হোম > মতামত

গণতন্ত্র ও গণহত্যাকারী দলের রাজনৈতিক অধিকার

খন্দকার হাসনাত করিম

বিন্দুকে ঘিরে যেমন বৃত্ত হয়, তেমনি কোনো দেশের শাসনবৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু হলো রাজনৈতিক দল। সেই মতে, গণতন্ত্র হলো রাজনৈতিক দলের কাছে নিবিড়ভাবে পরিবেষ্টিত একটি নিরাপদ আশ্রয় ও সুরক্ষাব্যূহ। শাসন কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক দল অনিবার্য এবং অপরিহার্য।

রাজনৈতিক দল ছাড়া প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়ার বিকল্প কোনো উপায় আজ পর্যন্ত উদ্ভাবিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমেই বিকশিত হয় একটি জাতিরাষ্ট্রের ঐক্য এবং শাসন পরিচালনার সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিষ্ঠিত হয় রাজনৈতিক বৈধতা, নিশ্চিত হয় জাতীয় সংহতি এবং স্থিতিশীলতা। গণতন্ত্র হলো নানা মত ও পথ বৃক্ষে শোভিত একটি উদ্যান; আর স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্রের পরিণতি হলো একটি অনুর্বর, নিষ্ফলা উষর মালভূমি।

কারণ স্বৈরতন্ত্রে মতভিন্নতাকে সহ্য করা হয় না। একটি মাত্র শাসক দল হয়ে পড়ে ব্যক্তি স্বৈরাচারের আজ্ঞাবহ একটি লুটেরা গোষ্ঠী; দেশ পরিচালিত হয় একটি প্রাইভেট কোম্পানির মতো একচ্ছত্র নিয়মে, যেখানে প্রশ্ন করার কারো অধিকার থাকে না; প্রতিবাদ করার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

কেউ প্রতিবাদ করার সাহস দেখালেই হয় গুম, খুন, নিখোঁজ, মিথ্যা মামলা, হয়রানির শিকার, যেটা হয়েছে বিগত ১৬ বছরের এই দেশ নামক আওয়ামী প্রাইভেট কোম্পানিতে। এই স্বেচ্ছাচারী প্রাইভেট কোম্পানি দেশের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে ১৬ বছরে ১৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। সেই লুটের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে গর্ভের শিশুটিকে পর্যন্ত, যে এখনো পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠই হয়নি। অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষ হয়েছেন গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার।

দেশ শাসনে, সংবিধান ও বিবিধ আইন প্রণয়নে রাজনৈতিক দলের যে মূল ভূমিকার কথা দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম, সেই রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলই দেশ থেকে গণতন্ত্রকে ঝাড়ু মেরে বিদায় করেছিল। গণতন্ত্রের জন্য স্বাধীন করা দেশটিতে একদলীয় ‘বাকশাল’ চালু করা হয়েছিল। চালু করা হয়েছিল প্রথম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (শহীদ সিরাজ শিকদার); দেশের ত্যাগী ও মেধাবী, দেশপ্রেমিক ২৮ হাজার জাসদ কর্মী ও বামপন্থি নেতাকর্মীকে ঠান্ডা মাথায় রক্ষীবাহিনী দিয়ে খুন করা হয়েছিল। একটি রাজনৈতিক দলের পরিপূর্ণ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদগ্র বাসনায় সংবিধানের কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ‘বাকশাল।’

সংবিধানের কুখ্যাত চতুর্থ সংশোধনী এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ‘বাকশাল’ নামক ইতিহাসের নিকৃষ্টতম স্বৈরতন্ত্র। এই ৬ আগস্টের মতো তাই সেদিন ১৫ আগস্টের দেশপ্রেমিক বীর সিপাহি ও অফিসারদের একটি অংশ সিপাহি জনতা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গণশত্রু আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসী আধিপত্যবাদের অপশাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। পতন হয়েছিল বাস্তিল দুর্গের।

সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতা ভারসাম্যে ধস নেমেছিল। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও গণচীনের স্বীকৃতির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্রসত্তা পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। কাজেই ১৫ আগস্টের ঘটনাবলি যতই বিয়োগান্ত হোক না কেন, এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক, পররাষ্ট্রনৈতিক ও পুরো সামাজিক তাৎপর্য ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যখন ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ প্রতি বিপ্লব ঘটায় আওয়ামীপন্থি কিছু উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তা আর একদিকে যখন হঠকারী জাসদ তথাকথিত ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই/অফিসারদের কল্লা চাই’ ধ্বনি তুলে পুরো প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস করার ভারতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গৃহযুদ্ধের সর্বনাশা পথে নামে, ঠিক তখনই ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার মহা-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও দেশীয় একনায়কত্বের কবর রচিত হয়।

বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে সিপাহি-জনতা মুক্তিযুদ্ধের বীর সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান বীর-উত্তমকে অর্পণ করেন দেশ নেতৃত্বের শিরোপা। তিনি একদলীয় ‘বাকশাল’ বাতিল করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নবজন্ম প্রদান করেন। আদালত ফিরে পায় বিচারের স্বাধীনতা। গণমাধ্যম ফিরে পায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। অথচ আজ আমরা ভুলে যেতে বসেছি শেখতন্ত্র অবসানের সেই ১৫ আগস্ট মহাবিপ্লবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। এমনই অতীতভোলা অকৃতজ্ঞ জাতি আমরা। সেই বিপ্লবের মহানায়কদের বিচারের নামে বিচারিক হত্যাকাণ্ড করেছে হাসিনা এবং জীবিত কয়েকজন এখনো প্রবাসে ফেরারি। যে চেতনায় সফল হয়েছে ২০২৪-এর দেশ কাঁপানো মহাবিদ্রোহ, ১৯৭৫ সালের আগস্ট বিপ্লব ও ৭ নভেম্বরের সিপাহি জনতা জাগরণের চেতনারই, সেটা হলো অনিবার্য ধারাবাহিকতা।

মেঘে মেঘে অনেক বেলা গড়িয়েছে। ১৯৭৫ থেকে ২০২৪। এরই মধ্যে সমাজ ও রাজনীতিতে দুটি প্রজন্মের উত্থান হয়েছে। ১৯৭৫ সালের আগস্ট বিপ্লব ও ৭ নভেম্বরের সুবিধা পেয়েছে জাতি। একদলীয় স্বৈরতন্ত্র বিদায় করে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। ভারতীয় করদরাজ্যের অভিশাপ থেকে দেশ মুক্তি পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার লোকসান ঘটিয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতি আত্মপ্রকাশ করেছে। দেশে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পের বিকাশ ঘটেছে।

বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের রাষ্ট্র বিপ্লবের ফলেই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব পূর্ণতা পেয়েছে। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে পাকিস্তান, চীন ও সৌদি আরব। অথচ সেই মহামুক্তির তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে কমবেশি ১৯৭৫-পরবর্তী প্রতিটি শাসক ও শাসক মহলই। সেই পতিত মুজিব স্বৈরাচারের মন্ত্রিসভাকে নিয়েই ৮০ দিনের শাসনধারা অব্যাহত রেখেছেন খন্দকার মোশতাক। যে দেশপ্রেমিক ও অমিত সাহসী সেনা কর্মকর্তা সেই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদেরই দেশছাড়া হতে বাধ্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়া আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন।

তারপর ভারতীয় আধিপত্যবাদের আশীর্বাদে ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছেন জিয়ারই নিযুক্ত সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। ঠিক যেমন ইস্কান্দার মীর্জাকে খেদিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন প্রেসিডেন্ট আইউব খান। এরশাদ দুঃশাসনের বাকশালী ধারাকেই অব্যাহত রাখেন। মুজিবেরটা ছিল সিভিল ডিক্টেটরশিপ; এরশাদেরটা ছিল মিলিটারি ডিক্টেটরশিটÑতফাত শুধু এটুকুই। বারবার সুনির্বাচিত বিএনপির বিরুদ্ধে শত্রুতার রণাঙ্গন খুলেছিলেন এরশাদ।

কারণ তার পেছনে ছিল ভারত। এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে বিএনপি। অথচ সেই নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে হটিয়ে ভারতীয় আশীর্বাদ ও বাকশালীদের সর্বতো সহযোগিতাক্রমেই অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ভারতীয় বশংবদ ১/১১-এর কুশীলব মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীনরা বিএনপিকে ধ্বংস করার অপকর্মে দেহমনপ্রাণ উজাড় করে দিয়েছিল। ভোটে ক্ষমতায় এনেছিল সেই আওয়ামী-বাকশালী আত্মবিক্রীত স্বৈরাচারীদেরই। এরপর গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় ইতিহাসের নৃশংসতম স্বৈরিণী, প্রতিহিংসার প্রতীক এবং বাংলাদেশকে সিকিম বানানোর তালিমপ্রাপ্ত, ভারতে আশ্রিত ও প্রশিক্ষিত শেখ তনয়া হাসিনা।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছিল মানব ইতিহাসের নৃশংসতম স্বৈরাচারী একনায়কত্ব, দুর্নীতি ও লুটপাটতন্ত্র, পারিবারিক রাজতন্ত্র এবং দেশের অর্থ-সম্পদ বিদেশে পাচার করার মৃগয়াক্ষেত্রে। এই অপরাধগুলোর সব কটি কিংবা বেশিরভাগই অভিন্ন দেখা যায় পতিত ও সমূলে উৎখাত হওয়া স্বৈরাচারী একনায়কদের মধ্যে।

তাই গণতন্ত্রে যেমন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ অপরিহার্য, তদ্রূপ স্বৈরশাসক ও গণশত্রুদের একটি জাতির নিয়তির সঙ্গে অভিসারে তাদের নিষিদ্ধ করাটাই অনিবার্য। সারা পৃথিবীতে গত এক শ বছরের দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরছি, যে তালিকায় দেখা যাবে পতিত স্বৈরাচারী দল নামে, এমনকি বেনামেও, দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আর কোনো দিনও অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। এ রকম কয়েক শ দৃষ্টান্তের মধ্যে কয়েকটি এখানে তুলে ধরছিÑ

আলজেরিয়ার স্বৈরাচারী এক নায়ক এবং ফরাসি আধিপত্যবাদের বংশবদ আবদুল আজিজ বুতাখলিফা, অ্যাঙ্গোলার একনায়ক সান্তোস, কাজাখাস্তানের নূর সুলতান নাজারবায়েভ, জিম্বাবুয়ের মুগাবে, ক্যামেরুনের পল বিয়া, সুদানের ওমর আল বশির, ভেনিজুয়েলার হুগো শ্যাভেজ, মালের জেনাউই, গিনির লান সানা গ্যাবলের ওমর বংগো, পোল্যান্ডের মেতুইজ মোরাইকি, চিলির পিনোশে, মোজাম্বিকের চিসানো, ব্রাজিলের ফিগারেডো, নিকারাগুয়ার ওরতেগা, তানজানিয়ার জুলিয়াস নায়াবারে এবং এরও আগে জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি, জাপানের তোজো, ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস, ইরানের রেজা শাহ পাহলভি বা রুয়ান্ডার পল কাগামে প্রমুখ স্বৈরাচারী শাসক উৎখাত হওয়ার পর এমনকি মৃত্যু ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার পর তাদের দেশের জনগণ আর কখনোই তাদের উত্তরসূরি ও দলবলকে রাজনীতিতে ফিরে আসার অনুমতি কিংবা সুযোগ দেয়নি।

ফলে ইতিহাসের জঘন্যতম খুনি, লুটেরা, দুর্বিনীত ব্যভিচারী স্বৈরাচারী একনায়ক শেখ হাসিনা বা তার দল-বলের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ কই? যারা দুঃশাসক আওয়ামী-বাকশালীদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবর্তনের জন্য ওকালতি করছে, তারা কি জুলাই-আগস্ট গণজাগরণে হাসিনা সরকারের ও পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে নিহত প্রায় দুই হাজার তরুণ ছাত্র-জনতার লাশের প্রতি বিশ্বাসঘাকতা এবং পঙ্গু প্রায় ৩০ হাজার ছাত্র-জনতা, শিশু-কিশোরের আত্মত্যাগের প্রতি নির্লজ্জ উপহাস করছে না? কী অধিকারে, কোন অজুহাতে তারা নতুন বাংলাদেশের নবীন গণতন্ত্রের সঙ্গী হওয়ার প্রত্যাশা করে?

পিলখানার অসমাপ্ত অধ্যায়

হাদি হত্যায় ভারত এবং গোয়েন্দা স্লিপার সেল

ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক সংকট

সিরিয়ায় ওয়াইপিজির বিলুপ্তি ইরাকের জন্য সতর্কবার্তা

চিন্তার স্বাধীনতা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

ভাষার কোনো বিদেশ নেই, নেই কোনো খাঁচা

নৌবিদ্রোহ ও রাজনীতির বিশ্বাসঘাতকতা

চ্যালেঞ্জের মুখে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি বিপ্লব

শব্দের রাজনীতি, ক্ষমতার ভয়