হোম > মতামত

আরব শাসকরা যখন ফিলিস্তিনিদের শত্রু

আহমদ রশিদ বিন সাঈদ

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গত মাসে দেওয়া এক ভাষণে হামাসের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সংগঠনটির সদস্যদের ‘কুত্তার বাচ্চা’ বলে গালি দেন। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই ভাষণে তিনি অবিলম্বে হামাসকে অস্ত্র সমর্পণ করার এবং অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।

হামাসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ এমন ভাষণ দেওয়ার প্রায় দুই বছর আগে ২০২৩ সালের মে মাসে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে মাহমুদ আব্বাস কী বলেছিলেন, সে কথা হয়তো তিনি ভুলেই গেছেন। জাতিসংঘে দেওয়া ওই ভাষণে তিনি দখলদারদের হাত থেকে ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করার জন্য ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের’ প্রতি আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্ববাসী, আমাদের রক্ষা করুন।’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমরা কি মানুষ নই?’ এমনকি পশুকেও নিরাপত্তা দেওয়া উচিত। আপনাদের যদি কোনো পশু থাকে, সেটাকে আপনারা কি নিরাপত্তা দেবেন না?’

গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলি মিডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধপরবর্তী গাজার পুনর্গঠন নিয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে যে পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছিল তাতে মূল কথা ছিল, হামাসকে নিরস্ত্র এবং গাজার ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে হবে। আরব ও আমেরিকার সূত্রগুলো ইসরাইলি হায়োম সংবাদপত্রকে জানিয়েছে, হামাস নিরস্ত্র হবে এবং যুদ্ধপরবর্তী গাজার শাসনব্যবস্থায় তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না—এমন নিশ্চয়তা না পেলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রমে অর্থনৈতিক বা অন্য কোনোভাবেই যুক্ত হবে না।

এরপর গত মার্চ মাসে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা উপত্যকার সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে নিরস্ত্র করার পাশাপাশি হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শাখার তিন হাজার নেতৃস্থানীয় সদস্যকে গাজা থেকে নির্বাসনে পাঠানোর একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এরপর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে মিসর গাজায় অস্ত্র বিরতির যে প্রস্তাব দেয়, হামাস প্রতিনিধিদলের কাছে তাতে হামাসের অস্ত্র পরিত্যাগ বা নিরস্ত্রীকরণের দাবিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মাহমুদ আব্বাস থেকে শুরু করে প্রভাবশালী আরব দেশগুলোর পক্ষ থেকে হামাসের অস্ত্র সমর্পণের যে দাবি বারবার উত্থাপন করা হচ্ছে, তাতে গাজার প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর প্রতি আরব শাসক ও রাজনৈতিক নেতাদের বৈরী মনোভাবের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। তাদের এই মনোভাব থেকে মুক্তি সংগ্রামের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ও বৈধ যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসে, তা হলো—অধিকৃত এলাকার মানুষের কি দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার অধিকার আছে? বর্বর সামরিক দখলদারদের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাহীন নিরস্ত্র মানুষ কী করে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে?

অব্যাহত ইহুদিবাদী আগ্রাসনের মুখে আরব শাসকরা এবং অবশিষ্ট বিশ্ব যখন ফিলিস্তিনিদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তখন এই দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো ও অবরোধ প্রত্যাহারের আর কি কোনো উপায় আছে? গাজার প্রতিরোধ সংগঠনগুলোকে নিরস্ত্র করার দাবি পশ্চিমাদের সন্তুষ্ট করার ও ইসরাইলি আগ্রাসনকে পুরস্কৃত করার একটি ব্যবস্থা মাত্র। এ ধরনের দাবি ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আরব শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা করার দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু নয়।

যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আরব শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা এখন তাদের আত্মতুষ্টিতে পরিণত হয়েছে। এর মূল কারণ তাদের অক্ষমতা নয়, বরং এটা ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনারই অংশ। কারণ সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা আরব বিশ্বের শাসকদের শাসনের বর্তমান ধারাকে চ্যালেঞ্জ ও হুমকির মুখে ফেলবে। সেজন্যই তারা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইল দখলদারিত্ব বজায় রাখতে চায়।

ইহুদি ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাসে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত উপস্থিত হয়েছিল, যেখানে আরব শাসকদের ক্ষেত্রে সুযোগের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থবহ হস্তক্ষেপ করে ইহুদিবাদী দখলদারিত্বের প্রকল্পকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব ছিল। কিংবা অন্তত তাদের আগ্রাসনের গতিকে শ্লথ করে দেওয়া যেত। কিন্তু আরব শাসকরা এর কোনোটিই না করে বরং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করার পথ বেছে নিয়েছে।

এর প্রথমটি ঘটে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের প্রথম নাকবা বা মহাবিপর্যয়ের সময়, যখন ফিলিস্তিনের ধ্বংসস্তূপের ওপর ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে শক্ত জেরুজালেমসহ কয়েকটি এলাকায় শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললেও আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। সিরিয়াসহ কয়েকটি আরব দেশ সেসময় ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো। কিন্তু তাদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই ব্যর্থ হয় ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ যুদ্ধ। ইসরাইলের সংবাদপত্র দ্য হারেতজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের মরণপণ লড়াইয়ে আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। তাদের এই বিশ্বাসঘাতকতা ফিলিস্তিনিদের ইতিহাসে অন্যতম মহাবিপর্যয় ডেকে আনে।

এরপর ফিলিস্তিনিদের জন্য দ্বিতীয় মহাবিপর্যয় ডেকে আনেন মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেন এবং ফিলিস্তিনের ৮০ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর ইসরাইলের ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বকে বৈধতা প্রদান করেন। মিসরের এই বিশ্বাসঘাতকতা ফিলিস্তিনিদের আরো বেশি বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে এই বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে মিসর ইসরাইলের দখল করা সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশ ফেরত পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বার্ষিক একটি অনুদান পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে মিসর কার্যত ফিলিস্তিন ইস্যুকে পরিত্যাগ করে এবং জেরুজালেম, গাজা উপত্যকা ও পশ্চিমতীরকে ইসরাইলের দখলদারিত্বে ছেড়ে দেয়। একই সঙ্গে এই চুক্তির মাধ্যমে মিসর ফিলিস্তিন নিয়ে আরব-ইসরাইল সংঘাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।

ইসরাইলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে মিসর জর্ডানসহ অন্য আরব দেশগুলোকেও একই পথ অনুসরণে প্ররোচিত করে। কারণ মিসরের পর মার্কিন চাপে জর্ডানও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথ বেছে নেয়। ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরব রাজা-বাদশাহ, আমিরসহ সব শাসকই কার্যত ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের নীতি থেকে সরে আসেন। বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের স্বার্থে এটাকেই তারা সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করতে থাকেন।

এরপর ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগ্রামের মূল সংগঠন প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশনের (পিএলও) প্রধান হিসেবে ইয়াসির আরাফাত ইসরাইলের সঙ্গে অসলো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তার এই চুক্তির মাধ্যমে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিমতীরের কিছু অংশ নিয়ে ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়, যার প্রেসিডেন্ট হন ইয়াসির আরাফাত। এই চুক্তির মাধ্যমে কার্যত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। এ সম্পর্কে ইসরাইলি বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ সেথ আনজিসকা তার ‘প্রিভেনটিং প্যালেস্টাইন : এ পলিটিক্যাল হিস্টোরি ফ্রম ক্যাম্প ডেভিড টু অসলো’ বইয়ে বলেছেন, ‘এই চুক্তিগুলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাগুলো তিরোহিত করার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব চুক্তি বরং তাদের স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।’

মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : মোতালেব জামালী

এমবি

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়

নতুন প্রধানমন্ত্রীর শুরুটা কেমন হলো

কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বাংলাদেশের বন্ধু

কৃষি পর্যটন : টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত