নির্বাচনের রোডম্যাপ নিয়ে ধোঁয়াশা কিছুতেই কাটছে না। নির্বাচন কি চলতি বছরের ডিসেম্বরে, নাকি আগামী বছরের মাঝামাঝি—এ নিয়ে যেন এক ধরনের লুকোছাপা চলছে। ‘যত দ্রুত নির্বাচন, ডিসেম্বরেও হতে পারে’ এ কথা প্রধান উপদেষ্টা বিভিন্ন সময় বলে চলেছেন। অপরদিকে তার প্রেস সচিব সম্প্রতি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচন কবে হবে তা জুলাই সনদের ওপর নির্ভর করছে। সরকার আদৌ নির্বাচন দেবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন বর্তমানে রাজনীতির মাঠের প্রধান দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এদিকে জাতীয় নির্বাচনে রোডম্যাপ যখন সুস্পষ্ট নয়, তখন জাতীয় নির্বাচন নাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে—এ নিয়ে জুলাই-গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ বাড়ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও সমামনা দলগুলোর সঙ্গে এ ইস্যুতে মতভিন্নতা প্রবল হচ্ছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, জাতীয় বা স্থানীয়, যে নির্বাচনই আগে হোক না কেন তা হবে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এসিড টেস্ট। এসিড টেস্ট ভালোভাবে উতরাতে পারলে পরের নির্বাচন করা সহজ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবস্থা চলছে, তাতে সুষ্ঠুভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা কতখানি সম্ভব হবে, সে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। সন্ত্রাসী ও অপরাধী ধরতে দেশব্যাপী ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযান চলমান থাকার পরেও সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও ক্ষমতায় থাকা নিয়ে সরকারের ভেতরে নানা মত, ছাত্রনেতৃত্বের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন এবং দল গোছানো—এসব কারণে নির্বাচনের প্রক্রিয়া তেমন গতি পাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার গত ৮ ফেব্রুয়ারি ছয় মাস অতিবাহিত করল। সরকার গঠিত সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ ও জনপ্রশাসনের বিষয়ে ছয়টি সংস্কার নিয়ে কমিশন এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রস্তাবনাগুলো জমা দিয়েছে। সংস্কার ও নির্বাচন প্রশ্নে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম বৈঠকটি করে। এতে ২৬টি রাজনৈতিক দল ও জোট এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একশ’র মতো প্রতিনিধি যোগ দেন। আর ঐকমত্যের এই বৈঠকেই স্থানীয় নির্বাচন আগে হওয়া নিয়ে মতবিরোধ সামনে চলে আসে। বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্য যে কোনো নির্বাচনের তীব্র বিরোধী। ওই দিনের ঐকমত্য কমিশনের বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব জোরের সঙ্গে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের আগে অন্য কোনো নির্বাচন মেনে নেওয়া হবে না।’ বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন, ‘আগে স্থানীয় নির্বাচন হলে দাঙ্গা শুরু হতে পারে। পুলিশ এখনই আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তখনো পারবে না।’ তার মতে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। জাসদ, বাসদসহ বাম দলগুলো জাতীয় নির্বাচন আগে হওয়ার পক্ষে। ওই বৈঠকে এবি পার্টির প্রতিনিধিরা বলেন, ‘নির্বাচন কোনটি আগে বা পরে হবে, তার ওপর রক্তপাত নির্ভর করছে না। সরকারের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব না থাকলে যে নির্বাচনই হোক—আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না সরকার। তবে ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা আগে স্থানীয় নির্বাচনের পক্ষে তাদের অবস্থানের কথা জানান। জামায়াতে ইসলামী আমির ড. শফিকুর রহমান সম্প্রতি চাঁদপুরে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘অবশ্যই আগে স্থানীয় নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করতে হবে। এরপর উপযুক্ত সংস্কার নিশ্চিতের পরেই জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করা হোক।’ গণঅধিকার পরিষদও আগে স্থানীয় নির্বাচনের পক্ষে।
অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের পথে হাঁটার জন্য এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে চলছে সংস্কারের প্রস্তাবনা নিয়ে কিছু উদ্যোগ। তবে সরকারের চলার পথ কণ্টকাকীর্ণ ও বেশ বন্ধুর। শেখ হাসিনার দেড় দশকের স্বৈরশাসন দেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকসহ সব দিক থেকে ধ্বংসের দরজায় নিয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদী শাসন সর্বত্র এমন অবস্থা তৈরি করে গেছে যে, এ থেকে ঘুরে দাঁড়ানো অনেকটাই কঠিন। উপদেষ্টা পরিষদের রাজনীতিমনস্ক ও দক্ষ লোকের অভাব, সমন্বয়হীনতা ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীনতার ফলে কোনো কিছু ঠিকঠাক চলছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তো নিয়ন্ত্রণই করা যাচ্ছে না। সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা যেন দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। অপরাধীদের পাকড়াও করতে ‘ডেভিল হান্ট’ নামে অভিযান চালানো হচ্ছে। তার পরও বাসে ডাকাতি-শ্লীলতাহানি, ছিনতাই, হত্যাকাণ্ডসহ এমন সব অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে যে, মনে হতে পারে সন্ত্রাসীরা আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসকদের তিন দিনের সম্মেলন উদ্বোধন করে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টিতে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সম্মেলনে বলেছেন, ‘শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা মস্ত বড় ইস্যু। এটা আমাদের এখন এক নম্বর বিবেচ্য বিষয়। এখানে যেন আমরা বিফল না হই। আমরা এখন যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করব, সেখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং সব মানুষকে সুরক্ষা প্রদান করা।’ সম্মেলনে ‘রাজনৈতিক চাপ থেকে নিস্তার’ চাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা। কমিশনার ও ডিসিদের বক্তব্য হচ্ছে, ‘ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে বালুমহাল, হাটবাজার ইজারা, সম্পত্তি দখলসহ বিভিন্ন খাতে টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে বড় পরিসরে। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনসহ সব ক্ষেত্রে করা হয়েছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। ফলে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বে বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের।’ এ ধরনের পরিস্থিতির যেন আর মুখোমুখি না হতে হয়, সেজন্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে নিস্তার পাওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছেন তারা।
ডিসিদের এই চাওয়া যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়সংগত। তবে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে কোনো কোনো ডিসি, এসপি ও ওসি অতি উৎসাহী হয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তা নয়, দলের লোকের মতো আচরণ করেছেন, মন্ত্রী-এমপিদের অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য ভোট পর্যন্ত চেয়েছেন। ২০১৮ সালের নিশি ভোটের মূল কারিগর হচ্ছে পুলিশ। আর এ সবকিছুর বিনিময়ে পুলিশ প্রশাসন, সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের অনেক কর্মকর্তা ব্যাপক পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নেন এবং হয়ে ওঠেন ব্যাপক ক্ষমতাধর। তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগের এমপি ও নেতাদের পাত্তা দিতেন না। তাদের কেউ কেউ তখন এমনও বলছেন যে, তারা তাদের এমপি বানিয়েছেন। শেখ হাসিনার কাছে এমপি ও দলের নেতাদের চেয়ে প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। তিনি মনে করতেন, প্রশাসন ও এসব বাহিনী তাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। শেখ হাসিনার পতনের পরেও মুষ্টিমেয় কিছু বাদ দিলে বাকিরা এখনো বহাল তবিয়তে প্রশাসনে বহাল আছেন বলে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ করা হয়। সম্প্রতি সরকার এ ধরনের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বিতর্কিত গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ডিসি হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, এমন ২২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। রাতের ভোটের নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করা সে সময়কার ৩৩ জেলা প্রশাসককে ওএসডি করার পরদিনই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে কাজ চলছে বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। দুর্নীতি, অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগে এক দিনে চার পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রশাসনের অস্থির অবস্থার মধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচনের দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলার অবনতি রোধ করতে পারছে না। দেশব্যাপী ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযান খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারছে না। কয়েকটি উদাহরণ থেকে দেখা যাবে, আইনশৃঙ্খলার অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় খুন হয়েছেন চীনা নাগরিক। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুর হাইটেক সিটি পার্ক অতিক্রমের সময় রাজশাহীতে বাসে ডাকাতি ও শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে। ১৯ ফেব্রুয়ারি উত্তরায় দিনদুপুরে চলন্ত বাসে গণছিনতাই হয়েছে। রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। আদাবরে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করে এক যুবককে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। কিশোর গ্যাং রাজধানীর অনেক এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ঢাকার একটি থানায় আটক ছাত্রসংগঠনের নেতাকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশকে আক্রমণ করা হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের চার শতাধিক থানায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। লুটপাটের সময় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথির পাশাপাশি লুট করা হয় অস্ত্র। এসব লুট হওয়া অস্ত্র কেউ নিজের কাছে রেখেছে, অনেকে অস্ত্র বিক্রি করে দিয়েছে। লুট হওয়া ১ হাজার ৪০০ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
অস্থিরতা বন্ধ করে প্রশাসনকে সুস্থির ও গতিশীল এবং আইনশৃঙ্খলায় সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করা কঠিন হবে। জনমনে আস্থা ফেরানো এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে রাজনীতির ময়দানে উত্তাপ ও উত্তেজনা তুঙ্গে উঠবে, এমন ধারণা করাই যায়। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসন ও পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। জাতীয় নাকি স্থানীয় নির্বাচন আগে, রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান কী হবে এবং নির্বাচনে সরকার কোন পথে হাঁটবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। জাতীয় বা স্থানীয় যে নির্বাচনই আগে হোক, সেই নির্বাচন হবে ইউনূস সরকারের জন্য ‘এসিড টেস্ট’।
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক