হোম > মতামত

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে ভোটবিপ্লবেই সমাধান

ড. আবুল বাশার ভূঁইয়া

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী বাঁক। এটি কোনো আকস্মিক ক্ষমতার রদবদল ছিল না; বরং ১৭ বছরের দমন-পীড়ন, ভয়, দলীয় নিয়ন্ত্রণ, বিচারহীনতা ও নাগরিক অসহায়ত্বের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই বিপ্লব রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে এক মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা কি শুধু সরকার বদলাতে চেয়েছিলাম, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিই বদলাতে চাই? এই প্রশ্নের গুরুত্ব এখানেই যে, বাংলাদেশের রাজনীতি বহু বছর ধরে ক্ষমতাকেন্দ্রিক এক বন্দোবস্তে আবদ্ধ ছিল। ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু ক্ষমতার চরিত্র বদলায়নি; শাসক বদলেছে, কিন্তু শাসনের ধরন বদলায়নি। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ কমেনি। জুলাই বিপ্লব সেই চক্র ভাঙার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বলে সুযোগ এলেই পরিবর্তন ঘটে না; পরিবর্তন ঘটাতে হয় সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্য হলো, পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আর আগের মতো গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণ বহুবার একই প্রতীক, একই মুখ, একই প্রতিশ্রুতি দেখেছে এবং শেষ পর্যন্ত পেয়েছে একই ব্যর্থতা। তাই আজ মানুষ অতীতনির্ভর রাজনীতির পুনরাবৃত্তি প্রত্যাখ্যান করছে। তারা স্লোগান নয়, হিসাব চায়; আবেগ নয়, জবাবদিহি চায়; ব্যক্তিপূজা নয়, প্রতিষ্ঠান চায়। অনেকে ভেবেছিলেন, মুক্ত রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হলেই নেতৃত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরোনো বড় দলগুলোর হাতেই ফিরে যাবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। জনগণ আর ব্যক্তিনির্ভর, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির কাছে জিম্মি থাকতে রাজি নয়। তারা এখন সংগঠন, নৈতিকতা ও ধারাবাহিকতার পরীক্ষায় রাজনৈতিক শক্তিকে বিচার করছে, এটি আবেগের বিচার নয়, অভিজ্ঞতার।

এবারের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী ভোটারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। তারা আর নীরব দর্শক নয়; সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যায়বিচার ও পরিবারকেন্দ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা সরাসরি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। দীর্ঘদিন পুরুষকেন্দ্রিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাজনীতিতে নারীরা এখন নিজেদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেই রাজনৈতিক মূল্যায়ন করছে। উঠান বৈঠক, সামাজিক সহায়তা ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নারীদের কাছে নতুন আস্থার প্রতীকে পরিণত করেছে, এটি কোনো আবেগী প্রচারণা নয়; বাস্তব অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তাবোধ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা থেকে গড়ে ওঠা আস্থা। একই সঙ্গে তরুণ সমাজ পুরোনো সংঘাতনির্ভর রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছে। তারা প্রতিশোধ নয়, পরিকল্পনা চায়; বিশৃঙ্খলা নয়, শৃঙ্খলা ও দিকনির্দেশনা চায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পাঁচটি প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফল এই মানসিক পরিবর্তনের শক্ত প্রমাণ। এসব নির্বাচনে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তা বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রভাব নয়; আদর্শ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও পরিষ্কার বার্তাই সিদ্ধান্তে মুখ্য হয়েছে। এই প্রজন্ম অতীতের দায় বহন করতে রাজি নয়; তারা ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব নিতে চায় এটি জাতীয় রাজনীতির জন্য স্পষ্ট ইঙ্গিত।

ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে একটি বিষয় পরিষ্কারÑআজ জনগণের কাছে ভোট শুধু একটি ব্যালট নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্ধারণের হাতিয়ার এবং নাগরিকের বিবেকের স্বাক্ষর। একটি ভোটের মাধ্যমে মানুষ শুধু প্রতিনিধি বেছে নেয় না, সে নিজের নৈতিক অবস্থানও ঘোষণা করে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি তাই অত্যন্ত স্পষ্টÑএই ভোট কি আজাদির পথে যাবে, নাকি আবার পুরোনো বন্দোবস্তকে নতুন রূপে বৈধতা দেবে? যখন বিবেক সাময়িক সুবিধা, ভয় কিংবা টাকার কাছে হার মানে, তখন পরাজিত হয় শুধু একজন ভোটার নয় পরাজিত হয় পুরো রাষ্ট্র। এ কারণেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট আজ মূলত অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক নয়; এটি গভীরভাবে নৈতিক সংকট। এই উপলব্ধি এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি মাঠের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা মানুষকে শিখিয়েছে, নির্বাচনের সময় অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি মানে পাঁচ বছরের অনিশ্চয়তা কেনা।

বাংলাদেশ আজ সিদ্ধান্তের মোড়ে, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাংলাদেশ আজ এক সিদ্ধান্তের মোড়ে দাঁড়িয়ে আমরা কি পারব ৫৩ বছরের ইতিহাসের ঋণ পরিশোধ করতে? পারব কি ভারতীয় আধিপত্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও ব্যক্তিনির্ভর পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন আর বক্তৃতা বা স্লোগানে নয়; উত্তর লেখা হবে ভোটকেন্দ্রে। সামনে একটি নতুন রাজনৈতিক দায় তৈরি করেছে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠার দায়। এই দায় মানে শুধু সরকার বদল নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি বদল। জনগণ আজ জবাবদিহি চায়, স্বচ্ছতা চায়, শৃঙ্খলা ও কাঠামোগত সংস্কার চায়। তারা চায় নারী নিরাপত্তা ও নারীর স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, তরুণ সমাজের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার জায়গা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহিমূলক ব্যবহার। এই ভোট কি আজাদির পথে যাবে, নাকি আবার পুরোনো বন্দোবস্তকে নতুন রূপে বৈধতা দেবে? রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার হাতে যাবে, রাজনীতির চরিত্র কোন পথে মোড় নেবে এবং শাসনের নৈতিক ভিত্তি কী হবেÑএর সবকিছুর চূড়ান্ত ফয়সালা নির্ধারিত হবে আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমেই। এটি আর কোনো একক নেতা বা দলের সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি জাতির সম্মিলিত ব পরীক্ষা। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে এই সন্ধিক্ষণে জনগণ কী সিদ্ধান্ত নেয়। যদি ভয় ও প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে বিবেকের পক্ষে দাঁড়ানো যায়, তবে প্রতিটি নীরব ভোটই হয়ে উঠবে এক একটি শক্তিশালী ঘোষণা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের জনগণের জবাব নিহিত নীরব ভোটবিপ্লবেই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সানওয়ে ইউনিভার্সিটি, সেলাঙ্গর, মালয়েশিয়া

মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সামরিক জোট ও বাংলাদেশ

জোট-বিজোটের রাজনীতি

ক্ষমতা, দ্বন্দ্ব ও বিশ্বরাজনীতির নতুন সম্ভাবনা

তুমি কোনো রাজার ছেলে নও

সার্ক গঠন জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা

জিয়াউর রহমানকে কেন পাঠ করতে হবে

শহীদ জিয়া: ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ, আদর্শের রূপকার

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু মোকাবিলা ও টেকসই অর্থনীতির নীতিগত বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক রেটিং এবং অর্থনীতির সম্ভাবনা

তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান চুক্তি ও নতুন নিরাপত্তা বাজার