শেখ হাসিনা প্রবর্তিত দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে রুখে ওঠা ছাত্র-জনতার জুলাই-’২৪ অভ্যুত্থানের প্রধান দাবি ছিল, নতুন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের উত্থান রহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রথম মহাযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের কারণগুলো ব্যারিংটন মুর তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Social Origin of Dictatorship and Democracy’-তে প্রাঞ্জলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেছেন, সমাজে বিভিন্ন শ্রেণিগত দ্বন্দ্ব, সহনশীলতার অভাব, অভিজাত শ্রেণির প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দমন করে রাখার জন্য শক্তি প্রয়োগ প্রভৃতি একনায়কতত্ত্বের জন্ম দেয় এবং দীর্ঘ সময়ের মাঝে তা ফ্যাসিইজমের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে ফ্যাসিইজমের উত্থানের পটভূমিতে আমরা দেখতে পাই নৈতিকতাবিবর্জিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সুবিধাবাদী সুশীল সমাজ, জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া শ্রেণির অভাব, শাসকশ্রেণির মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব, রাজনীতি ও সামাজিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিপূজার প্রাধান্য, সিভিল-মিলিটারি কুলীনতন্ত্রের বন্ধন, অগণতান্ত্রিক সংবিধান প্রভৃতি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ উত্থান রহিতকরণ একটি জটিল প্রক্রিয়া। এ সমাজকে পরিবর্তনে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনিস্বীকার্য। তাই ফ্যাসিবাদ রহিতকরণ শুরু করা যেতে পারে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের দ্বারা, যে সংবিধানে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করাকে রহিত করা হবে ক্ষমতার ভারসাম্যের মাধ্যমে, যেটি ১৯৭২ সালের সংবিধানে অনুপস্থিত ছিল এবং যার ফলে দেশে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছিল।
এই ’৭২ সংবিধানকে সংযোজন ও বিয়োজনের দ্বারা একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানে পরিণত করার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করেছে প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে ড. আলী রীয়াজ কিছু বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি এই সুপারিশমালায় কী লিখেছেন, সেগুলো পুরোপুরি বলেননি। শুধু কিছু চুম্বক পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। এই চুম্বক পয়েন্টগুলোর মধ্যে সুপারিশ করেছেন দ্বী-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট, সত্তরের অনুচ্ছেদ সংস্কার, একজন ব্যক্তি কয়টি মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন কি না প্রভৃতি।
যে পয়েন্টগুলো তিনি বলেছেন, সেগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের বেশিরভাগ অংশ যেটা বলেছে, সেটার প্রতিফলন রয়েছে এবং প্রস্তাবিত সুপারিশমালায় ক্ষমতার ভারসাম্য রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে।
কিন্তু একটা চুম্বক পয়েন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্ট উভয়ই সরাসরি জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হবে। এটাতে আসলে তিনি কী অর্থ বোঝাতে চেয়েছেন? কারণ পার্লামেন্টারি সিস্টেমে রাষ্ট্রপতি কখনোই সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। রাষ্ট্রপতি সবসময় অপ্রত্যক্ষ ভোট, অর্থাৎ যারা সংসদ সদস্য রয়েছেন, তাদের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে থাকেন বা অন্য কোনো রকম পদ্ধতির দ্বারা। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি সবসময়ই অপ্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন।
সরাসরি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া মানেই সেটা আর পার্লামেন্টারি সিস্টেম থাকে না, তখন সেটা প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম হয়ে যায়। যেরকম আমেরিকাতে রয়েছে। আরেকটা সিস্টেমের কথা তিনি বোঝাতে পারেন, সেটা হচ্ছে ফ্রেঞ্চ সিস্টেম যেটা ফিফথ রিপাবলিক বলে পরিচিত। ফ্রান্সের যে সংবিধানটা আছে, সেখানে রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্ট জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হয় এবং এটাকে সেমি-প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম বলা হয়। আমেরিকার মতো পুরোপুরি প্রেসিডেন্সিয়ালও নয়, আবার ইন্ডিয়া বা ব্রিটেনের মতো পার্লামেন্টারিও নয়।
সংবিধান সংস্কার কমিশন ১২৩টা সংবিধান পর্যালোচনা করে এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, ভবিষ্যৎ সংবিধানে রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্ট সরাসরি নির্বাচিত হবে। তাহলে তিনি যদি পার্লামেন্টারি বা প্রেসিডেন্সিয়াল বা সেমি-প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমে চলে যেতে চান, তাহলে তাকে সংবিধানকে পুনর্লিখন করতে হবে।
প্রশ্ন হলো কোন জাতীয় প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের কথা তিনি বলতে চাচ্ছেন? বাংলাদেশে সর্বপ্রথম প্রেসিডেনশিয়াল সিস্টেম চালু করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমে তার ক্ষমতা সীমিত করার কোনো পন্থা ছিল না।
তিনি সংবিধানে সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে একীভূত করে ফেলেছিলেন, ফলাফল ফ্যাসিইজমের উত্থান। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর দ্বারা পরিবর্তন করে সেটিকে একটি মোটামুটি গণতান্ত্রিক সংবিধানে পরিণত করেছিলেন এবং এটাও ছিল একটা প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম। তবে এটা পুরোপুরি আমেরিকা ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের মতো ছিল না।
অনেকেই মনে করেন জিয়াউর রহমানের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা অনেকটাই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের মতো ছিল। এখনেও রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্ট সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। কিন্তু সেখানে সমস্যা যেটা ছিল সেটা হলো, পার্লামেন্টকে বাইপাস করে রাষ্ট্রপতির কাছে কতগুলো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল ।
মানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ওপরে পার্লামেন্টের কোনো চেক (Check) ছিল না। সেখানে তাহলে রাষ্ট্রপতি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যেতে পারতেন। এরশাদও একই সংবিধানের দ্বারা দেশ চালিয়েছেন। তার পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৯১ সালে আবার বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি সিস্টেমে ফিরে এসেছিল।
কিন্তু ড. আলী রীয়াজের ভাষ্যে মনে হচ্ছে, তিনি হয়তো পার্লামেন্টারি সিস্টেম ছুড়ে ফেলে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের কথা বলেছেন। এমন ঘটনা অবশ্য পৃথিবীর অনেক দেশেই ঘটেছে। পরিবর্তিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যেকোনো দেশই সিস্টেম পরিবর্তন করে থাকে। যেমন করেছে ফ্রান্স, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক। এ দেশগুলো পার্লামেন্টারি সিস্টেম ছুড়ে ফেলে দিয়ে প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম গ্রহণ করেছে।
তবে মূল বিষয় হলো যখনই রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্ট সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন তখনই আমরা দুটো পাওয়ার সেন্টার বা কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করব। এই কেন্দ্রবিন্দুগুলো কীভাবে একে অপরকে চেক করবে, সেটাই দেখার বিষয় । যেরকম আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেস (আইন সভা) সরাসরি নির্বাচিত হয় এবং সেখানে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে চেক করে কংগ্রেস।
কংগ্রেসের ভেতরে আবার উচ্চকক্ষ (সিনেট) ও নিম্নকক্ষ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ) একে অপরকে চেক (check) করে এবং রাষ্ট্রপতিকে চেক করে। রাষ্ট্রপতি আবার কংগ্রেসের অনেক ক্ষমতাকে চেক করে। জুডিশিয়ারি আবার রাষ্ট্রপতি ও কংগ্রেসের ক্ষমতাকে চেক করে। এরকম বিস্তারিত চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের (check and balance) দ্বারা রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের ক্ষমতা সীমিত করে রাখা হয়।
কিন্তু ফ্রেঞ্চ সিস্টেমে এটা অনেকটা ওভারল্যাপিং। যেরকম রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্ট সরাসরি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয় ঠিকই, কিন্তু এটি প্রেসিডেন্সিয়াল ও পার্লামেন্টারি সিস্টেমের একটি সম্মিলন। কিন্তু ফ্রান্সের কনস্টিটিউশনে বিভিন্ন উপায়ে বা বিভিন্ন মেকাজমিজমের দ্বারা তারা রাষ্ট্রপতি ও পার্লামেন্টের পরস্পরের ক্ষমতাকে সীমিত করে রাখে। এছাড়া ফ্রান্সের সংবিধানে অনেকগুলো কনস্টিটিউশনাল বডি এক্সিকিউটিভকে কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ করে।
গভর্নমেন্টটা চালায় পার্লামেন্ট, যেখানে একজন প্রাইম মিনিস্টার আছে, একজন কাউন্সিল অব মিনিস্টার আছে। তারাই গভর্নমেন্টের সবকিছু চালায়। এছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেটার দ্বারা রাষ্ট্রপতি ফ্রান্সের মূল অনেকগুলো পলিসি, অর্থাৎ ফরেন পলিসি থেকে শুরু করে জাতীয় নীতিমালা প্রভাবিত করতে পারে। জিয়াউর রহমানের প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমটা অনেকটা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের মতো ছিল।
সেখানে পার্লামেন্ট ছিল, রাষ্ট্রপতিও ছিল। কিন্তু পুরোপুরি ফ্রান্সের মতো ছিল না। জিয়াউর রহমানের কনস্টিটিউশনে রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টকে কন্ট্রোল করতে পারতেন, যেটা ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি পারেন না। এসব ক্ষেত্রেই সংবিধান রচনাকারীদের ভাবনা ছিল একটি স্থিতিশীল কিন্তু জবাবদিহিমূলক সরকার তৈরি করা।
মূল কথা হলো যে, যদি ড. আলী রীয়াজ প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের কথা ব্যক্ত করে থাকেন, তাহলে কি তার চিন্তাধারা যুগান্তকাল ধরে চলা সংবিধানের রচনাকারীদের সামনে জটিল সমস্যা—কেমন করে একটি স্থিতিশীল সরকার ও একই সময়ে ক্ষমতার ভারসাম্য এনে ফিক্সড টার্ম রাষ্ট্রক্ষমতার চালিকাশক্তিকে সীমিত করে রাখার সমাধান খোঁজা।
যদি সেই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেমের কথা বলেন, তাহলে তো সংবিধান পুনর্লিখন করতে হবে। পুনর্লিখন করলে তিনি কোন মডেলটা ফলো করতে যাচ্ছেন? আমেরিকান মডেল নাকি ফ্রান্স মডেল? নাকি অন্য কোনো মডেল এখানে আনতে চাচ্ছেন? এ ব্যাপারগুলো পরিষ্কার করে দিলে জাতি উপকৃত হবে।
লেখক: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতি বিশ্লেষক
এমবি