জীবনব্যাপী শিক্ষা একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। একটি সমাজ কতটা সভ্য ও প্রগতিশীল, তা পরিমাপের অন্যতম সূচক হলো সে দেশের গ্রন্থাগার ব্যবস্থা ও পাঠাভ্যাসের সংস্কৃতি। শক্তিশালী গ্রন্থাগার মানেই জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি। ফলে গ্রন্থাগারের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোগত বিষয় নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশে বহু গ্রন্থাগার আজও মানসম্মত সেবা দিতে ব্যর্থ। এর অন্যতম কারণ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গ্রন্থাগার কর্মীর সংকট এবং তাদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার অভাব। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন লাইব্রেরিয়ানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে তারা প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। একজন লাইব্রেরিয়ান কেবল বইয়ের তত্ত্বাবধায়ক নন; তিনি গবেষণা সহায়ক, তথ্য বিশেষজ্ঞ ও জ্ঞান ব্যবস্থাপক। লাইব্রেরিয়ানদের প্রফেসরের সমমর্যাদা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের সে মর্যাদা দেওয়া হয় না। দিলে গবেষণার মান যেমন বাড়বে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশও সমৃদ্ধ হবে।
আজ সমাজে সুশিক্ষা ও সুশাসনের অভাবে নৈতিক অবক্ষয় ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। মানুষ সার্টিফিকেটের পেছনে ছুটছে, অথচ প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তোলে। ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা’র দর্শন বাস্তবায়ন করতে হলে গ্রন্থাগারকে শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত করতেই হবে।
উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগের মতো আন্তর্জাতিক মান ও বিশ্ব র্যাংকিং ধরে রাখতে পারছে না। দুর্বল গবেষণা কাঠামো, অপর্যাপ্ত গ্রন্থাগার সুবিধা এবং গ্রন্থাগার কর্মীদের অবমূল্যায়ন এর অন্যতম কারণ। তাই এখনই সময় গ্রন্থাগার ও গ্রন্থাগার কর্মীদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার।
৫ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস উপলক্ষে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের প্রতি আহ্বান—গ্রন্থাগারের সার্বিক উন্নয়নে সম্মিলিত উদ্যোগ নিন। একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়তে শক্তিশালী গ্রন্থাগারের কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস—৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬—সফল হোক।
লেখিকা: রাবেয়া আক্তার, চেয়ারপারসন গ্লোবাল নলেজ ফাউন্ডেশন লাইব্রেরিয়ান এইউবি ও রোটারিয়ান।