প্রথম দিন থেকে বলে আসছি, একমাত্র শহীদরা ছাড়া যারা এই আন্দোলনের ক্রেডিট দাবি করবে—বুঝতে হবে তারা এই আন্দোলনের স্পিরিটের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এখন জীবিত আর কারো ক্রেডিট নেই, আছে শুধু দায়িত্ব। আজ আবার অতি সংক্ষেপে কয়েকটা পয়েন্ট বলতে চেষ্টা করব। আশা করি, মনোযোগ দিয়ে আপনারা সঙ্গে থাকবেন লেখাটা শেষ না করা পর্যন্ত।
১.
এই আন্দোলনের কর্তাসত্তা বা সাবজেকটিভিটি হলো প্লুরাল; সিঙ্গুলার কোনো মাস্টারমাইন্ড নেই। প্রতিটি মোমেন্টে আন্দোলনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, আর কেউ না কেউ সেটি কাটিয়ে উঠে ক্যারি-অন করেছে। ডিবি অফিসে আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পর মূলত আন্দোলন আরো বেগবান হতে থাকে। এমন আরো বহু রিস্কি মোমেন্ট গেছে পুরোটা সময় । লীগবিরোধী সবাই—দল-মত বিবেচ্য ছিল না—ছাত্র-জনতা-হুজুর-নারী একাকার ছিল। ভিকটিমদের মধ্যে ঐক্য এটাকে সম্ভব করে তুলেছিল। যে বা যারা লীগের সুবিধাভোগী ছিল, তারাও এভাবে বাচ্চাদের মৃত্যুতে, বা নিজেদের পরিবারের সদস্য ও পরিচিতদের মৃত্যুতে কষ্ট পেয়েছে। তাদের অনেকের আবেগও আহত হয়েছে। করাপ্ট সুবিধাবাদীদের ঐক্যকে ছাপিয়ে মজলুমের ঐক্যই অভ্যুত্থানকে বেগবান করেছে। অন্যদিকে বিপুল বিরুদ্ধ মতের মানুষ তো অনেক দিন থেকেই আন্দোলনেই ছিল।
ফলে এটার প্লুরালিটি নষ্ট হলে আর কোনো এসেন্সে/মর্ম থাকবে না। মুজিব-ইজমের একটা রি-অ্যাকশনারি জিনিস হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। আর সেটি হবে হেগেলের মতে, ক্ষমার অযোগ্য—‘ক্রাইম অ্যাগেন্স্ট স্পিরিট’। হেগেল মনে করেন, সব অপরাধের ক্ষমা হতে পারে, কিন্তু স্পিরিটের বিরুদ্ধে যে অপরাধ তা ক্ষমার অযোগ্য। কেন স্পিরিট এত গুরুত্বপূর্ণ? হেগেলের মতে, এটাই ইতিহাসের ইঞ্জিন। ইতিহাসের চালিকাশক্তি হলো স্পিরিট। আমাদের জন্য কেন যেকোনো মূল্যে চব্বিশের এই স্পিরিট বা পরম প্রেরণাকে অটুট রাখতে হবে? রাখতে হবে কারণ—আমাদের জাতীয় কোনো ইতিহাস নেই। আছে কতগুলো ইভেন্ট বা ঘটনা। আর সেগুলোর কোনো জাতীয় চরিত্র নেই। সেগুলো দলীয় করা হয়েছে এবং ইতিহাসের দলীয় বয়ানকে শক্তিশালী করে ক্ষমতাকে দখল করার জন্য সহায়ক বয়ান তৈরি করা এবং সেই বয়ানের দোহাই দিয়ে জনগণের ওপর অত্যাচার ও হত্যা চালানো হয়েছে। কায়েম হয়েছে ফ্যাসিবাদ। ফলে ’২৪ আমাদের সামনে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন জাতি গঠনের যে সুযোগ তৈরি করেছে, তাকে কাজে লাগানোর প্রথম শর্ত হলো—এর স্পিরিটকে অটুট রাখা বা পবিত্রতা রক্ষা করা, এটিকে কোনো দলীয় বয়ানের খুপরিতে আটকে না ফেলা। আর জাতীয় মুক্তির যে উদ্দীপনা, তাকে রক্ষা করা। এই স্পিরিটের আলোকে পুরো জাতির ইতিহাসের মুক্তির পথরেখা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া এবং একটি আত্মমর্যাদাবান জাতি হিসেবে নিজেদের বিকাশের জন্য জাতীয় সংহতি ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করা। ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় সংহতিকে এই ভিন্নতা বাধাগ্রস্ত করবে না। ভিন্নতার মধ্যে যে ঐক্য, এটাই ’২৪-এর অন্যতম শিক্ষা।
২.
অন্যদিকে পুরো একটি জেনারেশনের ঐতিহাসিক কর্তাসত্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশের অভ্যুত্থান ছিল এটি। হাসিনার পতন এটির বাই-প্রোডাক্ট। মানে এটি কিন্তু হাসিনার পতনের আন্দোলন ছিল না, বরং আন্দোলনের নিজস্ব প্রক্রিয়া ও বিকাশের ধারাবাহিকতায় হাসিনার পতন হয়েছে। মানে আন্দোলন নিজেই নিজের পরিণতি ঠিক করেছে। আমরা আন্দোলনে লিড দিইনি, আন্দোলনই আমাদের লিড দিয়েছে। স্পিরিট বা পরম প্রেরণা এখানে নিজেরই নিজের নিয়তি ঠিক করে নিয়েছে। আমরা জাস্ট ফলো করেছি এই মহাজাগরণ। এর পেছনে ক্ষমতার কোনো ধান্ধা ছিল না। কিন্তু এরা কোনো ধরনের রাজনীতি আর দেখতে চায় না, তার বিরুদ্ধে রায় দিয়ে দিয়েছে জেন-জি। এখন এই লীগের মডেলের বাইরে, ট্রাইবাল রাজনীতি পেরিয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই আন্দোলনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আর কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা নেই। এর বাইরে বাকি আলাপ কেওয়াসকে বেগবান করবে।
৩.
আরো একটি দিক থেকে ভাবতে পারেন, ‘বিং অ্যান্ড ইভেন্ট।’ কোনো কিছু যখন দার্শনিকভাবে ‘ইভেন্ট’ হয়ে ওঠে, তখন সেটির যে কজ বা কারণ, তা সেই ঘটনা অতিক্রম করে যায়। আর যখন অতিক্রম করে যায়, তখনই সেটি একটা ঐতিহাসিক ইভেন্ট হয়ে ওঠে। তার মানে সেটার একটা অটোনোমাস/স্বয়ংক্রিয় সেলফ পয়দা হয়ে যায়। খালি চোখে দেখা যায়, অনুমান করা যায়, আগাম বুঝতে পারা যায়—এমন সব রিজন, কজ বা যুক্তিকে অতিক্রম করেই কোনোকিছু ঐতিহাসিক ইভেন্ট হয়ে ওঠে (সূত্র: ইভেন্ট-স্লাভোক জিজেক, পেঙ্গুইন প্রকাশনী)। সেদিক থেকে ’২৪ একটা পিওর ‘ইভেন্ট’। এর মধ্যে বিং মানে হয়ে ওঠার সম্ভাবনা আছে এবং এটার কোনো কিছু হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ততক্ষণই অটুট থাকবে, যতক্ষণ আমরা এটার এই অটোনোমাস বা সব রিজন অতিক্রম করে যাওয়ার এই স্বয়ংক্রিয় প্রবণতাকে রক্ষা করতে পারব। কথাটা জটিল, কিন্তু সহজ করে বলতে চেষ্টা করলাম। একটু ভাবতে হবে।
কিন্তু মানুষ বড় লোভী প্রাণী, তার সবকিছুর দখল লাগে। নিজের আমিত্বকে পূজা দিতে জীবন শেষ হয়ে যায়। এর মধ্যে অমরত্বের লোভও একটা লোভ। এই লোভেও মানুষ অনেক বাজে কাজ করে। যেমন অকবি কবিতা লেখে। অচিন্তক দর্শন করে। ধান্ধাবাজ সাধু সাজে। যে ঐতিহাসিক জীবনযাপন করেনি সেও নিজেকে ইতিহাসের প্রধান চরিত্র রূপে হাজির করে। যদিও কালের করাতের সামনে কিছুই টিকে না; কিন্তু যার যেটা হক, সেটা দিতে না পারলে মানুষ শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঐতিহাসিক একটা ইভেন্টের পর বিরাট ভূমিকা রাখার পরও ব্যক্তিমানুষ তুচ্ছ হয়ে যায়, গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘স্পিরিট’। আর এটা রক্ষা করার জন্য যেকোনো কিছুর পারসোনিফিকেশন বন্ধ করতে হবে। এটা করতে না পারলে বুঝতে হবে আমরা ’২৪ বুঝিনি।
লেখক : চিন্তক ও রাজনীতি বিশ্লেষক; সম্পাদক, জবান