‘কোনো কিছু সময়ের জন্য তুমি হয়তো সবাইকে বোকা বানাতে পারবে, কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবে, কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানাতে পারবে না।’ আব্রাহাম লিঙ্কন
একটি আঞ্চলিক বিচার : নীরবতা, ন্যায়বিচার এবং দ্বিপক্ষীয় আস্থার ওপর চাপ
বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে বিচারের জন্য ফেরত পাঠাতে বললেও ভারত তাকে আশ্রয় দেওয়ায় মারাত্মক উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১৪ শতাধিক হত্যার বিষয়টিও রয়েছে। ভারত এ ক্ষেত্রে যে অসহযোগিতা করছে, সেটিকে আর সতর্ক কূটনীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বহু বাংলাদেশি মনে করছে, ভারত ন্যায়বিচারে বাধা দিচ্ছে। এতে ভারতের ব্যাপারে বাংলাদেশের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে যে নৈতিক বন্ধন, সেটাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ভারত একজন সাবেক নেতাকে লুকিয়ে রেখেছে, বাংলাদেশিরা শুধু এটুকু ভাবছে না। বরং তারা ভাবছে, ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামে শিশু, শিক্ষার্থীসহ নিরস্ত্র বেসামরিক মানুষকে হত্যার যিনি নির্দেশ দিয়েছেন, তাকে সুরক্ষা দিচ্ছে ভারত। এই সহিংস দিনগুলোর যে যন্ত্রণা, সেটা এখনো তীব্র হয়ে আছে।
ঢাকায় নিহত হয় ১১ বছরের রাকিব হোসেন। তার বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘আমরা নিজের হাতে আমাদের ছেলেকে কবর দিয়েছি। অথচ তার খুনিরা হেলিকপ্টারে পালিয়ে গেছে।’
রাজশাহীতে নিহত এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মা রেহানা পারভিন বলেন, ‘তারা এমনভাবে হাসিনাকে সুরক্ষা দিচ্ছে, যেন সে একজন বীর। কিন্তু আমাদের সন্তানরা গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে।’
এই শব্দগুলো বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ধ্বনিত হয়েছে। বিক্ষোভে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। এগুলো যন্ত্রণার কান্না। ভারতের নীরবতা এই যন্ত্রণাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের লড়াই এটাকে আরো উসকে দিয়েছে।
এই সংকটের সময়টায় নেতৃত্বের দারুণ স্বাক্ষর রেখেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি মর্যাদা ও সততার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন। ক্ষোভের বদলে তিনি ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়েছেন, যেটার ভিত্তি হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা। পুরোনো অসম জোটের সম্পর্ক সেখানে গুরুত্ব পাবে না।
ভারতের নৈতিক ও কৌশলগত মূল্য
ভারত বহুকাল ধরে নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার নেতা মনে করে এসেছে। কিন্তু হাসিনাকে সুরক্ষা দিয়ে তারা নিজেদের নৈতিক অবস্থান হারিয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এনজিও এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৭২ শতাংশ মানুষ ভারতকে অবন্ধুসুলভ দেশ মনে করে। এমনকি একসময় যারা ভারতকে সমর্থন দিয়েছে, তারাও এখন চুপ করে গেছে। কারণ ভারতের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা তাদের কাছেও নেই।
নারায়ণগঞ্জে নিহত এক গার্মেন্টকর্মীর আত্মীয় মোহাম্মদ নাইম বলেন, ‘আমরা ভারতকে বন্ধু বলতাম। কিন্তু ১৯৭১ সালে যারা আমাদের সাহায্য করেছিল, তারা এখন আমাদের পরিত্যাগ করেছে।’
ভারতের নীরবতার কারণে তাদের ভূমিকা নিয়ে মানুষের ধারণা বদলে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালে ভারত যে সাহায্য করেছিল, সেই কৃতজ্ঞতাবোধ ম্লান হতে শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশগুলোও এখন প্রশ্ন তুলছে, ভারত কি আদৌ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়, নাকি তাদের কাছে নিজস্ব স্বার্থই সবচেয়ে বড়।
আশ্রয়কে অস্ত্র বানানো : গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঠেকাতে হাসিনাকে ভারতের উসকানি
ভারত হাসিনাকে শুধু নিরাপদ আশ্রয়ই দিচ্ছে না। বরং বাংলাদেশে অবস্থানরত হাসিনার সমর্থকদের কাছে বার্তা পাঠানোরও সুযোগ করে দিচ্ছে তারা। গোপন অনলাইন চ্যানেল এবং পাবলিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে হাসিনা ড. ইউনূসের সরকারকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়েছে এবং আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার শপথ নিয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ঘোষণা এবং ট্রাইব্যুনালের শুনানির আগে এসব বার্তা প্রকাশ করা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছে, ভারত সমস্যা সৃষ্টির জন্য তাকে সাহায্য করছে। বাংলাদেশিরা এতে ক্ষুব্ধ হচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের শোককে অশ্রদ্ধা করা হচ্ছে এবং গণতন্ত্র নির্মাণের চেষ্টায় বাধা দেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের জনগণের পর্যায়ে যদিও সম্পর্ক অটুট আছে, কিন্তু হাসিনার জন্য ভারত সরকারের সমর্থনকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কূটনৈতিক ভুল নাকি কৌশলগত ভুল পদক্ষেপ?
ভারতের হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকার করার একটা কারণ হতে পারে তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের পুরোনো সম্পর্ক। কিন্তু বাংলাদেশ বদলে গেছে। ড. ইউনূসের অধীনে এই দেশ এখন নতুন গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য কাজ করছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এক সাংবাদিকের মা ফরিদা সুলতানা বলেন, ‘ড. ইউনূস আমাদের ক্ষত মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু ভারত আমাদের ক্ষত সারতে দিতে চাচ্ছে না।’
ঢাকায় বিক্ষোভে নিহত দুই সন্তানের বাবা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘ভারত দাবি করে, তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র। তাহলে কেন তারা একজন স্বৈরাচারকে সুরক্ষা দিচ্ছে?’
পুরোনো মিত্রকে আঁকড়ে ধরে ভারত এই অঞ্চলে তাদের প্রভাব হারাচ্ছে। কারণ, এ অঞ্চল এখন আনুগত্যের ওপর ন্যায্যতার মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে শিখেছে।
আঞ্চলিক সংকট : ভারতের পরিকল্পিত নীরবতা
আইসিটির বারবার অনুরোধের পরও হাসিনাকে ভারত সুরক্ষা দেওয়ায় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের হাসিনার উপস্থিতি ছাড়াই বিচার চলছে। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। ভারত সহযোগিতা করতে অস্বীকার করার অর্থ হলো তারা ন্যায়বিচারে বাধা সৃষ্টি করছে।
২০২৪-এর জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ১৪ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এই আন্দোলনের সময় হাসিনা নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের গুলি করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামের রাজপথ তখন রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। আদালতে তার অনুপস্থিতি এবং তার ভারতে অবস্থান, শোকাহত পরিবারগুলোর যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
রকিব হোসেনের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘আমরা নিজের হাতে সন্তানকে কবর দিয়েছি, কিন্তু তার খুনি পালিয়ে গেছে। ভারত এখন তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে।’
এই অনুভূতিগুলো বাংলাদেশের সব জায়গাতেই একই ধরনের। হাসিনাকে ভারতের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিকে অনেকেই বিশ্বাসঘাতকতা মনে করছে।
জনগণের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে
বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে যে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, সেটি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ভারতের কর্মকাণ্ড একটা অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
বগুড়ায় নিহত স্কুলছাত্রীর মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ের বয়স ছিল মাত্র ১৬। মুক্তির জন্য সে প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু কার বিচার হবে, সেটি যদি ভারত ঠিক করে দেয়, তাহলে এই মুক্তি কীভাবে আসবে?’
যেসব শিক্ষার্থী একসময় ভারত-বাংলাদেশ ঐক্যকে সমর্থন করত, তারাই এখন বয়কটের ডাক দিচ্ছে। মিউজিক উৎসব, বিনিময় কর্মসূচি এবং যৌথ প্রকল্পের সংখ্যা কমে আসছে। অনলাইনে ভারতবিরোধী হ্যাশট্যাগগুলো ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। ভারত এমনকি বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়াও বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি এদের মধ্যে অনেক রোগীও রয়েছে। তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যা করেছে। এসব কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারতের ব্যাপারে ক্ষোভ উসকে দিয়েছে।
ভুল পদক্ষেপ নাকি বৃহত্তর পরিকল্পনা?
হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের যে আড়ষ্টতা, তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাস হয়তো জড়িয়ে আছে। কিন্তু বাংলাদেশিরা এখন বদলে গেছে। ড. ইউনূস এখন সাহসী গণতান্ত্রিক নবায়নের প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ফরিদা সুলতানা বলেছেন, ‘ড. ইউনূস আমাদের ক্ষত সারাতে চান। কিন্তু ভারত আমাদের ক্ষত বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
নুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘ভারত বলছে যে, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাহলে কেন তারা একজন খুনিকে আশ্রয় দিচ্ছে?’
পুরোনো রাজনীতি আঁকড়ে রেখে, ভারত এই অঞ্চলে তাদের অবস্থান হারাচ্ছে। কারণ এই অঞ্চল এখন দায়বদ্ধতার মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে শিখেছে।
আঞ্চলিক প্রভাব ও চীনের সুযোগ
ভারতের কর্মকাণ্ড অনেকেই দেখছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করছে চীন। তারা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। সরকারের প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এতে আঞ্চলিক জোটের প্রকৃতি বদলে যেতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।
সিলেটে নিহত এক বিক্ষোভকারীর চাচা শহীদুল আলম বলেন, ‘ভারতের নিজেকে জিজ্ঞাসা করা উচিত : হাসিনার বিনিময়ে তারা কি বাংলাদেশকে হারাতে চায় ‘
ভারত যদি ট্রাইব্যুনালের অনুরোধ উপেক্ষা করে, তাহলে সেটা জোর-জবরদস্তি হিসেবে দেখা হবে। গণতান্ত্রিক বন্ধু হিসেবে নয়।
প্ৰায়শ্চিত্তের পথ : এখনো সময় আছে শুধরানোর
ভারত এখনো আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে। ড. ইউনূসের সরকারের সঙ্গে কাজের মাধ্যমে বা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সাহায্য করে তারা সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনতে পারে।
নির্যাতিত এক শিক্ষকের বোন তাহমিনা রহমান বলেছেন, ‘আমরা প্রতিশোধ নিতে চাই না। আমরা শুধু ন্যায়বিচার চাই।’
অবসরপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘ভারত যদি আমাদের ১৯৭১ সালের শহীদদের শ্রদ্ধা করে থাকে, তাহলে ২০২৪-এর বীরদের তাচ্ছিল্য করা তাদের উচিত নয়।’ বাংলাদেশ ন্যায়বিচার চায় আর রাজনৈতিক খেলা দেখতে চায় না।
সত্যিকার বন্ধুত্বের পরীক্ষা
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে, যেটা গড়ে উঠেছিল ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়। অভিন্ন সংস্কৃতির মাধ্যমে সেটা আরো শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্বের প্রমাণ পাওয়া যায় কঠিন সময়ে। এখন সে সময় এসেছে।
১৪ শতাধিক মানুষকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হাসিনাকে সুরক্ষা দিয়ে ভারত ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়ায় বাধা দিচ্ছে। বহু দশকের বিশ্বাসের ক্ষতি করছে। ড. ইউনূস আর তার সরকার কোনো প্রতিশোধ নিতে চায় না। তারা শুধু চেয়েছে ভারত বাংলাদেশের আইন এবং এদেশের জনগণের শোকের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাক। ভারত নীরবতা দিয়ে এবং হাসিনাকে সহায়তা দিয়ে এর জবাব দিয়েছে।
তবে, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। ভারত এখনো রাজনীতি বাদ দিয়ে ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াতে পারে। তারা সমান অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে পারে। এটি শুধু একটি একক বিচার বা একজন নেতার বিষয় নয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো ন্যায্যতার ভিত্তিতে একে অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে কি-নাÑএই সেই প্রশ্ন।
নিহত রাকিবের বাবা আবুল খায়ের বলেছেন, ‘হাসিনা আমাদের ছেলেকে হত্যা করেছে। অথচ ভারত তাকে রানির মতো রেখেছে। এটাই যদি বন্ধুত্ব হয়, তাহলে আমরা বরং একাই দাঁড়িয়ে থাকব।’
ন্যায়বিচার যেখানে কঠিন, সত্যিকারের বন্ধু সেখানেই সাহসের প্রমাণ রাখে। ভারতকে অবশ্যই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা ইতিহাসের সঠিক দিকে দাঁড়াবে কি না।