা তো আপনার সফলতার গল্প শুনেছি, এখন আপনার ব্যর্থতার গল্প শোনান। ইউনূস তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার কোনো ব্যর্থতার গল্প নেই।

লেখক : সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক, গবেষক ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

Email : sahidsams7@gmail.com

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত