খানের আখ্যান
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ধন্যবাদ। বিশেষ করে ধন্যবাদ দলটির বর্তমান কার্যত শীর্ষনেতা তারেক রহমানকে। কেন ধন্যবাদ তা খুলে বলছি। যারা আমার লেখা পড়েন তারা জানেন, এই কলামেই গত ৭ মার্চ ‘রাজার দল নাকি দলের রাজা’ শিরোনামে লিখেছিলাম : ‘হাসিনা রেজিমের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী দল ও শক্তিগুলোর সমন্বয়ে নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কাজেই নির্বাচনের আগে আন্দোলনকারী দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতার উদ্যোগ নিতে বিএনপির আপত্তি থাকার কথা নয়। সেই বিবেচনা থেকে আমার প্রস্তাব, বিএনপি ছাত্রদের নতুন দলসহ আন্দোলনকারী দল-সংগঠনগুলোর একটি জাতীয় কনভেনশন আহ্বান করতে পারে।’
আমার এ আহ্বানের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। তেমন কোনো কনভেনশন বিএনপি আহ্বান করেনি। বরং বিভিন্ন দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে নানা বিষয়ে উত্তেজনাকর বক্তব্য বিনিময়ে পরিস্থিতি বেশ খানিকটা অস্থির হয়ে উঠেছিল। অনৈক্যের জোর দমকা হাওয়া বইতে শুরু করেছিল। একটা অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার অশনিসংকেত দেখা যাচ্ছিল। এরই মধ্যে গত ১৯ মার্চ বুধবার বিএনপি রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিজ ক্লাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সম্মানে আয়োজন করে এক ইফতার মাহফিলের। এটি হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ডান-বাম নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের মিলনমেলায় পরিণত হয়। আর এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে মধ্যপন্থি উদার গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপি সব দলের কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে। এই অরাজনৈতিক ও সৌজন্যমূলক ‘গেট টুগেদার’ দিয়েই বিএনপি রাজনীতির হাওয়া পুরোই ঘুরিয়ে দিয়েছে। ঝড়ো হাওয়াকে স্বস্তির হাওয়ায় পরিণত করেছে। মাত্র দু-তিন ঘণ্টার স্বল্পস্থায়ী ইফতার মাহফিলই যেন রাজনৈতিক দলগুলোর এক মিনি পলিটিক্যাল কনভেনশনে পরিণত হয়েছিল। গেম চেঞ্জার এই ইভেন্টের জন্যই আমি বিএনপিকে ধন্যবাদ দিয়েছি। তারেক রহমান এই ইন্তেজামকে খুব প্রজ্ঞাপূর্ণভাবে ব্যবহারের ‘ম্যাচিউরিটি’ দেখাতে পারায় তার জন্য বরাদ্দ বিশেষ ধন্যবাদ।
এর আগে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ধর্মীয় আবহের আরেকটি অনুষ্ঠানও রাজনৈতিক সমঝোতা স্থাপন ও ইসলামের মডারেট রূপকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজনে ছাত্রদলের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে পবিত্র রমজান উপলক্ষে কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ছাত্রীরাও অংশ নিয়ে চমৎকার পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে। বিধিনিষেধের অর্গল ভেঙে মেয়েদের এভাবে কালামে পাক থেকে তিলাওয়াতের প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসার সুযোগ দিয়ে ছাত্রদল মডারেট ইসলামি কালচার ও আকিদার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি প্রধান ছাত্র সংগঠনের এমন আয়োজন প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে এক সৃজনশীল অভ্যুত্থান বলা চলে। এটি তারেক রহমানের ভাবনাপ্রসূত বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
তিন দিনের এই হিফজুল কোরআন ও কোরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করা হয়েছিল বিএনপির কোনো নেতাকে নয়; বরং অন্য একটি ইসলামি দলের নেতাকে। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বিএনপির, বিশেষ করে খালেদা জিয়ার দেশপ্রেমিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এতে এই অনুষ্ঠানটি ঘিরে রাজনৈতিক সমঝোতার এক বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। এরপর আসে বিএনপির গত বুধবারের ইফতার মাহফিল।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে এই মাহফিলে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রায় সব দলের নেতাই সেখানে বক্তৃতা করার সুযোগ পান। সাম্প্রতিককালে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র-তরুণদের গড়া নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে নানা বিষয়ে বিএনপির তির্যক বাক্যবিনিময় চলছিল। সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে ওই উভয় দলের নেতাদেরও মাহফিলে বক্তৃতা করার সুযোগ দেওয়া হয়। তারা সবাই ঐক্য ও সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দেন। বয়ে যায় স্বস্তির সুবাতাস।
এনসিপির তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা সব সময় এমন এক বাংলাদেশ প্রত্যাশা করেছি, যেখানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, নীতিগত পার্থক্য, সমালোচনা থাকবে। কিন্তু সবাই একসঙ্গে বসতে পারব, আলোচনা করতে পারব দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে।’ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যখন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে বসার মতো অবস্থা থাকে না, রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরে যদি অনৈক্য তৈরি হয়, সেখানে অরাজনৈতিক শক্তিগুলো সুযোগসন্ধানী হয়ে ওঠে।’
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশ একটা পরীক্ষার মধ্যে অগ্রসর হচ্ছে। ৫ আগস্টে আমরা একটি বিশাল সফলতা পেয়েছিলাম। তার মূল ছিল সব শ্রেণির মানুষের ঐক্য। আমি মনে করি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে একটি সুন্দর সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ার জন্য এখনো জাতীয় ঐক্যই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। এই ঐক্য রেখেই যার যার জায়গা থেকে যেটি প্রয়োজন, সেটি অবশ্যই আমরা এখানে ইমপ্লিমেন্ট করার চেষ্টা করব। জামায়াতের পক্ষ থেকে চারটি পয়েন্টে জাতীয় ঐক্যের জন্য আমি সবার কাছে অনুরোধ জানাই। এক. বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, এখানে কোনো আপস হবে না, দুই. একটি টেকসই গণতন্ত্র, তিন. একটি ফেয়ার নির্বাচন ও চার. দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।’
মাহফিলের সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের ওপর জোর দেন। তিনি তার দলের ৩১ দফা কর্মসূচি এবং দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের তাগিদের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেন।
প্রধান অতিথির ভাষণে তারেক রহমান সময়ের সেরা বক্তব্যটি দিয়েছেন। লন্ডন থেকে মাহফিলে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তারেক রহমান বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীদের অপতৎপরতা এবং চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে উগ্রবাদী জনগোষ্ঠী এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদী অপশক্তি দেশে আবার গণতন্ত্রের কবর রচনা করবে। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক বিশ্বে ইমেজ সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশ। দেশের অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চরিত্র সমুন্নত রাখতে চরমপন্থা এবং ধর্মীয় উগ্রবাদী অপশক্তিতে প্রতিহত করার পাশাপাশি গণহত্যাকারী পলাতক মাফিয়া চক্রকে যেকোনো মূল্যে বিচারের সম্মুখীন করার মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা শক্তিশালী করাই হবে বিএনপিসহ গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির আগামী দিনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, শুধু একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যই মাফিয়া সরকারের পতন ঘটেনি-এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও আরো চরম সত্য হয়তো একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন না করার জন্যই মাফিয়া সরকারের নির্মম পতন হয়েছিল। সুতরাং একটি নির্বাচনকে শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করার অবকাশ নেই। প্রতিটি সফল ও কার্যকর নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চুক্তি নবায়িত এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের মালিকানা সম্পর্ক গভীরতর হয়।
তিনি বলেন, বিএনপিসহ প্রতিটি রাজনৈতিক দল মনে করে, সংস্কার এবং নির্বাচন উভয়টি প্রয়োজন। সুতরাং সংস্কার এবং নির্বাচনকে মুখোমুখি দাঁড় করার কোনোই প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতিব্যবস্থাকে শক্তিশালী এবং কার্যকর করার উপায় শুধু সংস্কারের ওপরে নির্ভর করে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নীতি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয় প্রতিদিনের গণতান্ত্রিক চর্চার ওপরে। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদরাই রাষ্ট্র এবং সরকার পরিচালনা করেন। জনগণের বিচার বুদ্ধির ওপরে আস্থাহীনতার প্রয়াস শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থাকে দুর্বল এবং প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের সবার চিন্তাভাবনা হয়তো এক নয়। আমাদের মধ্যে ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তা রয়েছে, ভিন্ন দল-মত-দর্শন রয়েছে। তবে মতে ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু সবাই একসঙ্গে বসেছি। এটাই আমাদের বাংলাদেশ। এটি আবহমানকালের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতিফলন। তবে দুঃখজনকভাবে গত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণে দেশের শুধু শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি-এসব কিছুকেই ধ্বংস করে দেয়নি, বরং বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। সামাজিক সম্প্রীতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে নষ্ট করে দিয়েছে।’
তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে বাংলাদেশি জাতির অস্থির এক ক্রান্তিকালে আমার কাছে সময়ের ম্যাগনাকার্টা বলে মনে হয়েছে। অবিমৃশ্যকারী রাজনীতিকদের হঠকারী ও দায়িত্বহীন উক্তি সম্প্রতি সংঘাত ও অনিশ্চয়তার যে কালো মেঘ সৃষ্টি করেছিল, এই মাহফিল তা উড়িয়ে দেবে বলে আশা করি। সংস্কার ও নির্বাচন ঘিরে যে দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, তারও নিরসন হবে বলে মনে হয়। বিএনপির পরিকল্পিত নির্বাচনোত্তর জাতীয় সরকারের একটা ছবি ওই ইফতার মহফিলে ফুটে উঠেছে। তাদের সবাইকে নিয়ে বিএনপি নিজেকে কেন্দ্রে স্থাপন করে যদি আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি নির্বাচিত জাতীয় সরকার গঠন করতে পারে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যে আগামী বাংলাদেশের ব্যাপারে একটি মিথস্ক্রিয়া সম্ভব হয়, তাহলে রচিত হবে অনন্ত সম্ভাবনার এক নয়া ইতিহাস। ডান ও বামপন্থা নয়, মধ্যপন্থি মডারেট রাজনীতিই বাংলাদেশের জন্য সঠিক পথ-সিরাতুল মোস্তাকিম। ডান ও বামদের দুই পাশে রেখে মধ্যপন্থি বিএনপিকে কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে। অহেতুক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও খোঁচাখুঁচির বালখিল্যতা ছেড়ে বিএনপি নেতাদের একুশ শতকের জটিল বিন্যস্ত সময়ে ম্যাচিউর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নীতিনির্ধারণী বিষয়ে হরেদরে সবাইকে মন্তব্য করা থেকে বিরত রাখতে হবে। কাউকে দূরে না ঠেলে ডান-বাম সব দল ও তরুণদের নেতৃত্ব দিতে হবে বিএনপিকে। বুধবারের একটি ইফতার মাহফিল আমার মধ্যে জাগ্রত করেছে সেই আশাবাদ। এটা কি অতিরিক্ত বা অসম্ভব কোনো আশাবাদ? সময়মতো বিএনপিই শুধু পারবে এ প্রশ্নের জবাব দিতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক
ই-মেইল : mrfshl@gmail.com