গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতন হলে এবং হাসিনা ভারতে পালিয়ে গেলে একটি বিশেষ সময়ে দেশ ও জাতির প্রয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে গত বছরের ৮ আগস্ট বাংলাদেশের মানুষের জন্য নতুন আশা ও নতুন স্বপ্নের প্রতীক হয়ে অত্যাবশ্যকীয় কিছু সংস্কারের ভিত্তিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে শপথ গ্রহণ করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকার এখনো দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের চরম বিশৃঙ্খল অবস্থায় দায়িত্ব গ্রহণ করে এই সরকার। কিন্তু তার সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্টের দোসররা শুরু থেকেই ষড়যন্ত্র করতে থাকে। শেখ হাসিনার আকস্মিক পতনে হতবিহ্বল ও অপ্রস্তুত ভারত ও তাদের মিডিয়া বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অপপ্রচারে নামে। তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুরের নানা বানোয়াট কাহিনি প্রচারে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার পরও ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার কর্মতৎপরতায় প্রায় সব ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সফলতার প্রমাণ দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
৫ আগস্টের পর যখন দেশে পুলিশ বাহিনী বলতে কার্যত কিছু ছিল না, তখন দেশের সচেতন নাগরিকরা দেশের স্বার্থে এগিয়ে আসেন। আমরা দেখেছি সাধারণ মানুষ রাত জেগে নিজেদের মহল্লা পাহারা দিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন, সব ভেদাভেদ ভুলে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। আমরা দেখেছি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রতিহিংসায় সৃষ্ট ভয়ংকর বন্যা মোকাবিলায় সারাদেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। দেশের প্রতিটি ধর্মের ও দলের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার কারণেই এই সরকার ভারত ও তার এদেশীয় এজেন্টদের সৃষ্ট বিপজ্জনক পিচ্ছিল পথ নিরাপদে পার করতে পেরেছেন।
তবে ভারত ও তাদের এদেশীয় এজেন্টদের তৎপরতা থেমে নেই। তাদের কুটিল তৎপরতায় রাজনৈতিক দল, ছাত্র সমন্বয়ক ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে ঐক্যে ফাটল দেখা দেয়। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারী হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করা শক্তিগুলো এখন নিজেরা একে অন্যকে শত্রুর চোখে দেখতে শুরু করেছে। যেহেতু দেশে এখনো কোনো নির্বাচিত দলীয় সরকার নেই, সেহেতু ভারতের সহায়তায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ করে নিজের ফেলে যাওয়া ফ্যাসিবাদী সাম্রাজ্য ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন হাসিনা। তার মূল লক্ষ্য ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলো এবং দেশের জনগণের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাদের কূটকৌশলে কাজ হচ্ছে না। ঐক্যবদ্ধ জাতির মধ্যে বিভাজন তৈরি করে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অপতৎপরতা অব্যাহত আছে। বর্তমানে দেশে পরিকল্পিতভাবে ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, খুন ও জবরদখলের যে খবরগুলো সামনে আসছে, তার সবকিছুই ওই পরাজিত শক্তি ও তার দোসরদের ষড়যন্ত্রের অংশ। শুধু অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ করা তাদের লক্ষ্য নয়, তাদের লক্ষ্য গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগকে ব্যর্থ করে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এখনই সময় দেশ ও জনগণের স্বার্থে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সফল করা। কারণ এই সরকারের সফলতাই আমাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারকেও জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত ও প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পথে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিতে পারে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা