হোম > মতামত

বাংলা সনের জীবনী

মুহিম মাহফুজ

ফাতেহা

এশিয়া পৃথিবীর আদিভূমি। পৃথিবীর শত শত সভ্যতার শুরু, ক্ষয় ও পুনর্জন্ম হয়েছে এশিয়ার মাটিতে। পৃথিবীর অধিকাংশ মহাজাতির জন্মভূমি এশিয়া। দুনিয়া বদলে দেওয়া অগণিত মহাপুরুষ, ধর্মপুরুষরা এশিয়ায় জন্ম নিয়েছেন। তাদের নতুন সভ্যতা সৃষ্টি ও সংস্কারের প্রথম ক্ষেত্র ছিল বিস্তীর্ণ এশিয়া ভূমি। মানব বসতির প্রসার ও সভ্যতা বিকাশে ধীরে ধীরে পশ্চিমের দুনিয়া আবিষ্কার ও আবাদের আওতায় এসেছে।

মধ্যপ্রাচ্য বা আরবের পর এশিয়ার অন্যতম প্রাচীণ ভূমি এশিয়া-দক্ষিণ। এ ভূমিতে যেমন প্রাচীণ সভ্যতার জন্ম হয়েছে, জন্ম হয়েছে নতুন দর্শন, চিন্তার। দুনিয়ার অন্যান্য জাতি-সভ্যতা-দর্শনের সঙ্গে মোকাবিলা ও মোলাকাতও হয়েছে এই ভূমির সন্তানদের। হাজার হাজার বছর ধরে সেই মোকাবিলা ও মোলাকাতের মধ্য দিয়ে এশিয়ার অন্যতম মহাজাতি বাঙালি এই বর্তমানে এসে উঠে দাঁড়িয়েছে।

বাঙালির ইতিহাসের যেমন আন্তর্জাতিকতা আছে, সভ্যতার বিশ্বদরবারে বাঙালির অবদানেরও স্বীকৃতি আছে। বাঙালি মুসলমানের বা বাংলাদেশি সভ্যতার সঙ্গে পৃথিবীর আদি সভ্যতাগুলোর যেমন ঘনিষ্ঠ ভাব ও যোগ আছে, একই ভাবে দুনিয়ার মহাজাতি, মহাসভ্যতাগুলোর সঙ্গে অনবরত বিনিময়ের ফলে বাঙালি জাতি-সভ্যতার সমৃদ্ধ হওয়ার সিলসিলা জারি আছে। বাংলা সনের শুরু, সংস্কার ও প্রতিষ্ঠার ইতহাসও এই দৃষ্টিতে পড়ার বিশেষ দরকার, যাতে উপলব্ধি করা যায়। এটি বিশ্ববাংলার ভবিষ্যৎ রাস্তা।

বাংলা সন শুরুর আগের দুনিয়া

বাংলা সন শুরুর আগে এশিয়ার বাংলা-পাক-ভারত অংশে যেসব সন চলিত ছিল, তার মধ্যে শকাব্দ বা শককলা, বিক্রম সম্বৎ, গুপ্তকলা, বল্লভকলা, পালাব্দ, হর্ষাব্দ ইত্যাদি অন্যতম। ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের শুরুতে মহাবীর বখতিয়ার খিলজির হাতে বাংলায় সাম্য-মানবিক শাসন কায়েমের আগে বাংলায় প্রতিষ্ঠিত ছিল লক্ষণ সম্বৎ বা লসং। সেন ব্রাম্মণ রাজা লক্ষণ সেনের নামে এই সনের নাম এবং তার আমলে এই সন মানা ও গোনা হতো। অন্যান সনের মধ্যে বিশেষভাবে বাংলায় চালু ছিল শকাব্দ বা শককলা ও বিক্রম সম্বৎ বা বিক্রমকলা। সাধারণ সন হিসেবে শকাব্দ ছিল প্রধান ও প্রতিষ্ঠিত। পাল আমলে চালু ছিল পালাব্দ।

আল বিরুনীর ভারততত্ত্বের বরাতে জানা যায়, হর্ষাব্দ ছিল রাজা হর্ষের নামে। বিক্রম সম্বৎ বা বিক্রমকলা ছিল রাজা বিক্রমাদিত্যের নামে। শককলা বা শকাব্দ ছিল সকারি বা সালিবাহনের নামে। রাজবল্লভের নামে ছিল বল্লভকলা আর গুপ্তবংশের প্রবর্তন ছিল গুপ্তকলা।

এই সনগুলো একই সময়ে একই এলাকায় মানা ও গোনা হতো না। কিছু ছিল সাধারণ আর কিছু এলাকাভিত্তিক। আল বিরুনী দাবি করেন, শ্রী হর্ষের হর্ষাব্দ চালু ছিল ভারতের কনৌজ ও মথুরায়। এই সন বিক্রমাদিত্যের ৪০০ বছর মতান্তরে ৬৬৪ বছর আগের। শকাব্দ বা শককলার শুরু বিক্রমকলার ১৩৫ বছর পর, বল্লভকলা ও গুপ্তকলার ২৪১ বছর পরে। সে হিসাবে বিক্রমকলাকে আদর্শ ধরলে এ সনগুলোর কাল দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৫৮ খ্রীষ্টপূর্ব, ৫৮ খ্রীষ্টপূর্ব, ৭৭ খ্রিষ্টাব্দ, ৭৭ খ্রিষ্টাব্দ এবং ৩১৮ খ্রিষ্টাব্দ। (বাংলা সনের জন্মকথা, মুহম্মদ আবূ তালিব, পৃষ্ঠা ১২, বাংলা একাডেমি, ১৯৭৭)

১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে মহাবীর বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মধ্য দিয়ে বৃহৎ বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় থেকে বিশ্ব মুসলিম সভ্যতার অংশ হিসেবে বাংলায় হিজরি সন গোনা শুরু হয়। মুসলিম শাসনের অধীন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ও আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে হিজরি সন সরকারি ও দাপ্তরিক সন হিসেবে প্রচলিত হয়। এই ধারা বাংলা-পাক-ভারতের মুসলিম শাসনে ব্রিটিশ উপনিবেশের আগ পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

হিজরি সনের গোনা শুরু হয় আরবের মাটিতে এবং হজরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার কাফেরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মদিনায় হিজরত করার ঐতিহাসিক সময়কাল থেকে। হিজরি সনের আগে আরবে বহু সনের প্রচলন ছিল। সাধারণ সন হিসেবে গোটা আরবে কোনো সন প্রতিষ্ঠিত ছিল কি না, সেটা নিশ্চিত করে জানা যায় না। প্রচলিত প্রায় সবগুলো সন ছিল আঞ্চলিক বা এলাকাভিত্তিক। তার মধ্যে হজরত নূহ আলাইহিস সালামের মহাপ্লাপন, পবিত্র কাবা শরিফের পুনর্নির্মাণ এবং বাদশাহ আবরাহার হাতি বাহিনী ধ্বংসের বিখ্যাত ঘটনাগুলোর স্মারক সন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আমুল ফিল বা হাতি বছর আরবের প্রতিষ্ঠিত সন হিসেবে চালু থাকার পক্ষে বেশি মত পাওয়া যায়। এশিয়ার বাইরে ইউরোপে তখন খ্রিষ্টাব্দ ব্যবহৃত হয় এবং খ্রিষ্টাব্দ শুরুর আগের সময়কালকেও খ্রীষ্টপূর্বাব্দ হিসেবে খ্রিষ্টাব্দেরই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে খ্রিষ্টাব্দ শুরুর আগে রোমানরা প্রধানত ‘Ab Urbe Condita’ (AUC) বা ‘শহর প্রতিষ্ঠার পর থেকে’ নামক বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করত। কিংবদন্তি অনুসারে ৭৫৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে রোম নগরীর প্রতিষ্ঠার সময় থেকে এটি গণনা করা হতো। এছাড়া রোমানরা সাধারণত ওই বছরের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই কনসাল বা ম্যাজিস্ট্রেটের (Consuls) নাম অনুসারে বছরের নামকরণ করত। ৪৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজার সৌর পঞ্জিকা চালু করেছিলেন, যাকে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার বলা হয়। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারকে মনে করা হয় বর্তমানে প্রচলিত ক্যালেন্ডারের ভিত্তি।

বাংলা সনের জন্ম ও সম্রাট আকবর

সম্রাট আকবর দিল্লির সিংহাসনে আসীন হন ৯৬৩ হিজরি সন মোতাবেক ৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। তার রাজত্বের ২৯তম বছরে রাজ্য পরিচালনা এবং খাজনা আদায়-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয়। বাংলা তখন মোগল সাম্রাজ্যের অধীন। হিজরি একটি চান্দ্র বছর। চাঁদের অনির্দিষ্ট হিসাবের কারণে মাসের দিনসংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। বছর থেকে বছর ঘুরে কিছুদিন পরিবর্তিত হতে থাকে। এ কারণে বছরের নির্দিষ্ট দিনে খাজনা আদায় করা মোগল সাম্রাজ্যের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সৌর সনে মাসের দিনসংখ্যা নির্দিষ্ট হওয়ায় বছরের দিন গণনা অপরিবর্তিত থাকে। ফলে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সৌর সন প্রবর্তনের দরকার দেখা দেয়।

আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায়, মোগল দরবারের কয়েকজন প্রভাবশালী এ সমস্যার সমাধানকল্পে নতুন সন প্রবর্তনের প্রস্তাব করেন। সম্রাট আকবর এ বিষয়ে সম্মত হন এবং সমাধানমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। নির্দেশনামায় বলা হয়, ‘যেহেতু ভারতে প্রচলিত সনগুলো সৌর পদ্ধতির এবং তার মাসগুলো চান্দ্র পদ্ধতির। তাই আমার নির্দেশ এই যে, প্রস্তাবিত সনটি যেন পূর্ণাঙ্গ সৌর পদ্ধতির হয়।’ (আবুল ফজল, আইন-ই-আকবরী)

বাংলা সন প্রবর্তনের দায়িত্ব দেওয়া হয় মোগল দরবারের গৌরব ফতহুল্লাহ শিরাজীকে। মহাজ্ঞানী শিরাজী সম্পর্কে মোগল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক আবুল ফজল মন্তব্য করেন, ‘যদি এমন দুর্ঘটনা কোনোদিন ঘটে যে, দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো নষ্ট হয়ে যায় আর শিরাজী সাহেব জীবিত থাকেন, তাহলে তিনি একাই তার পুনর্গঠন করতে সক্ষম হবেন।’ (আবুল ফজল, আইন-ই-আকবরী)

সম্রাটের নির্দেশনামা জারি হয় ৯৯২ হিজরি সনের ৪ রবিউল আউয়াল মোতাবেক ১০ মার্চ ১৫৫৮ খ্রিষ্টাব্দে এবং বাংলা সন কার্যকর হয় ৯৬৩ হিজরি সনের ২৮ রবিউল আখের মোতাবেক ১০ অথবা ১১ মার্চ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে। অনেকে ধারণা করে থাকেন, এই তারিখে সম্রাট আকবর সিংহাসনে আসীন হয়েছিলেন। আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায়, সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিন ছিল ২ রবিউল আখির মোতাবেক ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ। ফলে বাংলা সনের গণনা শুরুর দিনটি সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের দিন হিসেবে প্রচারিত মতটি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত নয়। বাংলা সনের গণনা শুরু হয় ১১ এপ্রিল ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১ বৈশাখ ১৪৭৮ শকাব্দে। ফলে খ্রিষ্টাব্দ থেকে বাংলা সনের বয়স মোটামুটি ৫৯৩ বছর তিন মাস ১১ দিন কম। বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ বছর যোগ করলে খ্রিষ্টাব্দের সঙ্গে মেলানো সম্ভব।

প্রশ্ন দেখা দেয়, ৯৬৩ হিজরিতে যদি বাংলা সনের জন্ম হয় তাহলে ২০২৬ পর্যন্ত বাংলা সনের বয়স হয় ৪৮৪ বছর। কিন্তু ১৪৩৩ বাংলা সন কীভাবে হলো?

বাংলা সনের জন্মতত্ত্ব ও হিজরির সঙ্গে রিশতা

জ্যোতির্বিজ্ঞানী শিরাজী মুসলিম আমলের সরকারি ও দাপ্তরিক সন হিসেবে প্রচলিত হিজরি সনকেই বাংলা সনের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে হিজরি সনের শুরুর সময়কেই বাংলা সনের শুরু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আরবি হিজরি সন চান্দ্র সন হলেও শিরাজী তাকে সৌর সনে রূপান্তর করে বাংলা সন উদ্ভাবন করেন। তাই বলা যায়, বাংলা সন হিজরি সন থেকে ভিন্ন নয়। শুধু সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আসীন হওয়ার বছরে তাকে চান্দ্র সন থেকে সৌর সনে পরিবর্তিত করা হয়েছে। বাংলায় হিজরি সন গণনার যে রীতি মুসলিম শাসনামলের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা বাংলা সনেও অক্ষুণ্ণ আছে। ফলে হিজরি ও বাংলা সন দুটিই এখন ১৫ শতাব্দী অতিক্রম করছে।

২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সনের বয়স ১৪৩৩ এবং হিজরি সনের বয়স ১৪৪৭। আর বাংলা সন যে হিজরি সন থেকে ১৪ বছর পেছনে অথবা হিজরি সন যে বাংলা সন থেকে ১৪ বছর এগিয়ে তার কারণ চাঁদের হিসাবে হিজরি সনের অনির্দিষ্টতা। হিজরি সন প্রতি বছর কয়েক দিন করে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলা সনের সঙ্গে ১৭ বছরের ব্যবধান দেখা দিয়েছে।

বাংলা সনের জন্মতত্ত্ব সম্পর্কে মুহম্মদ আবূ তালিব বলেন, ‘বাংলা ও হিজরি সন মূলত একই সন এবং একই সময়ে (৬২২ খ্রিষ্টাব্দ) একই উৎস থেকে উৎসারিত। শুধু যে হিজরি সনের সঙ্গে বিশ্বনবীর হিজরতের স্মৃতিবিজড়িত তাই নয়, বাংলা সনের ইতিহাসের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বস্তুত হিজরি সনের একটি শাখা রূপেই বাংলা সনের প্রতিষ্ঠা হয়েছে।’ (বাংলা সনের জন্মকথা, ভূমিকা)

অর্থাৎ বাংলা ও হিজরি সনের জন্ম একই সময় থেকে, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ। উভয় সন একই ঘটনার স্মৃতি ও চেতনার স্মারক হিসেবে উদ্ভাবিতÑনবীজির মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত। উভয় সনের ধারা একÑমুসলিম। চেতনা অভিন্নÑতাওহিদ বা একত্ববাদ।

নবীজির হিজরতের ৯৬৩ বছর পর সম্রাট আকবর সিংহাসনে আরোহন করেন। সে সময় থেকে বাংলায় বাংলা সন প্রচলিত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বাংলা সনের জন্ম ও উৎপত্তি নবীজির হিজরতের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বাংলা সনের প্রতিষ্ঠা ও প্রচলন সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময়ের সঙ্গে অভিন্ন। ফলে বাংলা সন একই সঙ্গে নবীজির হিজরত এবং সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের স্মৃতির স্মারক।

তবে বাংলা সনের মাস ও দিনের নামগুলো শিরাজী গ্রহণ করেছেন মুসলিমপূর্ব আমলে বাংলায় প্রচলিত শকাব্দ বা শককলা থেকে। বাংলা সনের বৈশাখ থেকে চৈত্র পর্যন্ত ১২ মাসের নাম শকাব্দের বারো মাসের নাম হিসেবে প্রচলিত ছিল। ব্যবধান হচ্ছে, শকাব্দের প্রথম মাস ছিল চৈত্র আর বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখ। বৈশাখ ছিল শকাব্দের দ্বিতীয় মাস। জানা যায়, আরো আগে বাংলায় বছর শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাস থেকে। অগ্রহায়ণ অর্থ বছরের শুরু বা আগে যে যায়। অন্য অর্থে ধান উৎপাদনের মাস।

বাংলা সনের প্রকৃতি

সম্রাট আকবর সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সনসহ আরো কয়েকটি নতুন সনের প্রবর্তন করেন আমির ফতেহ উল্লাহ বা ফতহুল্লাহ শিরাজী। বলা যেতে পারে, চান্দ্র সনগুলোকে তিনি সৌর সনে রূপান্তরিত করেন। এগুলো প্রধানত আমলী, বিলায়াতি, ফসলি বা মৌসুমি এবং সুরসান ইত্যাদি সন। (বাংলা সনের জন্মকথা, পৃষ্ঠা ৭)

সে সময় উৎপন্ন ফসলের মাধ্যমে রাজকর আদায় করা হতো। যেসব সন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট সময়ে ফসল বা ফসলি খাজনা আদায় করা, সেসব সনকে ফসলি সন বলা হতো। বাংলা সনও মূলত ফসলি সন।

বাংলা সনের বৈশিষ্ট্য

খ্রিষ্টাব্দ ও শকাব্দের মাস ও দিনের নামকরণের ক্ষেত্রে রোমান ও বাঙালি হিন্দু জ্যোতিষীরা বিভিন্ন দেবদেবীর নাম ও পুরাণ কাহিনীর আশ্রয় নিয়েছেন। অপরদিকে হিজরি সনের নামকরণের বেলায় আধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটেছে। প্রাচীন শকাব্দ ও খ্রিষ্টাব্দের ঐতিহ্যে তাই পৌত্তলিকতার ধারাবাহিকতা প্রতিফলিত। ‌শুধু হিজরি সন পৌত্তলিক ধারার বাইরে এবং সম্পূর্ণ নতুন করে তাওহিদ বা একেশ্বরবাদী বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ধারণ করে। হিজরি সন থেকে বাংলা সনের উৎপত্তি হওয়ায় বাংলা সনও ঐতিহ্য ও চেতনাগতভাবে পৌত্তলিক ধারার বাইরে একেশ্বরবাদী ধারার বিশেষ সংযোজন হয়ে ওঠে।

বাংলা সন হিজরি সন থেকে উৎপন্ন এবং বিশ্ব মুসলিম সভ্যতার অন্যতম অংশ ও আবিষ্কার। একই সঙ্গে বাংলা সনের মাস ও দিনের নাম শকাব্দ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। শকাব্দ মুসলিমপূর্ব বাংলার প্রচলিত সন। মূলত বাঙালি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে এটি ব্যবহৃত হতো এবং এটি বাঙালি হিন্দু সভ্যতার অংশ। ফলে বাংলা সন স্মৃতি, ইতিহাস ও আত্মার দিক থেকে মুসলিম সভ্যতার অংশ। আবার বাহ্যিক দিক থেকে বাঙালি হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে তার আত্মীয়তা আছে।

মুহম্মদ আবূ তালিব মন্তব্য করেন, ‘হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করা হলেও এর গঠন পদ্ধতি ভারতীয় শকাব্দের মতো। এটি শকাব্দেরও সমগোত্রীয় নয়।’ (বাংলা সনের জন্মকথা, পৃষ্ঠা ৭)

মোবারক আলী খান মন্তব্য করেন, ‘বাংলা সন পুরাণ কাহিনির মারমেইড নামক সেই যন্ত্রের মতো, যার দেহের নিম্নাংশ মাছের মতো এবং ঊর্ধ্বাংশ ঠিক যেন স্ত্রীলোকের মতো।’ (বাংলা মাসের জন্মকথা, মোবারক আলী খান, দ্বিতীয় সংস্করণ, খুলনা, পৃষ্ঠা ১২, প্রকাশ ১৯৫৪)

বাংলা সনের স্তর ও যুগবিন্যাস

বাংলা সনের জন্ম থেকে বর্তমান পর্যন্ত গোটা সময়কালকে তিনটি স্তর বা যুগে ভাগ করা যেতে পারেÑ

১. জন্ম থেকে ৯৬৩ হিজরি মোতাবেক ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এ স্তরকে বলা যায় আদি স্তর বা শুরু যুগ। এই স্তরে হিজরি ও বাংলা সন একই নিয়মে সমান্তরালভাবে চলেছে।

২. ১৫৫৬ খ্রিষ্টব্দ থেকে ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। এ স্তরকে বলা যায় মধ্য স্তর বা সংস্কার যুগ। এ স্তরে হিজরি ও বাংলার গতিপথ বদলে গেছে। হিজরি চান্দ্র সন হিসেবে জারি থাকলেও বাংলা সৌর সনে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৬৬ সনে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে এবং ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে বাংলা পঞ্জিকা বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংস্কার করা হয়।

৩. ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। এ স্তরকে বলা যায় চূড়ান্ত স্তর বা প্রতিষ্ঠা যুগ। ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমির সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলা সন একটি নির্দিষ্ট কাঠামো লাভ করে এবং বাংলাদেশে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলা একাডেমির উদ্যোগে সংস্কার

সুলতানী আমলে বাংলায় সরকারি ও দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হতো হিজরি সন। মোগল আমলে শুরু হয় বাংলা। ইংরেজ আমলে শহরে সরকারি কাজকর্ম চলত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু বাংলার গ্রামগঞ্জে জমিদারের খাজনা, পুণ্যাহ, হালখাতা ইত্যাদি চলত বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী। তখন বাংলা মাসের দিনসংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল না। কখনো ৩০, ৩১ এমনকি ৩২ দিনেও মাস হতো। কালের বিবর্তনে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বেশকিছু জটিলতা দেখা দিতে থাকে। পঞ্জিকা প্রণেতা ও জ্যোতির্বিদদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বাংলা বর্ষপঞ্জি। বাংলা ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করাও প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কবে কোন মাস শুরু হবে, কবে কোন বছর শুরু হবে; তা আগে থেকে বলার উপায় থাকে না।

এ অবস্থায় ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদদের সমন্বয়ে ‘বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার উপসংঘ’ গঠন করে। এই উপসংঘের সভাপতি ছিলেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। সদস্য ছিলেন বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য অধ্যাপক এমএ হামিদ, শ্রীযুক্ত শতীশচন্দ্র শিরোমণি জোতির্ভূষণ, শ্রীযুক্ত অবিনাশচন্দ্র কাব্য জোতিষতীর্থ, শ্রীযুক্ত তারাপদ ভট্টাচার্য। এমএ হামিদ এই সভায় নিয়মিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন।

উপসংঘের আলোচনায় সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়Ñ

‘‘(১) যেহেতু রাশি, নক্ষত্র এবং ঋতুর সঙ্গে বাংলা মাসের পর্যায়ক্রম নির্ণয় করা হয়, সেজন্য বৈশাখ মাস ১ এপ্রিল হইতে গণনা করা সম্ভবপর নহে। (২) ইংরেজি মাস ২৮, ৩০ কিংবা ৩১ দিনে হয়; কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্তে বাংলা মাস গণনার সুবিধার জন্য বৈশাখ মাস হইতে ভাদ্র মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩১ দিন হিসাবে গণনা করা হইবে। (৩) অতিবর্ষে ‘লিপ ইয়ারে’ চৈত্র মাস ৩১ দিনে হইবে। ৪ দ্বারা যে মাস বিভাজ্য তাহাই অতিবর্ষ বলিয়া পরিগণিত হইবে। (৪) মোগল আমলে বাদশাহ আকবরের সময় যে বঙ্গাব্দ প্রচলিত করা হইয়াছিল, তাহা হইতেই বৎসর গণনা করিতে হইবে এবং সেই হিসাবে আগামী ১ বৈশাখ হইবে ১৩৭৩ বাংলা সন। (৫) বাংলা একাডেমির তরফ হইতে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তানুযায়ী ১৩৭৩ সনের জন্য একটি দেওয়ালপঞ্জি তৈয়ার করিতে হইবে।’ (বাংলা সনের জন্মকথা, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৮)

উপসংঘের সুপারিশ পেশকালে একাডেমির পরিচালক ছিলেন ডক্টর কাজী দীন মুহম্মদ। তার মেয়াদকাল ছিল ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত। এ সময়ে এই দেয়ালপঞ্জি প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর কখনো বর্ষপঞ্জি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

শহীদুল্লাহ পঞ্জিকা

এর পরেও বাংলা সনের লিপইয়ার (অতিবর্ষ বা বড় বছর) সমস্যা অমীমাংসিত ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়বাহী বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন অনুভব করেন ডক্টর শহীদুল্লাহর ছেলে ভাষাসংগ্রামী মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি বাংলা প্রচলিত বর্ষপঞ্জি সংস্কারের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তার দৃষ্টিতে শহীদুল্লাহ কমিটি প্রণীত বর্ষপঞ্জিতে কিছু দুর্বলতা ছিল। সবচেয়ে বড়টি ছিল যে, লিপইয়ার গণনা পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট ছিল না। ছিল ৪০০ বছর পরে পহেলা বৈশাখ তিন দিন সরে যাওয়ার আশঙ্কাও।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘১৯৮৮-৮৯ সালে ১৩৯৫ বঙ্গাব্দে বাংলাদেশে একটি সমন্বিত বিজ্ঞানসম্মত বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের কথা আমি বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতে থাকি। অন্য অনেক ব্যক্তিও এ বিষয়ে লেখালেখি করতে থাকেন। ফলে বিষয়টি বিবেচনার জন্য বাংলা একাডেমি একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে আমার এবং অন্যান্যের দেওয়া প্রস্তাব বিবেচনা করে। পরে আমার প্রস্তাব গ্রহণ করে শহীদুল্লাহ কমিটির লিপইয়ার-সংক্রান্ত প্রস্তাবের সংস্কার করা হয়।’ (শহীদুল্লাহ পঞ্জিকা, মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, আমার দেশ বাংলা নববর্ষ ১৪৩২ ক্রোড়পত্র, ২০২৫) বাংলাদেশ সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুমোদন করে ১৯৯৬ সালে বঙ্গাব্দ ১৪০২-১৪০৩ বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করে। এর নাম দেওয়া হয় ‘শহীদুল্লাহ পঞ্জিকা’। এখন যে সরকারি বাংলা বর্ষপঞ্জি চালু আছে, তাতে খ্রিষ্টীয় সাল ও বঙ্গাব্দের মাসগুলোর তারিখ সব সময়ের জন্য নির্দিষ্ট। ফলে প্রতি বছরই ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ। একই ভাবে অন্যান্য মাসের তারিখও স্থির। এর ফলে বাংলা তারিখ সর্বস্তরে ব্যবহার করা সহজ এবং ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলা তারিখ বাধ্যতমূলক করাও সম্ভব।

ফেলে আসা নববর্ষ

‘গাঙাড়ি’ থাইকা বাঙলা

উৎসবের রাজনীতি, অর্থনীতি ও দর্শন

ভুলে যাওয়া সূর্যের জীবন

বাংলার মুর্শিদি গান

বৈশাখে ইলিশকাণ্ড

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস

বৈশাখের বিবরণ

পহেলা বৈশাখ

বাংলার হারানো সনের কথা